নিখিলেশ রায়চৌধুরী: ইমরান খান পাকিস্তানে ভোটে জিতেছেন৷ পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের অনেক গ্ল্যামারাস রমণীরাই তাতে খুশি৷ ইমরান যখন ক্রিকেট খেলতেন তখন এই রমণীদের অনেকেই তাঁকে দেখার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতেন৷ এখন তাঁরাও পাকিস্তানের বিশিষ্ট রাজনীতিক ইমরান খানের মতোই এদেশে গণ্যমান্য দেশবরেণ্যে পরিণত হয়েছেন৷

পাকিস্তানের অধিনায়ক হিসাবে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতে ইমরান খান পোডিয়ামে উঠে গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন : I win world cup ৷ মঞ্চের নীচে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটাররাই সে কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন৷ ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াসিম আক্রামের মতো খেলোয়াড়ও৷ ইমরান খানের অহংকার ছিল এমনই৷

Advertisement

ইমরান খান রূপবান, সাহেবদের মতোই চোস্ত ইংরেজি বলেন৷ তাই সাহেবদের দেশ ব্রিটেনের মতোই ভারত-বাংলাদেশ সহ অস্ট্রেলিয়া-নিউজল্যান্ডেও তাঁর দারুণ খাতির৷ ভারতের প্রায় সব সংবাদ মাধ্যমই লিখছে, তাঁর জয়ের পিছনে রয়েছে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি৷ কথাটা অবশ্যই সত্যি কথা৷ কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা : তাঁর এই জয়ের নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকান গুপ্তচর সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি অর্থাৎ সিআইএ৷ তারা চাইছে তাঁকে সামনে রেখে ক্রিকেট কূটনীতির মাধ্যমে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে শান্তি ফেরাতে৷ বলা বাহুল্য, সেই স্বপ্নের সঙ্গে বাণিজ্যও জড়িয়ে রয়েছে৷ আর, সেই বাণিজ্যে লাভ ভারত ও পাকিস্তান উভয়েরই৷

পড়ুন: পাক নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল ওয়াশিংটন

ইমরান খান আদতে বালতিস্তানি৷ বালতিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের অন্তর্গত৷ মহারাজা হরি সিং ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ নিয়ে গড়িমসি না করলে যা গোটা জম্মু-কাশ্মীরের অঙ্গ হিসাবে স্বাধীন সার্বভৌম ভারতেরই অন্তর্গত হত৷ পাকিস্তানের ভোটে জিতে ইমরান খান নিশ্চয়ই অধিকৃত কাশ্মীরকে ভারতের হাতে তুলে দেবেন না!

নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ইমরান খান বিদেশে পাড়ি দিতে প্রথম কোথায় যান, সেটাই দেখার৷ অবশ্যই তাঁকে ওয়াশিংটন ডিসি-তে যেতেই হবে৷ প্রশ্নটা হল, আগে ওয়াশিংটন, না আগে লন্ডন৷ পাকিস্তানের এখন যা অবস্থা তাতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ইমরান খান যদি প্রথমেই কৃতজ্ঞতা জানাতে মার্কিন প্রশাসনের কাছে ছুটে যান, তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি নিজেই নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করলেন৷ পাকিস্তানে এখন একদিকে ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং আর এক দিকে জামাত উদ-দাওয়া দখল নেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে৷ তাদের কাছে সাধারণ মানুষের মতামতের কানাকড়ি মূল্যও নেই৷

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই সেদেশে সাধারণ মানুষের জীবনের দাম খোলামকুচির মতো৷ পাকিস্তানের কর্তারা এক সময় ব্রিটিশ রাজের গোলামি করেছেন, এখন আমেরিকার প্রশাসনের গোলামি করছেন৷ না করলে গোটা দেশটাই উড়ে যাবে৷ সৌদি কর্তারা তো আর সেনা পাঠিয়ে পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারবেন না৷ রক্ষা পেতে হলে আমেরিকার সেনা কমান্ডই একমাত্র ভরসা৷

