ভারতকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলার জন্য যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির খুব প্রয়োজন৷ এই প্রয়োজনটা মেটাতে পারে একমাত্র পাকিস্তানের সামরিক গুপ্তচর বাহিনী ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) মদতপুষ্ট কট্টরপন্থী সন্ত্রাসবাদী জঙ্গিরা৷ জম্মুতে জয়েশ-ই-মহম্মদের ফিদায়েঁ বা আত্মঘাতী আক্রমণ তারই টাটকা নমুনা৷ ওই ঘটনার পর থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য অধিকৃত কাশ্মীরের ওপার থেকে ক্রমাগত গোলাগুলি চলছে৷ ভারতের সেনাবাহিনী তার সমুচিত জবাবও দিচ্ছে৷ পাক সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য, যে কোনওভাবে ভারতকে খেপিয়ে তোলা, যাতে আবারও কারগিলের মতো যুদ্ধ বাধে৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

একটা সময় ছিল যখন পাকিস্তানের যুদ্ধবাজদের মদত দিত আমেরিকার ডেমোক্র্যাটরা (কেনেডির গোষ্ঠী তখন আর সেদেশের পলিটিক্যাল পিকচারে নেই)৷ সেদেশের মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের একাংশ এই ডেমোক্র্যাটদের পিছনে থাকত৷ সাধারণভাবে রিপালিকানরা যুদ্ধবাজ বলে আমেরিকায় নিন্দনীয় হলেও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তাদের অধিকাংশ নেতা ভারতের পক্ষই নিতেন৷

যদিও সেই পরিস্থিতিটা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মাটিতে আত্মঘাতী বিমান হামলার আগেকার কথা৷ তখন জম্মু-কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং সন্ত্রাসবাদী শক্তির হয়ে ওকালতি করত মূলত আমেরিকান ডেমোক্র্যাটদের কোনও কোনও লবি৷ আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভারতের সেনাবাহিনীর ‘মানবতা’ লঙ্ঘন নিয়ে আওয়াজ তুলত মূলত তাদের পোষা এনজিওগুলি৷ যদিও কাশ্মীরের পণ্ডিতদের উৎখাত করার ব্যাপারটিও যে এক প্রকার এথনিক ক্লিনজিংয়ের মধ্যে পড়ে সে কথাটা তারা ঘুণাক্ষরেও উচ্চারণ করত না৷

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকেই আমেরিকার প্রশাসন, তা যারাই সেখানে নির্বাচিত হোক না কেন, ভারতের সঙ্গে সখ্যতা যে অত্যন্ত জরুরি সে কথাটা উপলব্ধি করেছিল৷ কিন্তু সখ্যতার পরিস্থিতিটা তৈরি করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের দিক থেকেও যেমন কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল, ঠিক তেমনই ভারতও ওয়াশিংটনের মনোভাবটা ঠিক বুঝতে পারছিল না৷

দুই দেশের মধ্যে অদ্ভূতভাবে যোগসূত্র যারা তৈরি করতে সাহায্য করেছিল সেই দেশটির নাম না হয় এখানে উহ্যই রইল৷ শুধু এটুকুই বলা চলে, তাদের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব এক সময় ছিল আমেরিকার প্রবল শত্রু৷ কিন্তু তাদের মাটি থেকে মার্কিন সেনা হটে যাওয়ার পর লালচীনের সঙ্গে তাদের পাঞ্জা কষা আজও বন্ধ হয়নি৷ ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেদেশের রাজধানীতে পদার্পণ করার পর দেখেছিলাম, তাদের সঙ্গে আমেরিকাও যেমন বাণিজ্য করতে উৎসুক ঠিক তেমনই জাপানও ব্যবসা করছে৷ বেজিংয়ের সঙ্গে বাহ্যত আপাত বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক থাকলেও সেদেশের মানুষ লালচীনাদের একেবারেই পছন্দ করে না৷ বরং, ভারত তাদের কাছে অনেক বেশি নিকটাত্মীয়৷

অনেক সময়ই দেখা যায়, যাদের কাছ থেকে বন্ধুত্ব আশা করা হয়নি তাদের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে সাহায্য চলে আসে৷ হয়তো তেমনই কারও কাছ থেকে কিছু সহায়তা মিলেছে যার জন্য ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকার প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটা অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়েছে এবং সামরিক ও ইন্টেলিজেন্সের দিক থেকে দুই দেশ পরস্পরের উপর অনেক বেশি ভরসা করছে৷

