এবার তৃণমূলের মধ্যযুগীয় বর্বরতা দেখল নন্দীগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার, নন্দীগ্রাম: সরকারি প্রকল্পের কাটমানি না দেওয়ায় ক্লাবে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছিল বধূকে৷ থানায় অভিযোগ জানালে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল৷ যদিও পরিস্থিতির চাপে পুলিশ অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা অসিত হাজরাকে গ্রেফতার করতেই বাংলা সাক্ষী থাকল বদলার রাজনীতির৷

নির্যাতিতার স্বামী ও তার এক বন্ধুকে রীতিমতো ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রকাশ্যে খুঁটিতে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় বেধড়ক মারধর করা হল৷ অভিযুক্ত শাসকদলের স্থানীয় নেতারা৷ ভাইরাল হয়ে গিয়েছে মধ্যযুগীয় বর্বরতার সেই ভিডিও৷ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, পালা বদলের বাংলায় তবে কি আইন আদালত সবই তৃণমূল নেতারাই?
ঘটনাস্থল, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম ও খেজুরি৷ বাম অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল এই বদ্ধভূমি থেকেই৷ বিরোধী দলনেত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান শ্লোগানও ছিল ‘বদলা নয়, বদল চাই’৷ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, পালা বদলের বাংলায় এ কেমন বদল? হাত বেঁধে খুঁটিতে বেঁধে কিল, চড়, লাথি এটাই কি পরিবর্তন? এটাই কি বদলের রাজনীতি?

আরও পড়ুন: ‘নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারী যতদিন জীবিত থাকবে, ততদিন তৃণমূলই থাকবে’

- Advertisement -

ঘটনার শুরু কয়েকদিন আগে৷ স্থানীয় সূত্রের খবর, নন্দীগ্রাম ১নং ব্লকের আমদাবাদ পঞ্চায়েতের সুবদি গ্রামের বাসিন্দা পরশুরাম মান্নার স্ত্রী ইন্দিরা আবাস যোজনায় চল্লিশ হাজার টাকা পেয়েছিলেন৷ অভিযোগ, কাটমানি বাবদ ১০হাজার টাকা দাবি করেন তৃণমূলের স্থানীয় বুথ কমিটির সভাপতি অসিত হাজরা৷ কাটমানি না দেওয়ায় সম্প্রতি ওই বধূকে স্থানীয় ক্লাবে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ৷ এমনকি থানায় জানালে ফল ভালো হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়৷ যদিও নির্যাতিতা বধূ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন৷ জানা গেছে, মেডিকেল টেষ্টে প্রমানিত হওয়ার পরেও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে থাকে অভিযুক্তকে আড়াল করা হচ্ছে৷ পরে পরিস্থিতির চাপে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা অসিত হাজরাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হয় পুলিশ৷

এরপরই শুরু ‘বদলার’ রাজনীতি৷ স্থানীয় সূত্রে খবর, খেজুরি-২নং ব্লকের কুলঠা গ্রামের ইটভাটা মালিক পরিমল দাসের কাছ থেকে ১০হাজার টাকা পেতেন পরশুরাম৷ বকেয়া টাকা দেওয়ার টোপ দিয়ে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়। তিনি নির্মল শীট নামে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে কুলঠায় যান। সেখানে আগে থেকেই তৈরি ছিলেন তৃণমূলের স্থানীয় নেতা, কর্মীরা। এলাকায় পৌঁছতেই দুজনকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় মিয়ামোড়ে তৃণমূলের স্থানীয় পার্টি অফিসে৷ অভিযোগ, নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করার অপরাধে তাঁদের দু’জনকে প্রকাশ্যেই খুঁটিতে বেঁধে চলতে থাকে বেধড়ক মারধর৷ হাত বেঁধে খুঁটিতে বেঁধে অকথ্য মারধরের সেই ছবি ভাইরাল হয়েছে৷ রাজ্যর মানুষ শিউরে উঠেছেন সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতার ছবি দেখে৷

আরও পড়ুন: বালিকার যৌন হেনস্থাকে ঘিরে তপ্ত নন্দীগ্রাম

মারধরের পর পরশুরামকে তুলে দেওয়া হয় পুলিশের হাতে৷ পরশুরামের বিরুদ্ধে অভিযোগ তার পকেট থেকে একটি ওয়ান শাটার আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া গেছে৷ প্রশ্ন উঠছে, তাঁর কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকলে তিনি আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেন না কেন? বন্দুক পকেটেই রয়ে গেল! এসব প্রশ্নের জবাব মেলেনি পুলিশের তরফ থেকে৷ স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা কিসের ইশারা করছে সেই প্রশ্ন উঠছে৷ প্রশ্ন উঠছে স্ত্রীর ধর্ষণের প্রতিবাদ করায় যদি স্বামীর এরকম অবস্থা হয়, তাহলে এ কোন বদল? এ কেমন পরিবর্তন? আম জনতার নিরাপত্তা কোথায়? তবে কি মমতার রাজত্বে পুলিশ আরও বেশি করে দলদাসে পরিণত হয়েছে? উঠছে হাজারো প্রশ্ন৷

ঘটনার তীব্র ধিক্কার জানিয়ে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র বলেন, ‘‘রাজ্যে মানুষের অধিকার, নারীদের নিরাপত্তা, গণতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি কোথায় পৌঁছেছে এই ঘটনা তারই প্রমাণ। প্রতিবাদের কণ্ঠকে দমিয়ে রাখতে ধর্ষণ থেকে মারধর সবই হচ্ছে৷ রাজ্যে আইনের শাসন নেই৷’’ যদিও অভিযুক্তদের তরফে দাবি করা হয়েছে, ‘‘সময়ে ইঁট দিতে না পারায় পরশুরাম বন্দুক ঠেকিয়ে হুমকি দিচ্ছিল৷ তখনই প্রতিরোধের জন্য ওদের খুঁটিতে বেঁধে পুলিশকে খবর দিয়েছিলাম৷ মারধরের কোনও ঘটনা ঘটেনি৷’’

ভাইরাল হওয়া ভিডিও অবশ্য অন্য কথা বলছে! এবিষয়ে হেঁড়িয়ার আই সি নবকুমার রাজোয়ার প্রতিক্রিয়া, ‘‘অস্ত্র আইনে পরশুরামকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷ তবে এখনই কেস ডিটেইলস বলা যাবে না৷’’ ভাইরাল হওয়া মধ্যযুগীয় মারধরের ভিডিও সম্পর্কে অবশ্য ‘স্পিকটি নট’ থেকেছেন আই সি সাহেব!
তাহলে কি এবার ‘মমতার বদলা নয়, বদল চাই’ স্লোগান নেতাদের কাছে পরিবর্তিত হয়েছে৷ এখন কি, সেই স্লোগানেও পরিবর্তন এসে হয়েছে ‘বদল এসেছে, বদলা চাই’? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

Advertisement ---
---
-----