শুভজিৎ চট্টোপাধ্যায়: পারদ নেমেছে। ডিসেম্বর এর প্রথম সপ্তাহেই কলকাতায় শীতের আমেজ। আর প্রতি বছরের মতোই কলকাতায় শাস্ত্রীয় সংগীত পিপাসু মানুষের মনে প্রথম শীতের খুশির আমেজ নিয়ে এল “আইটিসি সংগীত রিসার্চ অ্যাকাডেমি” (SRA) -র তিনদিনের বার্ষিক সম্মেলন।

সদ্যপ্রয়াতা বিদুষী গিরিজা দেবী ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সঙ্গী ও অভিভাবক। তাই এবছরের সম্মেলনে সকলে বারে বারে স্মরণ করলেন তাঁদের একান্ত কাছের মানুষ “আপাজি”-কে।

শিল্পী- ওঙ্কার দাদারকর

তাঁকে স্মরণ করে এবারের অনুষ্ঠান সূচনা করলেন তাঁর সুযোগ্য ছাত্রছাত্রী, SRA-র স্কলার-গুরু ওঙ্কার দাদারকার, সুচেতা গঙ্গোপাধ্যায়, অপরাজিতা লাহিড়ী এবং সৌমি রায়। নিজের অনুষ্ঠান শুরুর আগে, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী শোনালেন তার “মা” গিরিজা দেবীর সঙ্গে তাঁর কয়েক দশকের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা।

পন্ডিত ভেঙ্কটেশ কুমার

এবছর বিশেষ সম্বর্ধনা পেলেন প্রবীণ শিল্পী ভেঙ্কটেশ কুমার। তাঁর উদাত্ত গলায় পরিবেশনা, রাগ বেহাগ আর রাগ দুর্গা এবছরের সম্মেলনের পথ ঠিক করে দিল প্রথম দিনেই।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনের প্রধান আকর্ষণ উস্তাদ রশিদ খান শোনালেন রাগ গোরখ-কল্যাণ। দীর্ঘ তানের কারুকার্যে ভরা, রশিদ খানের বন্দিশ “এরি মায়ি আজ পিয়া নেহি আয়ে” এর সঙ্গে তবলায় পণ্ডিত শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, হারমোনিয়াম-এ পণ্ডিত জ্যোতি গহ এবং সারেঙ্গিতে মুরাদ আলি খানের অনবদ্য সঙ্গত বহু দিন মনে থেকে যাবে।

পড়ুন: কবিগুরুর কথায় ও গুলজারের সুরে, এ এক অন্য সৃষ্টি

যন্ত্রসঙ্গীতে এবছরের সেরা প্রাপ্তি, সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে বিদুষী কলা রামনাথের বেহালাবাদন। অনিন্দ্য কারুকার্যে সাজানো তবলা সঙ্গতে, তার বাজনাকে অন্যস্তরে নিয়ে গেলেন পণ্ডিত অভিজিত বন্দ্যোপাধ্যায়। কিংবদন্তি সেতারশিল্পী উস্তাদ শাহিদ পারভেজ শোনালেন তার প্রিয় রাগ বাগেশ্রি। তাঁর অনুষ্ঠান শেষে শ্রোতাদের মধ্যে ফিসফাস শোনা গেলো “শাহিদজি আরও একটু কেন বাজালেন না”!

দ্বিতীয় দিনের, সারারাত-ব্যাপি অনুষ্ঠানের শেষ শিল্পী পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী-র ভোরের আবাহন করলেন অপরূপ রাগ নট ভৈঁরোতে। তবে নিঃসন্দেহে, এবছরের সেরা পরিবেশনা, শেষ দিনে, এই প্রতিষ্ঠানের “ঘরের মেয়ে” কৌশিকি চক্রবর্তীর রাগ পুরিয়া কল্যাণ এবং তারপর রাগ মাঝ খাম্বাজ। বাবা-মেয়ে দুজনের সঙ্গেই অনবদ্য সঙ্গত করলেন এমুহূর্তে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তবলাবাদক পণ্ডিত যোগেশ শামসি।

পড়ুন: ‘ফিল্মি গানের পলিটিক্সে হারিয়ে যাচ্ছে, নন ফিল্মি মিউজিক…’

প্রতি বছরের মত এবারেও, বিশিষ্ট শিল্পীদের সঙ্গে দেখা গেল এই প্রতিষ্ঠানের স্কলার, কিছু নবীণ শিল্পীকে। সেতারে অয়ন সেনগুপ্তর রাগ যোগ, বাঁশিতে পরমানন্দ রায় এবং কণ্ঠসঙ্গীতে সুচেতা গঙ্গোপাধ্যায়ের রাগ ইমনে পাওয়া গেল ভবিষ্যতে অনেক বড় শিল্পী হয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি।

এ বছর, হিন্দুস্থানি সংগীতের পাশাপাশি, কর্ণাটকি সংগীতের স্বাদ পাওয়া গেলো বিদুষী সুধা রঘুনাথন এবং ত্রিচুর ব্রাদারস-এর পরিবেশনায়। ধ্রুপদ শোনালেন বিশিষ্ট শিল্পী উদয় ভাওয়ালকার। সঙ্গে মনে রাখার মতো পাখোয়াজ সঙ্গত করলেন তরুণ শিল্পী প্রতাপ আওয়াধ।

পড়ুন: গানপুরের হারানো পথিক

তিন দিনের সম্মেলন-এর সমাপ্তি হল প্রবীণ শিল্পী পণ্ডিত উল্লাস কোসলকারের মধুর কণ্ঠে রাগ কৌশিকি কানাড়া-র পরিবেশনে৷ বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় সারেঙ্গিতে মুরাদ আলি এবং হারমোনিয়াম-এ গৌরব চট্টোপাধ্যায় এর সঙ্গতের কথা।

তিনদিনের সম্মেলনে -এ শ্রোতাদের উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। সংগঠকদের ধন্যবাদ, ফেসবুক লাইভ-এর মাধ্যমে অনুষ্ঠানের কিছু অংশ সারা পৃথিবীর শাস্ত্রীয়-সংগীত-প্রিয় মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

----
--