অন্যের দিকে আঙুল তোলা নয়, জরুরি নিজের দিকে তাকানো : পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী 

ছবি-মিতুল দাস

 

তাঁর সংসার জুড়ে সংগীত, সংগীতের সংসার জুড়ে তিনি৷ সংগীত রিসার্চ অ্যাকাডেমি ছাড়া তাই শহরে আর কোনও ঠিকা৴না নেই তাঁর৷ রাগসংগীতকে পৌঁছে দিতে চান সকলের কাছে৷ গ্লোবালাইজেশনে বাজারি ভূত তাড়িয়ে বলেন শিকড়ে ফেরার কথা৷ আর অসহিষ্ণুতার আবহে শুধু নিজের দিকে ফিরে তাকাতে বলেন৷ আলাপনে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীসঙ্গে সরোজ দরবার

 

- Advertisement -

সংগীত সম্মেলনের উদ্বোধন এবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে৷ আপনি বলছিলেন, রাগসংগীত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভীতি যেন কাটে৷ অ্যাকাডেমি কি কোর্সভিত্তিক কোনও উদ্যোগ নিচ্ছে?

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী:  এখানে নানা সেমিনার ওয়ার্কশপ হয়৷ সকলকেই সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়৷ কিন্তু যদি বলো মিউজিক অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স এখানে হয় কি না, তাহলে বলব সেরকম কিছু নেই৷ ২০১৬ থেকে আমরা সেরকম কিছু আয়োজন করব৷ আমার মনে হয়, এটার খুব দরকার আছে৷ রাগসংগীতের প্রতি অনুরাগ বাড়াতে যদি এ ধরনের অ্যাক্টিভিটি না করা যায়, তাহলে বাজারে মার্বেলের সঙ্গে মোমফালি যেরকম মিশে যাচ্ছে সেরকমই হবে৷ এখন তো গিটার হাতে দাঁড়িয়ে পড়লেই গান হয়৷ শেখবার দরকার হয় না৷ কিন্তু সংগীত যে একটা কষ্টসাধ্য বিদ্যা একইসঙ্গে ভালোবাসারও সেটা বোঝানোর জন্য চেষ্টা করে যেতেই হবে৷

এই কষ্ট কমে যাচ্ছে বলেই কি গানের চর্চাও কমে যাচ্ছে?

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী:  নিশ্চয়ই৷ এ নিয়ে কোনও সন্দেহই নেই৷ দেখ, কোনও কাজে যদি কষ্ট না থাকে তাহলে সাফল্য আসবে কোত্থেকে? যে কোনও কাজের ক্ষেত্রেই তা সত্যি৷ বাড়িতে বসে থাকলে কি এই সাক্ষাৎকারটাই হত? হত না৷ তার জন্য কষ্ট করে আসতে হয়েছে৷ সেরকমই নিজের মধ্যে যদি কোনও বিদ্যাকে নিতে হয়, ধারণ করতে হয়, তবে প্রচণ্ড কষ্ট করতে হয়৷  যিনি যে কাজই করেছেন, তিনি জানেন কিছু অর্জন করতে গেলে কতখানি কষ্ট করতে হয়৷

রাগসংগীতের প্রতি সাধারণের একটা ভীতি আছে৷ আবার উস্তার রসিদ খান বা কৌশিকি চক্রবর্তীর গান শুনতে কিন্তু প্রচুর মানুষ আসেন৷ এই ফারাকটা কীভাবে তৈরি হচ্ছে?

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী:   এর মূলেও কিন্তু ওই কষ্ট৷ কঠিন পরিশ্রম৷ একটা সময় ছিল যখন আমি ১৩-১৪ ঘণ্টা করে রেওয়াজ করেছি৷ এখানে যাঁরা থাকেন তাঁরা জানেন ৭-৮ বছর ধরে আমি সূর্য দেখিনি, চাঁদও দেখিনি৷ শুধু শেখবার জন্য৷ সুতরাং পরিশ্রম না করলে কিছু হবে না৷

এই অ্যাকাডেমিই তো আপনার ঘর হয়ে গিয়েছে, তার বদলে বদলে যাওয়া কেমন লাগে?

