বিশেষ প্রতিবেদন:  প্রস্তুত জহ্লাদ৷ ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পরার অপেক্ষা৷ এগিয়ে আসছে মৃত্যু৷  ২০০৪ সালে ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে হুজি-বি জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায় বহাল রেখেছে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট৷  আইনগত পদক্ষেপ অনুসারে এবার প্রাণ ভিক্ষা চাইবার পালা৷  রাষ্ট্রপতি মহম্মদ আবদুল হামিদের কাছে সেই আবেদনই করবে হুজি-বি (Harkat-ul-Jihad al-Islami Bangladesh) নেতা মুফতি হান্নান৷ এখবর জানাচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যম৷
রাষ্ট্রপতি প্রাণ ভিক্ষার আবেদন খারিজ করলেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে সরকার৷ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন৷ বাংলাদেশে জারি হয়েছে কড়া নিরাপত্তা৷ মৃত্যুভয় তাড়া করছে জঙ্গি মুফতিকে৷ প্রাণভয়ে কাঁপছে এই জঙ্গি নেতা৷

কে এই মুফতি হান্নান:

Advertisement

•    নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকত উল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় নেতা।  পুরো নাম মুফতি আব্দুল হান্নান। বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়৷

•    স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়া শেষ করে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিল মুফতি হান্নান৷ ভর্তি হয়েছিল উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসায়৷

•    ১৯৮৭ সালে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় এমএ পাশ করে মুফতি হান্নান।

পাকিস্তানে গিয়ে জঙ্গি কার্যকলাপ

 ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানে যায়৷  করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়৷ শুরু হয় জঙ্গি কার্যকলাপে অংশ নেওয়ার পালা৷ পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী আফগানিস্তানের খোস্ত শহরে মুজাহিদ ক্যাম্পে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নেয় মুফতি হান্নান৷

সোভিয়েত বিরোধী মুজাহিদিন
আফগানিস্তানে মোতায়েন তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। যুদ্ধে গুরতর আহত হয়ে ফের পাকিস্তানে ফিরে আসে জঙ্গি মুফতি৷ পেশোয়ারের কুয়েত আল হেলাল হাসপাতালে দশ মাস চিকিৎসা হয়৷  ফের করাচিতে ফিরে মাদ্রাসায় পড়া শেষ করে৷  এতসব ঘটনায় পাক সামরিক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের নজরে পড়ে মুফতি হান্নান৷ তাদের মদতে হরকত উল জিহাদ আল ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়৷

 হুজি-বি শীর্ষ নেতা
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে ফিরে  হুজি-র হয়ে সংগঠন বাড়িয়ে তোলার কাজ শুরু করে মুফতি হান্নান৷     এর আগে আফগানিস্তান ফেরত বাংলাদেশি মুজাহিদরা হুজি-বি গঠন করেছিল। মুফতি হান্নান ১৯৯৪ সালে হুজি-বিতে যোগ দেয়। সাংগঠনিক দক্ষতায়  হুজি-বির অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয় হান্নান৷

নেতৃত্ব নিয়েই মুফতি হান্নানের নির্দেশে বাংলাদেশে হুজি-বি পরপর নাশকতা ঘটাতে শুরু করে৷ একনজরে সেই সব ভয়ঙ্কর হামলা:

উদীচী সংস্কৃতি অনুষ্ঠান: ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ৷  যশোরে হয় প্রথম হামলা৷  বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় হুজি-বি৷ এটাই তাদের প্রথম নাশকতা৷  হামলায় ১০ জন নিহত ও শতাধিক আহত হন। তবে তৎকালীন আওয়ামি লিগ সরকার পুরো ঘটনায় বিরোধী বিএনপিকে দায়ি করে৷  শুরু হয় মামলা। এতে হুজি-বি জঙ্গিদের বিষয়টি আড়ালেই থেকে যায়।

মসজিদে হামলা: ১৯৯৯ সালের  ৮ অক্টোবর৷ ফের হামলা চালায় হুজি-বি৷ এবার খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় তারা৷  নাশকতায় আটজনের মৃত্যু হয়৷

শেখ হাসিনাকে খুনের ষড়যন্ত্র:  ২০০০ সালের ২০ জুলাই৷ গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা মঞ্চের কাছাকাছি ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখেছিল জঙ্গি সংগঠনটি৷ সেই হামলার চেষ্টায় প্রথমবার আলোচনায় উঠে আসে  মুফতি হান্নান ও হুজি-বি জঙ্গি সংগঠন৷ আত্মগোপন করে মুফতি হান্নান৷

সিপিবি সমাবেশ নাশকতা: ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি৷ ঢাকার পল্টন ময়দানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলা হয়৷  ঘটনাস্থলেই চারজন এবং পরে একজন হাসপাতালে মারা যান৷ হামলায় জড়িত মুফতি হান্নান ও হুজি-বি৷

রক্তাক্ত পয়লা বৈশাখ:  ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে মেতেছিলেন বাংলাদেশের জনগণ৷ ঢাকার বিখ্যাত রমনা বটমূল প্রাঙ্গণে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করছিল৷ সেই সময় বিস্ফোরণ ঘটায় হুজি-বি৷ নাশকতায় ১০ জনের মৃত্যু হয়৷ বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে লেগেছিল রক্তের দাগ৷

ব্রিটিশ হাইকমিশনারের উপর হামলা: ২০০১ সালের ২১ মে৷  সিলেটে হজরত শাহজালাল মাজারে প্রার্থনায় অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশে  নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী৷ সেখানেই তাঁকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা হয়৷ অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন আনোয়ার চৌধুরী৷  মৃত্যু হয়েছিল কয়েকজনের৷

ভয়াবহ ২১ অগাস্ট: প্রায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন আওয়ামি লিগের প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনা৷  ২০০৪ সালের ২১ অগস্ট এক রক্তাক্ত দিন৷ সেই দিনই  ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল হুজি-বি৷  ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে চলছিল আওয়ামি লিগের সমাবেশ৷  এখানেই পরপর গ্রেনেড ফাটানো হয়৷ গুলি চলে৷ নাশকতায় ২২ জনের  মৃত্যু হয়৷  আহত হন শেখ হাসিনা সহ শতাধিক ব্যক্তি।

প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীকে খুন: মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি৷ আওয়ামি লিগের সমাবেশ চলছিল হবিগঞ্জে৷ নাশকতায় বাংলাদেশের প্রাক্তন  অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচ জনের মৃত্যু হয়৷

----
--