মহম্মদ সেলিমের কি ফ্রয়েডীয় মনোবৈকল্য দেখা দিল?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: সিপিএম নেতা তথা সংসদ সদস্য মহম্মদ সেলিম দিন কয়েক আগে এক কুৎসিত মন্তব্য করেছেন৷ মন্তব্যটি এই যে, পুলিশের প্যান্ট খুললেই নাকি তৃণমূলের ঝাণ্ডা দেখতে পাওয়া যায়৷ ঠিক কবে থেকে তিনি তা প্রত্যক্ষ করছেন তা অবশ্য জানি না৷ নেহার বানু কেসের সময় তো আর তৃণমূল কংগ্রেসের রাজত্ব ছিল না৷ তখন পুলিশ কি প্যান্টের বদলে ধুতি পরত? আর সেই ধুতির উপরে কি লাল ঝাণ্ডা জড়ানো থাকত?

সিপিএম নেতৃবৃন্দ ও তাঁদের চ্যালাচামুণ্ডারা এক সময় ‘কংগ্রেসি কালচার’ বলে ব্যঙ্গ করে নানা রকম কুৎসিত রসিকতা ও অঙ্গভঙ্গি করতেন৷ আর নিজেরা সুস্থ মার্কসবাদী কালচারের বড়াই করতেন৷ এখন তাঁদের সেই মার্কসবাদী নান্দনিক সুস্থ কালচার ফুটে ফুটে বের হচ্ছে৷ বোধহয় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় ফিরে আসাটা তাঁদের কাছে যতই সুদূরের নীহারিকার মতো লাগছে, ততই তাঁদের হতাশা বিভিন্ন কুৎসিত মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে ফুটে বের হচ্ছে৷

এই কালচারটা অবশ্য সেই সিঙ্গুর ইস্যুতে বিনয় কোঙারের ‘পশ্চাদ্দেশ’ দেখানোর নির্দেশের সময় থেকেই পশ্চিমবঙ্গবাসী টিভিতে দেখছেন৷ তার পর অনিল বসু, আনিসুর রহমান কেউই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করা থেকে বাদ পড়েননি৷ এই ধরনের কুৎসিত ভাষা প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে বিপ্লবী মারণ-উচাটনের শিক্ষা অবশ্য মাও সে-তুংয়েরই পন্থা৷ ক্ষমতায় আসার অনেক আগে থেকেই তিনি সেই পন্থা নিয়েই নিজের রাস্তা পরিষ্কার করেছিলেন এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরকার অন্যান্য চালেঞ্জারকে হটিয়ে দিয়েছিলেন৷

সিপিএমের এই কালচারটা অবশ্য অনেক আগে থেকেই ওই পার্টির ক্যাডারবর্গকে রপ্ত করানো হয়েছিল৷ বিশেষ করে ভোটের সময় প্রয়োগ করার জন্য৷ এবং, সেই ‘ওষুধ’টা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পার্টি নেতৃবৃন্দ এবং ক্যাডারবাহিনী প্রতিপক্ষের উপর প্রয়োগ করতেন৷ কারণ তাঁদের শেখানো হয়েছিল, এটা মহৎ বিপ্লবী কর্ম৷ আর কমিউনিস্ট কালচারে তো আর লিঙ্গবৈষম্য থাকে না! অতএব, নান্দনিকতার মতো পৈশাচিকতাতেও কোনও নারী-পুরুষ ভেদ থাকা উচিত নয়৷

১৯৮৭ সালের ভোটের সময়েই ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র এক বিশিষ্ট সাংবাদিক উত্তর ২৪ পরগনার পুর এলাকায় নির্বাচন কভার করতে গিয়ে সিপিএমের নেতানেত্রীর মুখে অবিশ্রান্ত এই ধরনের বিপ্লবী বুলি শুনে খবর না-করেই ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ ভোটের দিন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র গাড়ি থামিয়ে সেইসব ধবধমে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ভদ্রলোক এবং লাল পেড়ে শাড়ি পরা ভদ্রমহিলারা এমন সব অসাধারণ ‘বচন’ সেই সাংবাদিককে শুনিয়েছিলেন যা তিনি কোনও কুলি ধাওড়াতেও শোনার আশা করেননি৷ আসলে, যেখানে ওই সাংবাদিক ভোটের খবর করতে গিয়েছিলেন সেখানে তখন প্রবল বেগে রিগিং চলছিল৷

এঁরাই অবশ্য ভোটের পরে ‘নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা’য় জিতে পাড়ায় পাড়ায় ‘সমন্বয়ে’র মাধ্যমে ‘র-সু-ন’ (রবীন্দ্র-সুকান্ত-নজরুল) সন্ধ্যার আয়োজন করতেন৷ মাথায় ফুল-টুল গুঁজে, হেলেদুলে, মোটা গলায়, নাকি সুরে সে এক বিচিত্র কাণ্ড! তখন সবাই সুস্থ কালচারের অনুসারী৷ বাম আমলের সেই ‘সোনালি’ দিনগুলিতে পুলিশের প্যান্টের তলায় ঠিক কী থাকত, তা একমাত্র সেই সময়কার পুলিশ কর্মী-অফিসাররাই বলতে পারবেন৷

সাধারণ ভারতবাসী তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানেন এবং বোঝেন, কোনও সৎ পুলিশ অফিসার যদি নির্ভীক ও নিরপেক্ষভাবে আইনের পথে চলতে চান, তাহলে তাঁদের হাজারো ঝক্কি পোহাতে হয়৷ এমনকী খুনও হয়ে যেতে হয়৷ ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট আসার আগে যখন যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল তখনই সেইসব পুলিশ অফিসারের সঙ্গে উপমুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশ মন্ত্রী জ্যোতি বসুর ঝামেলা বাধত, যাঁরা মিথ্যা মামলায় কাউকে ফাঁসাতে পারতেন না কিংবা সিপিএম ক্যাডারদের খুন-ধর্ষণ-তাণ্ডব বা অগ্নিসংযোগের কেস চেপে দিতে পারতেন না৷

পুলিশ মানেই ধোয়া তুলসীপাতা এ কথা কোনও দেশেই কেউ বলবে না৷ এমনকী আমেরিকার মতো দেশেও৷ ভারতে ১৯৫০-এর দশকে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি মূলা পুলিশকে ‘উর্দিধারী ক্রিমিন্যাল’ বলে সম্বোধন করেছিলেন৷

মহম্মদ সেলিম যদি প্রকৃতই সুস্থ রাজনীতিক হতেন এবং ‘বিপ্লবী’ তরুণ প্রজন্মের সামনে তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ-প্রশাসনের দলদাস মনোভাবকে তুলে ধরতে চাইতেন, তাহলে তিনি বিচারপতি মূলা-র মন্তব্যটিই তুলে ধরে উদাহরণ দিতে পারতেন৷ কিন্তু এক সময়কার এনসিসি ক্যাডেট তথা দিল্লির আরডি প্যারেডে (২৬ জানুয়ারির কুচকাওয়াজ) অংশগ্রহণকারী মহম্মদ সেলিম নিজের বিপ্লবী স্বরূপ তুলে ধরতে গিয়ে বৃদ্ধত্বের চৌকাঠে দাঁড়িয়েও পুলিশ সম্বন্ধে যে ভাষা প্রয়োগ করলেন, তা কেবল খালাসিটোলাতেই মানায়৷ কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মুখে শোভা পায় না৷