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী:   আমার তো আর কোনও ঠিকানা নেই৷ ‘১ নং এনএসসি বোস রোড কেয়ার অফ সংগীত রিসার্চ অ্যাকাদেমী’ ব্যাস৷ আর একটা জিমেল অ্যাড্রেস ছিল৷ এই ঘরে আমি যখন থাকতাম তখন সবাই ভূতের বাড়ি বলত৷ একাই থাকতাম তখন৷ এখানেই আমার বিয়ে৷ কন্যার জন্ম৷ এখন যে ঘরে কথা বলছি এখানেই

এই ঘরেরই স্মৃতিচারণায় পণ্ডিতজি৷ ছবি-মিতুল দাস
এই ঘরেরই স্মৃতিচারণায় পণ্ডিতজি৷ ছবি-মিতুল দাস
কত কত ঘটনা ঘটেছে৷ জাকির ভাই তবলা বাজাতে বাজাতে এখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন৷ ঘামে ভিজে গিয়েছে শরীর৷ আমার পাঞ্জাবি পরে আবার পরের হাফে অনুষ্ঠান করেছেন৷ এই ঘরেই আলি আকবর খাঁ সাহেব বাজিয়েছেন, শিখিয়েওছেন৷ রবিশংকরজি এই ঘরে বসেই কথা বলেছেন৷ এ ঘর তো যেমন তেমন জায়গা নয়৷ কত স্মৃতি যে ঘিরে আছে৷ আমি আর জগদীশপ্রসাদ ছিলাম মিউজিসিয়ান স্কলার৷আমাদের গ্রেডেশন টেস্টের জন্য বাইরে টিভি বসাতে হত৷ সকলে ভিড় করে দেখতেন যে,  জগদীশ আর অজয়ের গ্রেডেশন টেস্ট হচ্ছে৷ এ ঘর সাধারণ জায়গা নয়৷ যাঁরা আজও সবকিছু মূল্য বোঝেন তাঁরা জানেন৷ আসলে আমাদের দেশও তো অত্যন্ত সমৃদ্ধ দেশ৷আমরা এখন সব ভুলে যাচ্ছি৷ অথচ সারা পৃথিবীকে সংস্কৃতি শিখিয়েছি আমরাই৷ আমরা পৃথিবীকে জামাকাপড় পরা শিখিয়েছি৷ যখন পশ্চিমে কোনও সভ্যতাই গড়ে ওঠেনি, তখন আমাদের এখানে বেদ-উপনিষদ সব তৈরি হয়ে গিয়েছে৷ আমরা এই দেশের লোক৷ এই সমৃদ্ধি, ঐতিহ্য আমাদের ভুলে গেলে চলবে না৷

আপনার কি মনে হয়, আমরা আমাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি?

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী:   নিশ্চয়ই৷ আজকে আমাদের এখানে ‘মাদারস ডে’ পালন করা হয়৷ আমাদের মায়েরা কি ‘মাদারস ডে’ কি কার্ড পাওয়ার জন্য? আমরা এখন পশ্চিমের অনুকরণে কার্ড নিয়ে হোমে গিয়ে মাকে দেখে আসছি৷ এটা ভারতের সংস্কৃতি নয়৷ আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ধৈর্য,ভালবাসা, বিশ্বাস, সমপর্ণ আমাদের সম্পদ৷ এসব আমরা ভুলতে বসেছি৷ কেননা পশ্চিম থেকে বাজারের সবকিছু ঢুকে পড়েছে৷ গ্লোবালাইজেশনের যে ভূত ঢুকেছে তা শুধু বেচা আর কেনার কথা বলে৷ ও দিয়ে কিছু হবে না৷

এই যে এত অসহিষ্ণুতা, সকলে এ নিয়ে নানারকম মন্তব্য করছেন৷ আপনার কী মত?

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী: আমি বিরোধের মধ্যে দিয়ে কখনও যেতে চাই না৷ বিয়োগের মধ্যে দিয়েও নয়৷ আমি রামকৃষ্ণের ভক্ত৷ তাই যোগের কথা বলি৷ আসলে হল ভালবাসা৷ ভালবাসতে পারলে কোথাও কোনও বিরোধ নেই৷ নাহলেই সমস্যা৷ আমার সংগীত আমাকে চিরকাল সেই সংহতির কথা বলেছে৷  আগেও বলছিলাম যে, গোলাম আলি খাঁ সাহেব হরিওঁ তৎসৎ গাইছেন৷ বিসমিল্লা খাঁ সাহেব সানাইয়ে ‘সিয়া সঙ্গ..’ বাজাচ্ছে৷ আমি রেওয়াজ করতে গিয়ে প্রতিদিন ‘আল্লা জানে’ গাই৷ সংগীত আমাকে এই শিক্ষাই দিয়েছে৷সে কথাই আমি সকলকে বলব৷

অসহিষ্ণুতা বা পশ্চিমী হাওয়া, এসবের মধ্যে একজন তরুণ কোন পথে এগোবে? আপনার কী পরামর্শ?

পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী:  নিজের দিকে তাকাও-এই একটাই কথা৷ যদি অন্য কারোর দিকে তুমি আঙুল তোলো, তাহলে তিনটে আঙুল তোমার নিজের দিকে ফিরে থাকবে৷ তাই অন্যের দিকে তাকিয়ে লাভ নেই৷ লুক অ্যাট ইওরসেলফ৷ এটাই মন্ত্র৷

 

 

 

Advertisement ---
---
-----