নিখিলেশ রায়চৌধুরী: অসমে পঞ্জিকরণ নিয়ে রাজনৈতিক তরজা আরম্ভ হয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, অসমে ‘বাঙালি খেদা’র ষড়যন্ত্র চলছে৷ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরের বক্তব্য, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস অনুপ্রবেশকারীদের পক্ষ নিয়ে রাজনীতি করছে৷ আপাতত এই তরজা চলবে৷ তবে পঞ্জিকরণের এই কাজ অনেক আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল৷

আমি নিজে বিজেপি-র রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না৷ কিন্তু এটা মানতেই হবে, অসম, ত্রিপুরা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে পঞ্জিকরণ না করলে দেশের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে৷ বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া রাজ্যগুলির মধ্যে অসম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গেই অনুপ্রবেশের হার সব চাইতে বেশি৷ তার মধ্যে অসমে তো অনুপ্রবেশকারী শক্তি একেবারে সাম্প্রদায়িকভাবে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করার ক্ষমতা ধরে৷

গোড়ার দিকে অসমের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে অনুপ্রবেশের হার ছিল বেশি৷ এখন তারা অসম, মেঘালয় সহ উত্তরবঙ্গেও ছড়িয়ে পড়েছে৷ এই অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে মুসলিমরা যেমন আছে, ঠিক তেমনই হিন্দুদের সংখ্যাও কম নয়৷ বাংলাদেশ যুদ্ধের পর থেকেই এরা বেশিরভাগ এসে ভারতে ঢুকেছে এবং এদেশের হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান নির্বিশেষে প্রকৃত নাগরিকদের হটিয়ে সরকারি চাকরি-বাকরি সহ বিভিন্ন জায়গায় গেড়ে বসেছে৷ পয়সাক়ড়ি থাকায় স্থাবর সম্পত্তিও বানিয়েছে স্থানীয় মানুষের চাইতে অনেক দ্রুত হারে৷ বলা বাহুল্য, রাজনৈতিক আনুকূল্য তারা ক্রমাগত পেয়েছিল বলেই এটা সম্ভবপর হয়েছিল৷

একাত্তরে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে তখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ বাঁচানোর জন্য ভারতে পালিয়ে আসেন৷ সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে অনেক সাংবাদিকই প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি এই উদ্বাস্তু স্রোত আটকাচ্ছেন না কেন? ইন্দিরা গান্ধী তার উত্তরে বলেছিলেন, মানুষ প্রাণভয়ে পালিয়ে আসছে, আপনারা কী চান– আমি তাদের গুলি করে মেরে ফেলি! মূলত তাঁরই দুঃসাহসি প্রচেষ্টায় জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ৷ তার কারণ, সেই ঠাণ্ডা যুদ্ধের কালে আমেরিকা, চীন কেউই চায়নি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হোক৷ কারণ তারা ছিল পাকিস্তানের সামরিক শক্তির মদতদাতা৷

স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার পর অনেকেই পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে আবার নতুন দেশে ফিরে যান৷ কিন্তু মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর চিত্রটা ফের বদলাতে আরম্ভ করে৷ বিশেষ করে, ১৯৭৭ সালে ভারতে রাজনৈতিক পটবদলের পর৷ দুদেশের মানুষের মধ্যে সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে কোনও বাধা ছিল না৷ কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেকেই ধরে নেয়, দুই পারেই যখন বাংলাভাষীদের বাস তখন সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে মৌরসি পাট্টা বানাতে বাধা কোথায়? তাদের এই ধারণায় রাজনৈতিক ইন্ধন জোগানোর মতো লোকেরও অভাব ছিল না৷

