সোয়েতা ভট্টাচার্য, কলকাতা: পথ দেখিয়েছিল সিনেমা৷ ২০০৪ সালে শিল্পা শেট্টি অভিনীত ফির মিলেঙ্গে ছবিতে প্রথম এইচ আই ভি পজিটিভ ও এইডসে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়ে ছিল৷ তবে ছবিটি দর্শক টানতে সফল হলেও সামাজিক বার্তা দিতে কতটা সফল হয়েছিল সেই প্রশ্ন আজও রয়ে গিয়েছে ৷ কারণ এই ”উন্নত সমাজে” দাঁড়িয়ে অধিকাংশ মানুষ আজও এইচ আই ভি পজিটিভদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন৷

নিজেদের শিক্ষিত বলে দাবি করলেও আজও মানুষ এইচ আই ভি পজিটিভ ও এইডসে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে পার্থক্যটা বুঝে উঠতে পারেনি বা বলা যেতে পারে বুঝতে চায়নি৷ তবে সমাজের এই অবহেলাকে এক কোণে ঠেলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার আনন্দঘর আশ্রমের ১০ জন আবাসিক প্রমাণ করলেন যে, জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে তাঁরাও পারেন৷

এই ১০ জন কিশোর কিশোরী জন্ম থেকেই এইচআইভি পজিটিভ৷ তবে তারা জীবনের এই বাস্তবের সামনে হার স্বীকার করেনি৷ তার প্রতিফলন হল ৫২৪ যোধপুর পার্কের ক্যাফে পজিটিভ৷ যাদের এক সময় সমাজ বা পরিবারের সদস্যরা ঠেলে দিয়েছিল অন্ধকারের দিকে৷ তারাই আজ সমাজকর্মী কল্লোল ঘোষের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে৷ তাঁর তৈরি করা নরেন্দ্রপুর আনন্দঘর আশ্রমই হয়ে উঠেছিল তাদের ঠিকানা৷

পড়ুন: কাশ্মীরের কুঁড়েঘরে আলো জ্বালাল ভারতীয় সেনা

পড়াশুনোর পাশাপাশি জীবনে কিছু করে দেখানোর তাগিদ ছিল তাদের মধ্যে ৷ আর সেই তাগিদই জন্ম দেয় ক্যাফে পজিটিভের ৷ যেখানে এইচ আই ভি পজিটিভ কিশোর কিশোরীরা কাজ করেন ৷ এরা সকলেই ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন ৷ এরই সঙ্গে সাবালকও হয়ে ওঠেন তাঁরা৷ এই সময়ই সবচেয়ে বড় সমস্যা তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়৷ কারণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ছোটদের হোমে ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের থাকার অনুমতি নেই ৷ তবে তাদের ঠাঁই হবে কোথায় ? সেই দুশ্চিন্তা থেকে তাদের মুক্তি দিতেই এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিকল্পনা করে তাদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার৷

তাদের উদ্যোগে এই ১০ জন কিশোর কিশোরীদের নিয়ে গড়ে ওঠে সেলফ হেল্প গ্রুপ ৷ তাদের ক্যাফেটেরিয়া আর হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ৷ তার পর পথ চলা শুরু ক্যাফে পজিটিভের৷ তবে সেই পথ খুব একটা সহজ ছিল না৷ কারণ এইচ আইভি পজিটিভদের ক্যাফে খোলার জন্য জায়গা দেবে কে? সমস্যার সমাধানও বের হয় ৷ এই সংস্থার কর্ণধার কল্লোল ঘোষের এক বন্ধু ইন্দ্রজ্যোতি দাশগুপ্ত তাঁর যোধপুর পার্কের বাড়ির গ্যারাজটি তাদের দেন ৷

পড়ুন: পায়ে পায়ে হাজার কিমি পেরিয়ে নর্মদা অভিযান বাঙালি যুবকের

তার পর ১৪ই জুলাই ২০১৮ থেকে পথ চলা শুরু হয় ক্যাফে পজিটিভের ৷ এই ক্যাফেটি সম্পূর্ণ ভাবে পরিচালনা করেন এইচআইভি পজিটিভ কিশোর-কিশোরীরা ৷ সংস্থার কর্ণধার কল্লোল ঘোষ বলেন ,”২০০৬ সালে জার্মানি গিয়েছিলাম ৷ সেখানেই একটি ক্যাফে দেখতে পাই যেটি এইচ আই ভি পজিটিভ মানুষ দ্বারা পরিচালিত ৷ তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি যে কোন পথে হেঁটে আনন্দঘরের এই আবাসিকদের কোন পথে হেঁটে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনব ৷” তবে এই পথচলা একেবারেই সহজ ছিল না ৷ তিনি বলেন, ”তবে একটি বিষয় মাথায় ছিল শুধু তাদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা নয় সমাজ কে এই ক্যাফের মাধ্যমে বোঝানোর একটা চেষ্টাও করব যে এইচআইভি পজিটিভদের থেকে দূরত্ব তৈরি করার কোনও কারণ নেই ৷

প্রথমে ক্যাফে তৈরি করার সময় মনে হয়েছিল শহরবাসীকে বোঝানোর কাজ সহজ হবে না ৷ তবে ক্যাফেটি খোলার পর গত একর মাসে গ্রাহকের সংখ্যা দেখে নিজেও বিশ্বাস করে ওঠতে পারিনি ৷ গত এক মাসে ৬৫০-র বেশি গ্রাহক এই ক্যাফেতে এসেছেন ৷ শুধু তাই নয় এরা সকলে এই ক্যাফে বিষয়ে সমস্ত জেনেই এসেছিল এখানে ৷ অর্থাৎ এই গ্রাহকেরা জানতেন এই ক্যাফেটি পরিচালিত হয় এইচআইভি পজিটিভের মানুষদের দ্বারা ৷ এইটাই আমাদের কাছে বড় সাফল্য ৷ এখানে জন্মদিনের পার্টি থেকে রেজিস্ট্রি ম্যারেজের পার্টি সব কিছুরই ব্যবস্থা করা হয়েছ৷

এই ১০ জন কিশোর কিশোরীর মধ্যে ৭ জন মেয়ে আর তিন জন ছেলে রয়েছে৷ দেশের এই প্রথম এইচআইভি পজিটিভ মানুষ দ্বারা পরিচালিত এই ক্যাফে দেখে বিভিন্ন জেলার এইচআইভি পজিটিভরা এখানে কাজ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে ৷ তাদের ইচ্ছেকে মাথায় রেখে এই সংস্থা এই ধরনের ক্যাফের সংখ্যা এই রাজ্যে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৷

----
--