মুম্বই: ছেলেবেলা থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার শখ ছিল৷ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন জাঁকিয়ে বসেছে দু’চোখে৷ খোলা মাঠ আবার কখনও বা পলিথিনের তাঁবুতে খালি পেটে কাটানো রাতগুলিও যে স্বপ্ন ছিনিয়ে নিতে পারেনি যশস্বী জসওয়ালের চোখ থেকে৷ ১১ বছর বয়সে যে ছেলেটি এক টুকরো উইলো হাতে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে হাঁটা লাগিয়েছিলেন, ছ’বছর পর লক্ষ্যে পৌঁছনোর তৃপ্তি তাঁর চোখে মুখে৷ তবে আসল কাজ এখনও বাকি৷ বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের আঙিনায় সবে মাত্র পা দিয়েছেন৷ স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে জসওয়ালকে এখনও অনেক পথ হাঁটতে হবে৷

উত্তরপ্রদেশের ভাদোহিতে একটি ছোট্ট দোকান চালান যশস্বীর বাবা৷ দুই ছেলেকে ঠিক মতো পড়াশোনা করানোর সামর্থ ছিল না৷ তাছাড়া ছোট ছেলের পড়াশোনায় মন ছিল না কখনই৷ ব্যাট-বলের নেশায় মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তাঁর রোজনামচা৷ দারিদ্র আর পদে পদে প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই চানানো সেই ছেলেই আজ অনূর্ধ্ব-১৯ ভারতীয় দলের অন্যতম সদস্য৷ শ্রীলঙ্কা সফরে উড়ে যাওয়ার আগে ফেলে আসা দিনগুলির দিকে ফিরে তাকালেন যশস্বী নিজেই৷

১১ বছর বয়সে উত্তরপ্রদেশ ছেড়ে মুম্বইয়ে এক কাকার কাছে চলে আসেন যশস্বী৷ তবে ঠাঁই হয়নি কাকা সন্তোষের বাড়িতেও৷ ওরলির বাড়িটা এতই ছোট ছিল যে, সেখানে এক আগন্তুকের জায়গা হওয়া মুশকিল৷ কাজের সূত্রে মুসলিম ইউনাইটেড ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সন্তোষ৷ তিনিই ক্লাব কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন যশস্বীকে ক্লাব তাঁবুতে রাত কাটানোর অনুমতি দিতে৷ অনুমতি মেলে৷ পরের তিন বছর আজাদ ময়দানের মুসলিম ইউনাইটেড ক্লাবের পলিথিনের তাঁবুই ছিল জসওয়ালের রাত্রীকালীন ঠিকানা৷

সারাদিন ক্রিকেট খেলে বেড়ানো৷ রাতে মালিদের ঝগড়া-মারপিটের সাক্ষি থাকা৷ মদ্যপ মালিদের জন্য রুটি তৈরি করা এবং আধপেটা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া৷ কোনও দিন আবার রাতে খাবারও জুটত না৷ খালি পেটেই রাত কাটাতে হত তখন৷

যশস্বী নিজেই জানান, ‘শীতের সময় তবু তাঁবুতে রাত কাটানো যায়৷ গরমের দিনে পলিথিনের নীচে শুয়ে থাকা দূর্বিসহ৷ প্রথম প্রথম খোলা মাঠে ঘুমিয়ে পড়তাম৷ তবে একবার পোকার কামড়ে চোখের চারপাশ ভয়ানক ফুলে গিয়েছিল৷ সেই থেকে কষ্ট হলেও তাঁবুর বাইরে রাত কাটাতাম না৷’

বাবার কাছ থেকে মাঝে মধ্যে অল্প কিছু টাকা পেতেন৷ তবে খরচ চালানোর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না৷ বাধ্য হয়েই একসময় ফুচকা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন যশস্বী৷ আজাদ ময়দানে রাম-লীলার সময় ফুচকা বিক্রি করে আয় কম হত না, তবে তখন তাঁর একমাত্র প্রার্থনা হত, যেন সতীর্থ খেলোয়াড়রা যেন তাঁর কাছে ফুচকা খেতে না আসে৷ বন্ধুদের কাছ থেকে পয়সা নিয়ে ফুচকা পরিবেশন করতে খারাপ লাগত তাঁর৷ মাঝে মাঝে আজাদ ময়দানে ফলও বিক্রি করতেন তিনি৷ তবে কোনও অবস্থাতেই অনুশীলনে খামতি ছিল না তাঁর৷

সৌভাগ্যবশত স্থানীয় কোচ জোয়ালা সিংয়ের নজরে পড়ে যান যশস্বী৷ উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা জোয়ালা যশস্বীর মধ্যে নিজের ছেলেবেলা খুঁজে পান৷ একসময় ক্রিকেটার হওয়ার লক্ষ্যে খালি হাতে মুম্বইয়ে চলে আসা জোয়ালা শেষ পর্যন্ত মুম্বইয়ের বয়সভিত্তিক দলে ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন৷ জাহির খানের সঙ্গে এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে তালিমও নিয়েছেন৷ এহেন জোয়ালা সিংই যশস্বীর ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করেন৷

অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর মুম্বইয়ের অনূর্ধ্ব-১৯ কোচ সতীষ সামন্ত বলেন, ‘যশস্বীর মধ্যে গেম রিডিংয়ের অদ্ভূত ক্ষমতা আছে৷ ও বোলারদের মন পড়তে পারে৷ ওর বয়সি ছেলেরা যেখানে শুরু থেকেই শট খেলার পিছনে দৌড়য়, ও তেমনটা করে না কখনই৷ ওর ধৈর্য্যর প্রশংসা করতে হয়৷ সব থেকে বড় কথা ওর হাতে কোনও স্মার্টফোন নেই৷ এখনকার সময়ে একজন টিনএজারের কাছে স্মার্টফোন নেই, এমনটা ভাবাই যায় না৷ সোশ্যান নেটওয়ার্কে সময় নষ্ট করে না বলেই ক্রিকেটের প্রতি এমন একাগ্রতা ওর৷’

এমন কঠিন জীবনযুদ্ধে জয়ী যশস্বীকে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটের চাপ নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে, তার জবাব, ‘সবাই ক্রিকেটের মানসিক চাপ নিয়ে কথা বলে৷ আমি বছরের পর বছর এমন চাপ নিতে অভ্যস্থ৷ প্রতিদিনের এই লড়াইটাই আমাকে মানসিকভাবে পোক্ত করে তুলেছে৷ রান করাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ আমি জানি যে আমি রান করব এবং উইকেটও নেব৷ আসলে আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটাই যে, পরের বার পেট ভরার মতো খাবার জুটবে কি না৷’

শেষে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের নবনির্বাচিত সদস্য যশস্বী বলেন, ‘সেই দিনগুলোর কথা আমি ভুলিনি৷ একটা সময় নির্লজ্জের মতো সতীর্থদের কাছ থেকে খাবার চেয়ে লাঞ্চ করতাম৷ বলতাম পয়সা নেই, তবে ক্ষিদে আছে৷ কখনও কোনও সতীর্থ টিপ্পনি কাটলে আমি রাগ করতাম না৷ কারণ আমি জানি, ওরা কখনও তাবুতে রাত কাটায়নি৷ ওদের কাউকে খরচ জোগাড় করতে ফুচকা বিক্রি করতে হয়নি৷ ওরা কেউ কখনই খালি পেটে ঘুমোতে যায়নি৷’

----
--