২০০২! এক গোপন সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে পাক সেনাঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল বাজপেয়ী সরকার

তন্নিষ্ঠা ভাণ্ডারী: ৩১ জুলাই, ২০০২। রাত তখন ২টো। অম্বালা এয়ারফোর্সে স্টেশনের কোয়ার্টারে হঠাৎ ফোন এল লেফট্যানেন্ট রাজীব মিশ্রের কাছে। ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি ছুটলেন তিনি। হাতে লেজার ডেজিগনেশন ইক্যুইপমেন্ট। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তিনি যেন দ্রুত শ্রীনগর এয়ারবেসে পৌঁছে যান। সেখানে অপেক্ষা করছিল একটি ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট। কেন ডাকা হল তাঁকে? সে ব্যাপারে কিছুই জানতেন না মিশ্র। জানতেন না বায়ুসেনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের অংশ হতে চলেছেন তিনি। যার পরিকল্পনা অত্যন্ত গোপনে কষে ফেলেছিল ভারত সরকার। সেই অভিযানের কথা কোথাও সেভাবে প্রকাশও করা হয়নি কখনও।

জাগুয়ার যুদ্ধবিমান চালাতে পারদর্শী ছিলেন এই লেফট্যানেন্ট রাজীব মিশ্র। কিন্তু সেদিন তাঁকে ওই যুদ্ধবিমানের ককপিটে বসতে হয়নি। বসতে হয়েছিল একটি ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফটে। তার কিছুদিন আগেই ইজরায়েল থেকে লেজার ডেজিগনেশনের বিশেষ প্রযুক্তি আমদানি করেছিল ভারত, যা চালনা করতে প্রশিক্ষিত ছিলেন লেফট্যানেন্ট মিশ্র। এই প্রযুক্তিতে কোনও টার্গেট স্থির করে ঠিক সেখানেই আঘাত করা হয় সহজ হয়।

আরও পড়ুন: করিমের হাতের কোর্মায় মজতেন ব্রাহ্মণ সন্তান বাজপেয়ী

- Advertisement -

সেই কাজটাই করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এই বায়ুসেনা অফিসারকে। বলা হয়েছিল ‘লাইট আপ’ করতে। বায়ুসেনার এই ভাষার অর্থ হল, শত্রুদের উপর আলোকপাত করা। আর তার জন্যই এই লেজার টেকনোলজি। অর্থাৎ, সীমান্তে শত্রুদের অবস্থান চিহ্নিত করে ওই টার্গেট ‘লক’ করে চালানো হবে গুলি। মিশ্রের সঙ্গে ছিলেন পাইলট আর আরও দুই অফিসার।

সময়টা ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। মাত্র সাত মাস আগে দেশের পার্লামেন্টে হামলা চালিয়েছে পাক জঙ্গিরা। আর তারপরেই সীমান্তে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়ে ‘অপারেশন পরাক্রম’ শুরু করে ভারত। প্রধানমন্ত্রীর আসনে তখন অটল বিহারী বাজপেয়ী আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জর্জ ফার্নান্ডেজের হাতে। ওই বছরে মে-জুন মাসে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ততার চরমে ওঠে। কুপওয়াড়ায় কার্গিলের মর সৈন্য সাজায় ভারত। পাকিস্তানকে একটা কড়া জবাব দেওয়া খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল ভারতের। প্রথমে ঠিক হয়েছিল পাক সেনার ঘাঁটিতে অভিযানে পাঠানো হব ভারতীয় বাহিনীকে।

আরও পড়ুন: একদিন রাত আড়াইটায় তড়িঘড়ি আব্দুল কালামকে ডেকে পাঠালেন বাজপেয়ী

কিন্তু, পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল সুন্দররাজন পদ্মনাভনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক হয়, স্পেশাল ফোর্স পাঠানোর আগে পাকিস্তানের অবস্থান জানতে ব্যবহার করা হবে বায়ুসেনাকে। তখন বায়ুসেনা প্রধান ছিলেন এয়ার চিফ মার্শাল শ্রীনিবাসপুরম কৃষ্ণস্বামী। ‘হাফিংটন পোস্ট’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, পুরো পরিকল্পনাটাই গোপন রাখা হয়েছিল। কেউ কোনও আলোচনা করেনি। এমনকি এই বিশেষ অভিযানের কোনও নামকরণও করা হয়নি। অভিযান চালানোর আগেই কাশ্মীরের চারপাশে প্রচুর সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছিল Mirage 2000, Jaguar ও MiG-21-এর মত যুদ্ধবিমান।

ওইদিন রাতে তিনজন অফিসারের কথা হয় শ্রীনগর এয়ারবেসে। সেখানেই পুরো পরিকল্পনার কথা জানতে পারেন তাঁরা। নয়াদিল্লিকে জানিয়ে শুরু হয় অভিযান। আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলা হয় অফিসারদের। এরপরেই দিল্লি থেকে মেলে গ্রিন সিগন্যাল। শুরু হয় অভিযান। LoC কাছে পৌঁছয় চিতা হেলিকপ্টার। দরজা খুলে দেওয়া হয়। মাটির কাছে নামিয়ে আন হয় সেই হেলিকপ্টার। সেখান থেকে ঝাঁপ দেন তিনজন। অস্ত্র ফেলে দেওয়া হয় হেলিকপ্টার থেকে। বিএসএফ জওয়ানেরা সেই অস্ত্র নিয়ে মাটিতে গর্তে লুকিয়ে যান। আস্তে আস্তে সরে যায় চিতা হেলিকপ্টারটি।

তিন বায়ুসেনা জওয়ান এগোতে শুরু করেন। তাঁদের কোনও ছদ্মবেশ ছিল না। তিনটি পাহাড়ের উপর থেকে লেজার ডেজিগনেশনের মাধ্যমে শত্রুঘাঁটি চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেন তাঁরা। ততক্ষণে হেলিকপ্টার যাওয়ার খবর পেয়ে গিয়েছে পাকিস্তান। মুহর্মূহ গুলি করছে পাক সেনা। কোনোক্রমে পাহাড়ের উপর থেকে তাদের চিহ্নিত করে পাহাড়ের পিছনে লুকিয়ে পড়েন তাঁরা। সেই পোস্টে তখন জ্বলছে লন্ঠন। কোটের তলায় তাঁরা লুকিয়ে ফেলেন সেই আলো।

পরের দিন খারাপ আবহাওয়ায় উড়তে পারেনি ভারতীয় এয়ারক্রাফট। দুপুর ২টোয় সেটা সম্ভব হয়। কুপওয়াড়ায় পাক সেনা ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয় ভারতীয় বায়ুসেনা। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাব দিতে যায় পাকিস্তান। কিন্তু, ভারত বিশেষ কৌশল নিয়ে অভিযান চালিয়ে যায়। হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। একে একে সব পাকিস্তানি সেনাকে খতম করে দিয়ে ফিরে আসে ভারত। সফল এই অভিযানের কোনও রেকর্ড রাখা হয়নি। অভিযানে অংশ নেওয়া কোনও সেনাকে মেডালও দেয়নি সরকার। শুধুই শত্রুনিধনে সাফল্যের স্বাদ পেয়েছিল বাজপেয়ী সরকার।

তথ্যসূত্র: huffingtonpost

Advertisement
---