কাছিম গতির কলকাতাকে গতিশীল করেছিল ধর্মঘট

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ধর্মঘট নাকি সবকিছুকে স্তব্ধ করে দেয়। থামিয়ে দেয় শহরের গতিকে। কিন্তু প্রথম শ্রমিক ধর্মঘটের সুত্র খুঁজতে গেলে দেখা যাবে ধর্মঘট বাড়িয়ে দিয়েছিল শহরের গতিকে। ‘উপহার’ দিয়েছিল চাকাওয়ালা ঘোড়ারগাড়ি এবং সেই পরিবর্তনের ধারা ধরেই আজ চলমান কল্লোলিনী।

এমন গতিশীল ধর্মঘটের কথা জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে। ১৮২৭ সাল, ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী কলকাতায় পালকিবাহকদের ধর্মঘটই সম্ভবত ভারত তথা কলকাতার ধর্মঘট। শোনা যায় ইচ্ছামতো নাকি ভাড়া নিতে শুরু করেছিলেন পালকিবাহকরা। দাবি অনুযায়ী ভাড়া দিতে রাজি না হলে পালকি বইবেন না তাঁরা। অগত্যা বেশী ভাড়া দিয়েই যেতে হত যাত্রীদের। দেশ শাসনকারী ব্রিটিশ সরকার কিছু নির্দেশিকা জারি করল।

- Advertisement -

এর বিরুদ্ধে লড়তে নেমে পালকি বন্ধ রইল এক মাস। যেখানেই যেতে হয় হয় নিয়ে যেতে হয় ঘোড়া না হয় পায়ে হেঁটে। সব সময় ঘোড়া না পাওয়া গেলে আরও সমস্যা। বাধ্য হয়ে সাহেবরা নিয়ে এল ঘোড়ার গাড়ি। সেই গাড়িই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে যায় কলকাতায়। ইংরেজদের ওই গাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে শহরের বাবুরাও।

ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী ইংরেজদের চার নির্দেশিকা ছিল। ১) ভাড়া নির্দিষ্ট করে দেবে সরকার। এক মাইল পর্যন্ত ভাড়া হবে তিন আনা। আরও যেতে হলে মাইল প্রতি তিন আনা করে বেশ ভাড়া দিতে হবে। ২) প্রতিটি বাহকের হাতে বাধ্যতামূলক ভাবে নম্বর দেওয়া চাকতি লাগাতে হবে। ৩) আজকের গাড়ির নম্বর প্লেটের মতো পালকির নম্বর থাকবে। এবং ৪) প্রত্যেক বেহারাকে পুলিশের খাতায় নাম লেখাতেই হবে।

নিয়ম লাগু হতেই বেহারারা বুঝে গিয়েছিল তাদের শ্রম উপার্জন কমে যাবে। এরপরেই শুরু হল পালকিবাহকদের ধর্মঘট। জানা যায়, তারা পালকিবাহকদের সর্দার ছিলেন পাঁচু সুর। ধর্মতলায় বসে প্রথম ধর্মঘটের সভা। আইন অমান্য করা হবেই এমন নানা ধরনের কথা উঠে এল সভায়। সভার পরে হাজার হাজার বেহারা মিছিল করে যায় লালবাজার এবং সুপ্রিম কোর্টের সামনে। দেখানো হয় বিক্ষোভ।

এদিকে পালকির অভাবে তিনদিন ধরে বাড়িতে বসে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন ব্রাউন সাহেব। ডাকলেন মিস্ত্রী। পাল্কির হাতল খুলিয়ে তলায় দুটো চাকা লাগিয়ে দেওয়া হল এবং সামনে জুড়ে দেওয়া হল ঘোড়া। অতঃপর কলকাতার রাস্তায় চালু হলো ঘোড়ার গাড়ি। আমজনতা এর নাম দিল “পালকি গাড়ি” , সাহেবরা স্রষ্টার নামানুসারে এর নাম দিলেন ‘ব্রাউনবেরি’ গাড়ি।

এক মাস পর যখন পালকি ধর্মঘট উঠল তখন শহর ছেয়ে গিয়েছে ঘোড়ার গাড়িতে। এভাবেই ধর্মতলার মোড়ে শুরু হওয়া প্রথম ধর্মঘট শহরকে না থমকে করে দিল গতিশীল। কলকাতার বাবুরাও অনেকেই ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার শুরু করে দিলেন। কালক্রমে ঘোড়ার গাড়ি ছেড়ে কলকাতায় এল মোটর গাড়ি। যা শহরের গতি দ্বিগুন করল। এখন সেই কলকাতা কল্লোলিনী। স্রোতের এমন বেগ যে ভুলেই যায় অতীতের অনেক কিছু। ইতিহাস তবু ইতিহাসই হয়। বেঁচে থাকে এমনভাবেই।

তথ্যসূত্র : “নতুন তথ্যের আলোকে কলকাতা” বই