যার জোর তার মুলুক, অন্য মতাদর্শ পটল তুলুক ‌

গ্রাফিক্স- kolkata24x7

পার্থসারথি গুহ: বাংলায় প্রবাদ আছে যার জোর তার মুলুক। আবার হিন্দিতে বলা হয় জিসকা লাঠি উসকা ভইস. অর্থাৎ মহিষ। এই কথা কিন্তু শুধুমাত্র গায়ের জোরে বলিয়ান কাউকে ভেবে বলা নয়। বরং অর্থ ও প্রতিপত্তির দ্বারা যে বা যারা পুষ্ট তার বা তাদের কথা ভেবেই বলা।

আর কে না জানে রাষ্ট্র হল সেই ক্ষমতার সিন্দুকের চাবিকাঠি। যে তা করায়ত্ব করতে পারবে সেই ছড়ি ঘোরাবে অপরের ওপর। এই ক্ষমতা তখন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে‌ শুধুমাত্র একটা দেশ দখল করে বা আধিপত্য জমিয়েই থেমে থাকা হবে না, অধিকৃত মানুষদের ওপর নিজেদের মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া যাবে।

আরও পড়ুন- জোট নিয়ে জটিলতা বাড়ছে এনডিএ-র অন্দরে

- Advertisement -

বস্তুত, পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে এমন অনেক ছবি চোখে পড়বে যেখানে জয়ীদের আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে বিজেতাদের ওপর। সমাজের বির্বতনেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গিয়েছে এই সব অধ্যায়। দুনিয়া জুড়ে যে দুটি মতাদর্শ নিয়ে আজও এত আলোচনা হয় সেই সমাজতন্ত্র বা ধনতন্ত্র বিপরীত মেরুর হলেও এদের প্রসার ঘটে হিটলার-মুসোলিনির নাতসি ও ফ্যাসিজমের পরাজয়ের অব্যবহিত পর থেকেই।

মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদী সমাজতন্ত্রের প্রতিভূ রাশিয়া ও ধনতন্ত্রের ধারক বাহক আমেরিকার দর্শন পুরোপুরি ভিন্ন হলেও মুসোলিনির ইতালি ও হিটলারের জার্মানির বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধে এই দুই অহি-নকুল শক্তি কিন্তু হাতে হাত মিলিয়েছিল। আর ইতিহাস বলছে এই মহাযুদ্ধ জেতার পর রাশিয়ার সমাজতন্ত্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধনতন্ত্র তথা পুঁজিবাদী অর্থনীতি সমান্তরালভাবে তামাম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন- বাড়িতে বসেই মিলবে ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে বিয়ের শংসাপত্র: মুখ্যমন্ত্রী

‌অন্যদিকে যারা পরাজিত হল সেই ইতালির মুসোলিনির নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিজম আর জার্মানির হিটলারকৃত নাতসি মতবাদ বিশ্বজুড়ে ধিক্কারের মুখে পড়ল। নিশ্চিতভাবে হিটলারের কার্যকলাপ ছিল স্বৈরতান্ত্রিক। কিন্তু ইতিহাসের নেপথ্য কাহিনি বলে মুসোলিনির ফ্যাসিজম ছিল যথেষ্ট প্রগতিশীল একটি মতাদর্শ। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা চলে ফ্যাসিজম ছিল সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ভাবাদর্শ।

কথিত আছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বাধীন ভারতে এই ধরনের একটি মতবাদই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। যা একাধারে কমিউনিজমের গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতা মুক্ত হবে। পাশাপাশি গণতন্ত্রের খুল্লামখুল্লা কার্যকলাপ থেকেও আলাদা থাকবে। অর্থাৎ গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের উৎকৃষ্ট গুণাবলী নিয়ে অগ্রসর হবে। নেতাজির মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ যে নীতিকে অনুধাবন করেছিলেন তা তো আর ফেলনা হতে পারে না।

যেহেতু মহাযুদ্ধে জার্মানির সঙ্গে ইতালিরও ভরাডুবি ঘটল, তাই সারা দুনিয়াতেই বন্দিত হয়ে ওঠার পরিবর্তে ধিক্কৃত হল মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ। আর যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষে থাকার সুযোগ নিয়ে কমরেড স্তালিনের হাজারো নৃশংসতা চাপা পড়ে গেল সমাজতন্ত্রের মরিচিকার আড়ালে।

পূর্ব ইউরোপের কোনে কোনে ছড়িয়ে পড়ল সেই যুদ্ধজয়ী কমিউনিজম। প্রসার ঘটল লাতিন আমেরিকাভুক্ত বেশ কিছু দেশেও। তার মধ্যে কম্বোডিয়ার পল পট, রোমানিয়ার চেসেস্কুর মতো অত্যাচারী শাসকরাও জায়গা করে নিল ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিয়ে।

আরও পড়ুন- লোনের টাকা চাওয়াতেই ডোমজুড়ে খুন ব্যাংক কর্মী

অন্যপ্রান্তে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে বিস্তার লাভ করল ধনতন্ত্রের প্রতিভূরা। বিশ্বযুদ্ধে জয়ী হয়েছিল বলেই সম্পূর্ণ বিপরীত দুটো মতবাদ সারা দুনিয়াকে গ্রাস করে নিল। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জনমুখী হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের জায়গা হল আস্তাকুড়ে।

এতেই প্রমাণ মেলে দুনিয়াতে শেষ কথা বলে ক্ষমতাই। রাজ্যে ৩৪ বছরের বাম জমানা চলাকালীন সিপিএম তথা অন্য বামপন্থী দলগুলি এই ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করেছে। আবার রাজ্যে পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গে গত ৭ বছর সবাই তৃণমূল হয়ে উঠেছেন। ভাবখানা এমন যে এখানে আর আছেটাই বা কে। অর্থাৎ সেই ক্ষমতার ব্যাটন ধরে রাজনীতির ম্যারাথন পেরোতে চায় সবাই।

Advertisement ---
---
-----