দুই বাংলাকে এক করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া আমেরিকান গুপ্তচর সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি-র (সিআইএ) অনেক দিনের পুরানো প্রজেক্ট৷ কারণ, বাংলাদেশের জন্ম আটকাতে না-পারায় ইন্দিরা গান্ধীর উপর তাদের রাগ ছিল৷ সেই রাগ মেটাতে তারা এই প্রজেক্ট বানায়৷ পরবর্তীকালে তাদের তাঁবেদার হিসাবে পাকিস্তানের শাসক জেনারেল জিয়া-উল হক সেই প্রজেক্টের কাজ চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেন৷ পশ্চিমবঙ্গের অনেক রাজনীতিকই সেই প্রজেক্টের জন্য সেদিন পরোক্ষভাবে লড়তে রাজি হয়েছিলেন৷ অবশ্যই তার জন্য তাঁরা পয়সা পেতেন৷

9/11-র পর দুই বাংলা মিলনের সেই প্রজেক্ট কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়৷ কিন্তু তা যে একেবারে ঠান্ডাঘরে পাঠানো হয়নি, পরবর্তীকালের নানা পদক্ষেপ থেকেই তা পরিষ্কার৷

পাকিস্তানের সামরিক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) প্রজেক্টে অবশ্য শুধু পৃথক বাঙালিস্তান ছিল না৷ আমেরিকার ঝানু কূটনীতিক মেজর কুপল্যান্ডের রিপোর্ট মেনেই তারা ভারতকে আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মতলব এঁটেছিল৷ কুপল্যান্ডের রিপোর্টের দাওয়াই ছিল ‘অপারেশন বলকানাইজেশন’৷ অর্থাৎ, ভারতকে টুকরো টুকরো করে আলাদা আলাদা দেশ গড়ে তোলা৷ সেইমতো আইএসআই একটি মানচিত্রও তৈরি করে৷ সেখানে বাঙালিস্তান ছাড়াও রাজপুতানা সহ বিভিন্ন দেশ দেখানো হয়েছে৷ ঠিক যেন প্রাচীনকালের ষোড়শ মহাজনপদ! আর এই প্রজেক্টকে বাস্তবায়িত করার জন্য জিয়া-উল হক একটি অপারেশনাল প্ল্যানও তৈরি করান৷ সেই প্ল্যানের নাম ছিল অপারেশন টোপাজ৷ অর্থাৎ, ভারতের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ৷ এই যুদ্ধ চালানোর জন্যই বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসবাদীদের মদত জোগাত আইএসআই৷

এই প্ল্যানের এখন ঠিক কী অবস্থা অবশ্য জানা নেই৷ তবে এমন ট্রোজান হর্স এদেশে অনেকেই আছে যাদের কাছে পঞ্জিকরণ এক মারাত্মক সমস্যা৷ তার কারণ, তারা গাছ থেকে পেড়েও ফল খেতে চায় এবং গাছের তলা থেকেও কুড়াতে চায়৷ এ নিয়ে চেপে ধরলেই তারা ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’-এর মতো সিনেমার প্রসঙ্গ টেনে আনে৷ কিন্তু নিজেদের লোভের কথাটা কদাচ বলে না৷

বেগম খালেদা জিয়া যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন আইএসআইয়ের অপারেশনাল হেডকোয়ার্টার্স ছিল ঢাকায়৷ মূলত বাংলাদেশের মাটিকে কাজে লাগিয়েই পাকিস্তানি সেনাকর্তা জেনারেল পারভেজ মোশারফ তখন ভারতে সন্ত্রাস ও নাশকতা চালানোর রাস্তা নিয়েছিলেন৷ পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরায় জনমানচিত্র মারাত্মকভাবে বদলে গিয়েছিল ঠিক ওই সময়েই৷ সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে কারা রাজত্ব করতেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিশ্চয়ই নন৷

পঞ্জিকরণের প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাঙালি খেদা’র কথা বলছেন৷ হয়তো তিনি কিছু আশঙ্কা করছেন৷ তবে তাঁর আশপাশে কানভাঙানি দেওয়ার মতো লোকের অভাব নেই৷ ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের কানভাঙানি দেওয়ার মতো লোকের অভাব কখনও ঘটেনি৷ খেদের বিষয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় নন৷

  • মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
----
--