জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে বিমা জাতীয়করণের পথচলা

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন বাঙালিকে দুর্বল করতে তখন বাংলা ভাগকেই একমাত্র উপায় বলে মনে হয়েছিল লর্ড কার্জনের৷ ইংরেজদের সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে দিকে ঝুঁকে ছিল বাঙালি জাতি৷ সেদিন ইংরেজদের বিরোধিতা করতে নেমে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার তাগিদটা বেশি করে অনুভব করেছিল বাংলার মানুষ৷ ফলে ইংরেজদের পাল্টা আঘাত করতে বিদেশি পণ্য ‘বয়কট’ করার পাশাপাশি অনুভব করা হয়েছিল নিজস্ব পণ্য উৎপাদন ও পরিষেবার ব্যবস্থা করা৷ তারই জেরে শিল্পায়নের দিকে ঝোঁকে বাঙালি৷

তখন একে একে খুলতে লাগল কাপড়ের কল, ব্যাংক, সাবান, ওষুধ দেশলাইয়ের কারখানা৷ এই সময়ে বিস্তার লাভ করেছিল বাঙালির ব্যাংক এবং বিমা ব্যবসা ৷ ১৯০৭ সালে এক কোটি টাকা মূলধনের ‘হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ ইন্সিওরেন্স সোসাইটি লিমিটেড’ গড়ে তোলেন ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীশচন্দ্র রায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ সেদিন এই বিমা সংস্থাটি কাজ শুরু করেছিল একেবারে কবিগুরুর বাড়ি জোড়াসাঁকো থেকেই৷

তবে আধুনিক ভারতে জীবনবিমার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল তারও প্রায় ৯০ বছর আগে ১৮১৮ সালে৷ কলকাতায় থাকা ইউরোপীয়রা ওরিয়েন্টাল লাইফ ইন্সিওরেন্স কোম্পানি চালু করে যা ছিল ভারতের মাটিতে প্রথম জীবনবিমা সংস্থা৷ সেই সময় যে কয়েকটি জীবনবিমা সংস্থা গড়ে ওঠে চা মূলত ইউরোপীয়দেরই পরিষেবা দিত৷ কোনও দেশীয় নেটিভদের বিমা এরা করত না৷ কিছুদিন পরে বাবু মতিলাল শীলের উদ্যোগে বিদেশি জীবন বিমা সংস্থা ভারতীয়দের বিমা করা শুরু করে ঠিকই তবে তারাও এদেশিয়দের জীবনকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাইত না ফলে এদেশের মানুষের পলিসির জন্য অতিরিক্ত প্রিমিয়াম চাওয়া হত৷

- Advertisement -

কিছুকাল পরে ১৮৭০ সালে বম্বে মিউচুয়াল লাইফ অ্যাসিওরেন্স সোসাইটির জন্ম হয় যা ভারতের প্রথম জীবনবিমা সংস্থা৷ এই সংস্থাটি মধ্যে এক ধরনের দেশপ্রেম ছিল বলেই মনে করা হত কারণ ভারতীয়দের বিমা প্রিমিয়াম সাধারণ হারেই নেওয়া হতে থাকে৷ তাছাড়া এই সংস্থা অনেকটা সেই বার্তাই দিয়েছিল বিমা আসলে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ফলে সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে এটা যাওয়া দরকার৷

জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৮৯৬ সালে আত্মপ্রকাশ করেছিল ভারত ইন্সিওরেন্স কোম্পানি৷ স্বদেশী আন্দোলনের সময় (১৯০৫-০৭ সালে) হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ ইন্সিওরেন্স সোসাইটি-র আগে পরে বেশ কয়েকটি বিমা সংস্থা গড়ে ওঠে৷ মাদ্রাজে ইউনাইটেড ইন্ডিয়া, কলকাতায় ন্যাশনাল ইন্ডিয়া ও ন্যাশনাল ইন্সিওরেন্স এবং লাহোরে কো-অপারেটিভ অ্যাসিওরেন্স গড়ে ওঠে ১৯০৬ সালে৷ এই সময়কালেই আবার ইন্ডিয়ান মারকেন্টাইল, জেনারেল অ্যাসিওরেন্স এবং স্বদেশী লাইফ (যা পরে বম্বে লাইফ) মতো সংস্থা গড়ে ওঠে৷