যদিও এই মুহূর্তে বিশ্বের যা অবস্থা তাতে চাইলেও আমেরিকার প্রশাসন যেমন সব দিক থেকে ভারতের পাশে থাকতে পারবে না, ঠিক তেমনই ভারতও কিছু শক্তিকে চটাতে পারবে না৷ যথারীতি তার কারণ পেট্রলিয়ামের দামের ওঠা-পড়া৷ বিশ্ব বাণিজ্যের কারণেই আরব দুনিয়ার সঙ্গে আমেরিকারও সম্পর্ক যে দরে বাঁধা, ভারতেরও কিয়দংশে তা৷ আমেরিকার মুশকিল আরও বেশি এই কারণেই যে, সামরিক দিক থেকে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যে ব্রিটিশ সরকার সৌদি আরবের মতো দেশের সঙ্গে তাদের আমদানি-রফতানির বহরটা পেল্লায়৷ বিশেষ করে রফতানির৷ লন্ডনকে চটিয়ে ওয়াশিংটন তো কিছু করতে পারবে না৷

কারণ ব্রিটিশদেরই রাজকোষে সব থেকে বেশি সোনা রয়েছে৷ তাই বিশ্ববাজারে ভারতীয় মুদ্রার নিরিখে পাউন্ডের দাম এখনও অনেক বেশি৷ ডলার, ইউরোর চাইতে পাউন্ডওয়ালারা তাই ভারতের কাছে অনেক বেশি দাম পায়৷

আর মুশকিল এখানেই৷ এত ভয়াবহ সব সন্ত্রাসবাদী ঘটনার পরেও, আমেরিকা কিংবা ব্রিটেন কেউই সন্ত্রাসের আতুঁড়ঘরে সরাসরি আঘাত করতে চাইছে না৷ তাহলে তাদের নানাভাবে খেসারত দিতে হবে৷ মাঝখান থেকে এর মূল্য চোকাতে হচ্ছে ভারতকে, বিশেষ করে ভারতের সেনাবাহিনীকে৷

এই অবস্থায় ভারতকে এমন কিছু দেশের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে, যারা যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতেও একা লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে৷ ঠিক যেমন ১৯৭৯ সালে চীনা পিটুনি পল্টনদের পালটা পিটিয়ে চোখে সর্ষেফুল দেখিয়ে দিয়েছিল ভিয়েতনাম, কিংবা তার আগে ১৯৭৩ সালে ইয়ম কিপ্পুরের যুদ্ধে জিতে গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল ইজরায়েল৷

যুদ্ধে জেতার ক্ষমতাটা এমনি এমনি তৈরি হয় না৷ প্রবল চাপের মুখেও এক-একটি রাষ্ট্র কীভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে পালটা প্রত্যাঘাতে যেতে পারে, এবং সেই যুদ্ধে জিততে পারে সেটা ভিয়েতনাম কিংবা ইজরায়েলের মতো দেশ সমসাময়িক বিশ্বেই করে দেখিয়ে দিয়েছে৷ আশার কথা, উভয় দেশই এখন ভারতের অত্যন্ত ভালো বন্ধু৷ ভিয়েতনাম তো গোড়া থেকেই ছিল, তার উপর এখন ইজরায়েলের সঙ্গেও সন্ত্রাসবিরোধী তথা সামরিক বন্ধুত্ব আগের চাইতে অনেক বেশি মজবুত হয়েছে৷

পশ্চিমবঙ্গ কিংবা কেরলের মতো রাজ্যে মুশকিল হল, সেখানকার পলিটিক্যাল অথচ সলভেন্ট কাকা-জ্যাঠারা ইয়ং জেনারেশনের মুণ্ডগুলি চিবিয়ে খেতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এতটাই তৎপর যে, তারা কখনই ঠিক সময়ে আর ঠিক দিকে চোখ খুলে তাকাতে শেখে না৷ যখন দেখে তখন ঢের দেরি হয়ে গিয়েছে৷ অতএব সেই সময় যার যে রকম ক্ষমতা সেই পুঁজিটুকু নিয়ে বিদেশ ভজনা ছাড়া উপায় থাকে না৷ লাভের গুড়টা মাঝখান থেকে পলিটিক্যাল কাকা-জ্যাঠারাই খেয়ে নেয়৷

------------------------------------- ©Kolkata24x7 এই নিউজ পোর্টাল থেকে প্রতিবেদন নকল করা দন্ডনীয় অপরাধ৷ প্রতিবেদন ‘চুরি’ করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে -------------------------------------