পড়ুন: পাকিস্তান: ইমরান এগিয়ে কিন্তু কুর্সিতে ত্রিশঙ্কু ছায়া

ইমরান খান ভোটে জিতে কথা দিয়েছেন, তিনি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবেন৷ কাশ্মীর নিয়েও আলোচনায় বসবেন৷ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চেয়েছিলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো, অতঃপর তাঁর মেয়ে বেনজির ভুট্টো৷ উভয়েরই শেষটা মোটেই সুখের হয়নি৷ ইমরান খান নিজের ভবিষ্যৎটা ঠিক কত দূর দেখতে পাচ্ছেন, বলতে পারব না৷ তবে তিনি যাঁদের কাঠপুতলি হয়ে পাকিস্তানের মসনদে বসেছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই কিছু না কিছু চিন্তাভাবনা আছে৷

লালচীনের কাছে পাকিস্তান এখন একটা অত্যন্ত পাকা ঘুটি৷ মস্কো-ওয়াশিংটন ঠাণ্ডা যুদ্ধের আমল থেকেই বেজিং আর ইসলামাবাদ (পড়ুন, রাওয়ালপিণ্ডি) সব ঋতুর বন্ধু৷ এখন আফগানিস্তানের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে জি জিনপিংয়ের চীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক উত্থানপতনের উপর অনেকটাই নির্ভর করছে৷ লাল চীনের ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হল, সেখানকার নেতৃত্ব নিজেদের দেশের মানুষের উপরেই ভরসা রাখতে ভয় পায়৷ তাদের অস্তিত্ব পুরোটাই সামরিক শক্তিবৃদ্ধির উপর নির্ভরশীল৷ পাকিস্তানেও একই অবস্থা৷ সামরিক শক্তিই দেশ চালানোর বকলমা নিয়ে রেখেছে৷ এই অবস্থায় ইমরান খান পাকিস্তানে ভোটে জিতে কীভাবে সমস্ত রকমের চাপ সামলে চলতে পারবেন, সেটা একটা মস্তবড় প্রশ্ন৷

পড়ুন: অক্সফোর্ডের প্রাক্তনীই বসছেন পাক মসনদে! কেমন ছিল ইমরানের রঙিন জীবন?

ইমরান খান অসাধারণ ক্রিকেটার ছিলেন৷ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসাবেও তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন৷ কিন্তু ক্রিকেট খেলা আর পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রকে পরিচালনা করা তো এক ব্যাপার নয়৷ ‘ইনসাফে’র স্বপ্ন কে না দেখে! কিন্তু ‘ইনসাফ’ চাইলেই তো তা আর বাস্তবের মাটিতে এসে পড়ে না৷ ইমরান খানের চাইতে অনেক বেশি ন্যায়বিচারের স্বপ্ন জাগিয়ে তুরস্কে ক্ষমতায় এসেছিলেন মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক, ঠিক যেমন আরব দুনিয়ায় অভ্যুদয় ঘটেছিল গামাল আবদেল নাসেরের৷ কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁদের মতো জনপ্রিয় নেতাদের কারও স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হয়নি৷ ইমরান খান তো সেদিক থেকে তাঁদের নখের যোগ্যও নন!

পাকিস্তানে ইমরান খান আপাতত আমেরিকার প্রশাসনের কাছে সব চাইতে নির্ভরযোগ্য তুরুপের তাস৷ বাইরে যতই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সখ্যতা বাড়ুক, আফগানিস্তানে রাশিয়ার পুনরায় প্রভাববিস্তার মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধবাজ লবির পক্ষে হজম করা কষ্টকর৷ একই অবস্থা চীনেরও৷ তারাও নিজেদের সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি ফের রাশিয়ার প্রভাব বাড়ুক, চায় না৷

আমেরিকার প্রশাসন চাইছে ইমরান খানকে সামনে রেখে একদিকে আফগানিস্তান এবং অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশে একটা শান্তি পরিস্থিতি বজায় রাখতে৷ তার কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্ত লাগোয়া ইরানের সঙ্গে একটা বড় মাপের হেস্তনেস্ত করার জন্য তৈরি হচ্ছেন৷

----
--