তবে ১৯১২ সালের আগে ভারতে বিমা সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনও আইন ছিল না৷ ১৯১২ সালেই লাইফ ইন্সিওরেন্স কোম্পানিজ অ্যাক্ট পাশ হয় এবং তখনই প্রয়োজন হয় বয়েসের সঙ্গে সমতা রেখে বিমার হারের টেবিল তৈরি করার এবং অ্যাকচ্যুয়ারি মারফত তার মূল্যায়ণ করার৷ তবে সেই সময়েও আইন এমনই ছিল যে বিদেশি ও দেশি সংস্থাকে আলাদা ভাবে দেখা হত এবং অবশ্য ভারতীয় সংস্থা হলে কিছুটা প্রতিকূল অবস্থায় থাকত৷

এরপরে দু-দশকে বিমা ব্যবসার বিস্তার ঘটে যেখানে ৪৪টি কোম্পানির মোট ব্যবসা যেখানে ছিল ২২.৪৪ কোটি সেখানে ১৯৩৮ সালে ১৭৬টি কোম্পানি মোট ব্যবসা দাঁড়িয়েছে ২৯৮ কোটি টাকা৷ তবে সেই সময় বেশ কিছু বিমা সংস্থা কাজ শুরু করলেও তা চালাতে না পেরে মুখ থুবড়েও পড়েছে ফলে বিমাকারীদের ক্ষতি হয়েছে৷ এজন্য ১৯৩৮ সালে জীবন বিমার পাশাপাশি অন্যান্য বিমা ক্ষেত্রটি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিমা আইন (ইন্সিওরেন্স অ্যাক্ট) ১৯৩৮ প্রণয়ন করা হয়৷ ইতিমধ্যেই জীবন বিমা জাতীয়করণের দাবি উঠতে থাকে, বিশেষত ১৯৪৪ সালে এই দাবি জোরদার হয় যখন জীবন বিমা আইন(লাইফ ইন্সিওরেন্স অ্যাক্ট) ১৯৩৮ সংশোধিত হয়৷

ভারত স্বাধীন হল৷ দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন জওহরলাল নেহরু ৷ ১৯৫৫ সালে ডিসেম্বরে লোকসভায় বিমা (সংশোধনী) বিল পেশ হওয়ার পর নেহরুর জামাতা সাংসদ ফিরোজ গান্ধী তাঁর ভাষণে ফাঁস করলেন ডালমিয়া-জৈন গোষ্ঠীর ভারত ইন্সিওরেন্স কোম্পানি কেমন করে বিমাকারীদের প্রতারণা করছে ৷ জীবনবিমা জাতীয়করণের দাবি আরও জোরদার হয়৷

এরপরে ১৯৫৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতে জীবন বিমা জাতীয়করণ করা হয় ৷ ওই সময় ১৫৪টি ভারতীয় জীবনবিমা সংস্থা ১৬টি অ-ভারতীয় সংস্থা এবং ৭৫টি প্রভিডেন্টকে এক ছাতার তলায় আনা হয়৷ জাতীয়করণ করা হয় দুটি ধাপে-প্রাথমিক ভাবে অর্ডিন্যান্স জারি করে সংস্থাগুলির ম্যানেজমেন্টকে হাতে নেওয়া হয়৷ তারপরে বিল জারি করে মালিকানা নেওয়া হয়েছিল৷ অবশেষে ১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জীবনবিমা নিগমের জন্ম হল ৷ নিগমের কেন্দ্রীয় অফিস হল বম্বে (মুম্বই) ৷

Advertisement ---
---
-----