বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা, রহস্যের পিছনে মাওবাদী-চক্র?

সুপর্ণা সিনহা রায়, কলকাতা: বাঁকুড়া বা পশ্চিম মেদিনীপুরে বাঘ নিয়ে রীতিমত দক্ষযজ্ঞ চলছে৷ বাঘ খুঁজতে ওড়ানো হচ্ছে ড্রোনও৷ তবে জায়গায় জায়গায় বাঘের পায়ের পায়ের ছাপ ছাড়া পাওয়া যায়নি কিছুই৷ আর এখান থেকেই বেশ কিছু প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে৷ আদৌ কি বাঘ আছে ওই জঙ্গলে? নাকি কোনও চক্র কাজ করছে এর পেছনে?

বাঘের চরিত্র সম্পর্কে যা জানা যায় তা হল সাধারণ প্রাণীর মতই বাঘেরও খিদে পাওয়া উচিত৷ এতদিন ধরে বাঘ রয়েছে এলাকায় এই খবর প্রচার পেয়েছে তার সঙ্গে বেশ কিছু পায়ের ছাপ পাওয়া গিয়েছে বিভিন্ন এলাকায়৷ সবই জঙ্গলে৷

কিন্তু প্রশ্ন হল সেই জঙ্গলে বাঘের খাবার কি রয়েছে? বাঘ প্রায় পনের দিন যাবত কিছুই না খেয়ে শুধু একবার বাঁকুড়া থেকে পশ্চিম মেদিনীপুর আবার পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে বাঁকুড়ার জঙ্গল মহলে শুধু ঘুরেই বেড়াচ্ছে? পেটে খিদে নিয়ে? তা হওয়া একেবারেই সম্ভব নয়৷

- Advertisement -

তাহলে সেই বাঘ খাচ্ছে কি? বলা হয় যে কোনও পশুই তার খাবার যদি পুরোটা খেতে না পারে সেক্ষেত্রে তার ফেলে রাখা খাবার সে পরের দিন গিয়ে সেই জায়গা থেকেই আবারও খাওয়া শুরু করে৷ এক্ষেত্রে প্রশ্ন হল গোটা জঙ্গলে বাঘের খাওয়া সেই খাবারের সন্ধান পাওয়া গেল না৷ শুধুমাত্র বাঘ এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হেঁটেই বেড়াচ্ছে!

যদি ধরে নেওয়া হয় বাঘের খাওয়া সেই খাবারের সন্ধান ঘন জঙ্গলে পাওয়া যায়নি সেক্ষেত্রে ড্রোনের সাহায্য নিয়ে তল্লাশি চালানোর সময়ও কিছু তথ্য পাওয়ার কথা৷ তাহলে কি বাঘ খাবার খাচ্ছে না? তাহলে সেই বাঘ এতদিন না খেয়েও শরীরের ক্ষমতা ধরে রেখেছে কি করে যার ফলে সে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে এমাথা থেকে ওমাথা৷ বলা হয় বাঘ যখন জঙ্গলের প্রাণী শিকার করতে পারেনা তখনই সে লোকালয়ের কাছে চলে আসে গবাদি পশু বা মানুষ ধরার জন্য৷

এক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় বলা হয়, বাঘ তখনই এরকমটা করে যখন তার শারীরিক ক্ষমতা কমে আসে৷ অর্থাৎ সে যখন বন্য প্রাণীর পিছনে দৌড়তে অক্ষম হয়ে পড়ে৷ সেটা হয় একমাত্র বাঘের বয়স হয়ে গেলে ছোটার ক্ষমতা হারিয়ে ফললে বা বাঘ অসুস্থ বা কোনও ভাবে আঘাত পেয়ে দৌড়নোর ক্ষমতা হারালে বাঘের চরিত্রে পরিবর্তন আসে৷ এক্ষেত্রে এই বাঘ বিরাট এলাকার জঙ্গলে শুধু ঘুরেই বেড়াচ্ছে কিন্তু কোনও দিক দিয়েই লোকালয়ে ঢুকে পরছেনা৷ বা রাতের অন্ধকারে গবাদি পশুদের উপর হামলাও করছেনা৷

বাঘ খাচ্ছেনা তাই তার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার বিষয়টাও বোধহয় উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন কিছু মানুষ৷ যেখানে বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া যাচ্ছে তার আশেপাশে বাঘের মলমূত্রের কোনও চিহ্ন মেলেনি৷ এদিকে আবার জঙ্গল লাগোয়া এলাকার বাসিন্দারা বলছেন বহু বছর ধরেই ওই এলাকায় তাঁদের বাস কিন্তু কোনওদিন বাঘ আসার কথা তাঁরা কখনও শোনেননি৷ এই প্রথম৷

