এনটিসিএর গাইড লাইন মানা হয়েছিল কি লালগড়ে উঠছে প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার, আলিপুরদুয়ার: কোনও নতুন জায়গায় কখনও বাঘের হদিশ মিললে ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটির স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিওর সংক্ষেপে ‘এসওপি’ মেনে কাজ করতে হয় সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বনদফতরকে। এখন প্রশ্ন আসছে এনটিসিএর ওই বিশেষ এসওপি কতটা মানা হয়েছিল লালগড়ের জঙ্গলে প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বসবাসকারী বাঘটির ক্ষেত্রে?

কি এই এসওপি? বাঘের অস্তিত্ব প্রমাণিত হওয়ার সাথে সাথেই সেই জায়গাকে চিহ্নিত করে ম্যাপ তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষের আনাগোনা বন্ধ করার জন্য জারি করতে হবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ১৪৪ ধারা।ওয়াইল্ড প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কোন একজন দক্ষ বনাধিকারিককে মাথায় রেখে গড়তে হবে একটি মনিটরিং কমিটি।

ওই কমিটিতে থাকবেন একজন দক্ষ স্যুটার যিনি বাগে পাওয়া মাত্রই ঘুমপাড়ানি গুলি ছুড়ে বেহুঁশ করতে পারবেন বাঘকে। সঙ্গে থাকবে একটি পূর্নাঙ্গ ভেটেনারি ইউনিট। প্রয়োজনীয় গাড়ি, গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ডিভাইস, ড্রোন ক্যামেরা, ক্যামেরা ট্র্যাপ, নাইট ভিশন ক্যামেরা,বাইনোকুলার ইত্যাদি।এলাকায় অবশ্যই মোতায়েন করতে হবে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী।

আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল ওই বাঘের গতিবিধির উপর নজর রাখার জন্য অবশ্যই গঠন করতে হবে ২৪x৭ এর একটি স্পেশাল টাস্ক ফোর্স।এছাড়া ওই নির্দিষ্ট এলাকায় রীতিমত খুঁটি গেড়ে বসে পুরো বিষটির উপর কড়া নজরদারি চালাতে হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের শীর্ষ বনকর্তাদের।

জানা গিয়েছে, এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়নি।বাড়তি পুলিশের বন্দবস্ত ছিল না।স্পেশাল টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়নি।যার সুযোগ নিয়ে হাজার হাজার উৎসুক জনতা বাঘের দেখা পাওয়ার জন্য অনায়াসে ভিড় জমাতে পেরেছে।যা বনদফতরের কাজে বিশেষ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওই এলাকার বিভাগীয় বনাধিকারিক ও সিসিএফ পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত বনকর্তা ওয়াইল্ড লাইফ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত নন।ওই কাজের জন্য দক্ষ প্রচুর বনাধিকারিক রয়েছেন গোটা রাজ্যে।

প্রশ্ন উঠছে, কেন তাঁদের নিয়োগ করা হল না বাঘের মত একটি সিডিউল ওয়ান বন্যপ্রাণীর সুরক্ষার প্রশ্নে? কেন টানা দুই মাসের মধ্যে রাজ্যের একজনও শীর্ষ বনকর্তা ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না? অথচ দিন পনেরো আগেই বিভাগীয় মন্ত্রীসহ একদল শীর্ষ বনকর্তা ঘটা করে বনবান্ধব উৎসব পালন করতে লালগড় গিয়েছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্যের এক প্রাক্তন শীর্ষ বনকর্তা জানিয়েছেন “সবার মনে থাকার কথা ১৯৯৪ সালে আচমকাই ব্যান্ডেল এলাকায় ত্রিশটি হাতির একটি দল ঢুকে পড়েছিল।আমরা সারা রাত জেগে রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে হাতির দলকে বনে পাঠিয়ে ছিলাম। প্রশ্নটা হল দায়বদ্ধতার। এখন বনদফতরের দায়বদ্ধতার ‘দ’ টাও প্রায় নেই। না হলে বাঘের মত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণীর আনাগোনা নিশ্চিত হওয়ার পরেও কেন শীর্ষ বনকর্তারা একবারের জন্যেও লালগড়ে যাওয়ার সময় পেলেন না? এটাকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চরম নজির ছাড়া আর কিই বা বলা যেতে পারে?”

আরেক বনকর্তার দাবি “হালে দুর্গাপুরে ঢুকে পড়া দুটি হাতিকে তো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বনে ফেরানো সম্ভব হয়েছে।প্রায় কাকপক্ষীও টের পায়নি।রাজ্য বনদফতরের হাতে দক্ষ আধিকারিক অথবা পরিকাঠামো নেই তা মানি কি করে? আসলে লালগড়ের বাঘের উপস্থিতির বিষয়টি গোড়া থেকে অত্যন্ত ঠুনকো ভাবে নেওয়া হয়েছিল। হাতে গরমে তার ফলও মিলেছে।”

নিজের দফতরের গাফিলতি ঢাকতে মরিয়া রাজ্যের প্রধান মুখ্যবনপাল তথা হেড অফ দ্য ফরেস্ট ফোর্স নরেন্দ্র কুমার পান্ডের সাফাই “আপাতত তো কোন গাফিলতির বিষয় নজরে আসছে না।আমরা বাঘটির সুরক্ষার প্রশ্নে কোন ত্রুটি রাখিনি।তবে বনবস্তির বাসিন্দাদের সহযোগিতায় অভাব ছিল। যে কারণে চরম মাশুল দিতে হয়েছে বাঘটিকে। জনতাকে আটকাতে প্রয়োজনীয় পুলিশেরও অভাব ছিল। এরপরেও আমরা গোটা বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব সহকারে তদন্ত শুরু করেছি। এনটিসিএর প্রশ্নের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বন্যপ্রাণ শাখার প্রধান মুখ্যবনপাল রবিকান্ত সিনহা।”

মনিটরিংয়ে গাফিলতির বিষয়টি মানতেই চাননি বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মণ। তাঁর সাফাই ” যেখানে বাঘের গতিবিধির উপর নজর রাখতে গিয়ে আমাদের দুই বনকর্মীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে সেখানে এই অভিযোগ আসে কি করে?”

কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছিল রাতে বাঘ পাহারার নামে রীতিমত জেনারেটর চালিয়ে আলো জ্বেলে ঐরাবত গাড়ির ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন ওই দুই বনকর্মী। তাতেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন তাঁরা। সব মিলিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার যে গাফিলতি ঢাকতে চেষ্টার কোন কসুর নেই বনদফতরের। শাস্তি তো দূরের কথা। এনটিসিএর এআইজি ডঃ বৈভব চন্দ্র মাথুর জানিয়েছেন “আমরা রাজ্য বনদফতরে জবাবের অপেক্ষায় আছি।”

Advertisement
----
-----