আবার এটাও বলা হয় হাতি যেখানে থাকে বাঘ সেই চৌহদ্দি মাড়ায়না৷ তাই বাঘ তাড়াতে হাতির মলও ব্যবহার করা হত বলে বলা হয়৷ তাহলে কি রয়েছে জঙ্গলে? যে জঙ্গলে কয়েকদিন ধরে হাতিও ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই জঙ্গলে থাকা বাঘ হাতির উপস্থিতি নিয়ে সচেতন থাকবে সেচাই স্বাভাবিক৷ তবু একার পর এক দিন বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঘের পায়ের ছাপ মিলছে৷

এত টাকা পয়সা খরচ করে যে তল্লাশি অভিযান চালান হচ্ছে তার ফল কি মিলছে? প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই৷ এক রাতের মধ্যে তার এলাকা পরিবর্তন করে ফেলছে এই ভবঘুরে বাঘ৷ এযাবৎ যতগুলো পায়ের ছাপ মিলেছে তার থেকে বাঘ একটাই নাকি বাঘের পাল এসেছে জঙ্গলে তার হিসেব এখনও মেলেনি৷ বাঘ না বাঘিনী সে প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি এখনও৷ তদন্তের গতি প্রকৃতি শুধু বাঘকে ক্যামেরাবন্দি করার দিকেই রয়েছে বলে মশকরা করছেন কেউ কেউ৷

কেউবা বলছেন এই বাঘের আড়ালে কোনও অসাধু অভিপ্রায় জড়িয়ে নেইতো! কারণ রাতের অন্ধকারে বাঘ শুধু যে তার পায়ের ছাপ রেখেই চম্পট দিচ্ছে৷ আশ্চর্যের বিষয় রাতে মশাল জ্বালিয়ে খোঁজাখুঁজির চেষ্টাও চলছে কিন্তু বাঘের গর্জনও এখনও পর্যন্ত কারও কানে আসেনি৷ এ বাঘ কি খুব শান্ত স্বভাবের যার কিনা খিদে তৃষ্ণা কিছুই পায়না! গর্জনও করেনা৷ নাকি সে বাঘ এতই ক্ষুধাতুর যে এক এক দিনে গোটা গোটা খাবার একবারে খেয়ে ফেলছে কোনও প্রমাণ না রেখে৷

বাঘিনী যদি তার সঙ্গী বাঘকে খুঁজে না পায় মেটিংয়ের জন্য, তখন বাঘিনী গর্জন করে৷ সেই গর্জনও কেউ শোনেননি৷ তা হলে বাঘের অস্তিত্ব কোথায়, শুধুমাত্র পায়ের ছাপে? পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়ায় বাঘের যে পায়ের যে সব ছাপ পাওয়া গিয়েছে, তা দেখে বোঝা যাচ্ছে বাঘ একটাই৷

পায়ের ছাপ বাঘিনী বা বাঘ, তার বয়স কত, তার আকার, সে কোন প্রজাতির এমন বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করা সম্ভব৷ কিন্তু, এ সব বিষয়ে কোনও তথ্য বন দফতরের তরফে এখনও প্রকাশ করা হয়নি৷ তা হলে, বাঘ নিয়ে তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে, সেটা কি শুধুই ড্রোন ওড়ানোয়?

কোথাওই এপর্যন্ত পাওয়া যায়নি কোনও রক্তের দাগ৷ যেখানে কিনা বাঘ প্রাণী মেরে খেয়েছে৷ চারিদিকে উৎসাহী এলাকাবাসী থেকে বনদফতরের কর্মীরা বাঘ খুঁজে চলেছেন৷ গতকাল শনিবার সারেঙ্গার সারুলিয়া, কয়মা, বামনীশোলের পর আজ রবিবার সকালেই তথাকথিত সেই ‘বাঘের পায়ের ছাপ’ দেখা গেল সিমলাপালের পিঠাবাকড়া গ্রামের মাঠে৷

যে জায়গায় বাঘের পায়ের ছাপ মেলে আজ তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে বাঘ পায়ের ছাপ রেখে গিয়েছে৷ মাঠে বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়ার অর্থ সে জঙ্গল থেকে রাতের অন্ধকারে বাইরে লোকালয়ের দিকে এসেছে৷ তাহলে সে লোকালয়ে খাবারের সহজলভ্যতা থাকা সত্বেও যাচ্ছেনা! এমনকি বড়সড় ছাগলকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করার পরেও বাঘ সেই ছাগলকে ছুঁয়ে দেখতেও যায়নি৷ বাঘের কি তাহলে পশু সুলভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পাল্টে গেল? প্রশ্ন উঠছে তা নিয়েও৷

এদিকে বাঘ নিয়ে প্রচার মারফত সাধারণ মানুষকে জানান হচ্ছে তাঁরা যেন ভয় না পান৷ এলাকায় বাঘ রয়েছে তা জেনেও কোনও মানুষ আছেন যাঁরা রাতে ভয় পাবেননা? প্রশ্ন আরও কিছু উঠে আসছে৷ এলাকায় বাঘের ভয় দেখিয়ে মানুষকে ঘরবন্দি করে রাখার জন্যই এই বাঘের গল্প ফেঁদে মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে দিয়ে কোনও অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে চাইছেনাতো কেউ? বা চোরাচালানের রাস্তা পরিষ্কার করার এ এক মোক্ষম হাতিয়ার ভেবে কাজ চলছেনাতো? সে প্রশ্নও তুলছেন এখন অনেকেই৷ কারণ প্রায় মাস পার করতে চলল এই বাঘের গল্পে কিন্তু বাঘের গুটিকয় পায়ের ছাপ ছাড়া আর কিছুই মেলেনি তেমন হাতে৷

কেউ কেউ এটাও বলছেন, পশ্চিম মেদিনীপুর ও বাঁকুড়ায় জঙ্গলমহলের যে যে এলাকাগুলিতে মাওবাদী কার্যকলাপ বেশি ছিল, সেই সব এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া যাচ্ছে৷ স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠছে, মাওবাদী কার্যকলাপ আবার বাড়ানোর জন্য নতুন করে প্রস্তুতি তৈরি হচ্ছে না তো?

গোটা বিষয়ে আলিপুর চিড়িয়াখানার পশু চিকিৎসক শিবাজি ভট্টাচার্য জানান, বাঘ ও হাতি একই জঙ্গলে থাকতে পারে৷ কিন্তু তারা তাদের নিজস্ব এলাকা ভাগ করে নেয়৷ যেহেতু দুটি প্রাণীর খাদ্যাভ্যাস আলাদা সুতরাং তারা এলাকা ভাগ করে নিলেও হাতির বাচ্চাদের বাঘ আক্রমণ করতে পারে তাই কেউ কারো এলাকায় দখলদারি করেনা৷

তিনি আরও জানান, লালগড় ও বাঁকুড়ার জঙ্গল মহলের যে দূরত্ব সেই দূরত্ব বারবার অতিক্রম করা বাঘিনীর পক্ষে সম্ভব৷ কোনও বাঘিনী যদি মেটিং এর সময় বাঘের খোঁজে পারি দেয় তখনই সে অনেকটা পথ অতিক্রম করতে পারে৷ তাছাড়া কোনও বাঘ যদি নিজের এলাকা স্থাপনের চেষ্টা করে সে এইভাবে ভবঘুরে হয়ে ঘোরেনা এতদিন ধরে৷

সেক্ষেত্রে যদি সত্যিই বাঘের অস্তিত্ব থেকে থাকে ওই এলাকায় তাহলে তা বাঘিনী হওয়ার সম্ভাবনার উপরই বেশি জোর দেয়৷ বাঘ তাহলে খাচ্ছে কি? সে প্রশ্নের উত্তরে আলিপুর চিড়িয়াখানার পশু চিকিৎসক শিবাজি বাবু জানান, “বাঘ তার টেরিটোরির বাইরে তখনই বেরোয় যখন তাকে সেই জায়গা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়৷ আমরা দেখেছি বাঘ তার ফুড হ্যাবিট চেঞ্জ করে কাঁকড়াও খায় সুন্দরবনে৷ হতে পারে সে গভীর জঙ্গলে ছোটখাটো খাবার খাচ্ছে৷ যা লোকের নজরে পরছেনা৷”

মানুষের নজরে না পরলেও ড্রোন ক্যামেরায় কিছু তো পাওয়ার কথা৷ তাও কেন কোনও প্রমাণই পাওয়া যাচ্ছেনা৷ কোনও আহত বাঘের ছোট জন্তু ধরার থেকেও অনেক বেশি সহজ এলাকার গবাদি পশু শিকার করা৷ কিন্তু কোথাও কারও গবাদি পশু নিখোঁজ হওয়ার বা লোকালয়ে বাঘের হানার খবর মেলেনি৷ আবার বাঘ মাঠ পর্যন্ত বেরিয়ে পায়ের ছাপ রেখে যাচ্ছে কিন্তু লোকালয়ে ঢুকছেনা এবং খাবার খেলেও তার পায়ের ছাপের পাশাপাশি এলাকায় তার মলমূত্রের অস্তিত্ব নেই কেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার কাছেও গোলমেলে লাগছে৷”

Advertisement ---
-----