সামান্য ক’দিন যেমন দেখেছি সুনীলদাকে

অরুণাভ রাহারায়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। জ্ঞান হবার পর থেকে যাঁর বই বাবার টেবিলে দেখেছি। অবশ্য তাঁকে প্রথম দেখি ২০০৪ সালে শিলিগুড়িতে। সেবার কৃত্তিবাস পত্রিকার পক্ষ থেকে একটা অনবদ্য আড্ডার আয়োজন করা হয়েছিল শিলিগুড়ি কলেজে। কলকাতা থেকে গিয়েছিলেন মল্লিকাদি, সুমনদা, শ্রীজাতদা আরও অনেকে। উত্তরবঙ্গের অনেকে সেই আড্ডায় এসেছিলেন। বাবার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে অত কাছ দেখেও আমার মধ্যে কোনও রকম প্রতিক্রিয়া হয়নি। অত ছোটবেলায় সেটাই তো স্বাভাবিক। বরং ওই কবিতাপাঠের আসরে বসেও আমার মন চলে গিয়েছিল কলেজমাঠের খেলাধুলোয়!


এত ছোট হাতে কীকরে ধরেছ বিশ্ব?
নিজেকে কীকরে সাজালে আকাশি নীলে?
অথচ আমি যে এতদিন এত নিঃস্ব
শুধু লুকোচুরি খেলেছি কথার মিলে।

- Advertisement -

২০১০ সাল। ততদিনে কবিতা পড়তে শুরু করেছি। আলিপুরদুয়ারে উচ্চমাধ্যমিক চুকিয়ে কলকাতায় চলে আসি। এখানে আমার বন্ধু হয়ে ওঠে অময় দেব রায়। অময়ই একবার নিয়ে গেল সুনীলদার বাড়িতে। আমরা তখন কলেজে পড়ি। এক রবিবারের সকালে কয়েকটা টাটকা কবিতা নিয়ে সোজা চলে যাই সুনীলদা বাড়িতে। এখন ভাবতেই অবাক লাগে, বাংলা সাহিত্যের সর্বোগ্রাসী প্রতিভা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেদিন আমাদের সঙ্গে নিবিড় আড্ডা দিয়েছিলেন! ফেরার সময় দু’জনকেই বলেছিলেন ‘আবার এসো’।

২০১১ সাল। প্রতিমাসের শেষ শনিবার রডওন স্ট্রিটে কৃত্তিবাসের আড্ডা হত। প্রতিবার সুনীলদা আসতেন। পিনাকী ঠাকুরের আমন্ত্রণে অনেকের মতোই আমিও যেতাম। সেখানে কত কত কবিকে কাছ থেকে কবিতা পড়তে দেখেছি! কবিতা পড়েছেন বিনায়কদা, অংশুমানদা, শ্রীজাতদা, সেবন্তীদি, চিরঞ্জীবদা, জয়দেব বসু আরও কত কে! আড্ডা শেষে কৃষ্ণা বসু কার কবিতা কেমন লাগলো তার প্রতিক্রিয়া জানাতেন। সুবোধ সরকার একবার আড্ডা সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন। তখন তাঁর সঙ্গে সদ্য পরিচয় হয়েছে। তখনও জানি না পরে তাঁর সঙ্গে এত হৃদ্যতা হবে। সেদিনের আড্ডায় সুনীলদা বলেছিলেন ‘প্রতি আড্ডায় কৃষ্ণা খুব সুন্দর আলোচনা করে। কৃষ্ণার বলা অনেকটা প্রিন্টিং মেশিনের মতো স্বতঃস্ফুর্ত! যেন মুখ থেকে ছাপার অক্ষর বেরচ্ছে! আজ ও আসতে পারেনি। আজকের কবিদের লেখা কেমন লাগল বাচ্চাদের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলুক।’ সঙ্গে সঙ্গে সুবোধ স্যার বলে উঠলেন– ‘কী আশ্চর্য সুনীলদা! আজকের আড্ডায় মায়িক নেই, কৃষ্ণাদিও নেই (সেদিন মায়িকের ব্যবস্থা ছিল না)! সুনীলদা-সহ সবাই তখন হো হো করে হাসি। সুযোগ পেয়ে, আমি, সেদিন আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম। আমার আলোচনা শেষে সুনীলদা তাঁর স্বভাবভঙ্গিতে জিগ্যেস করেছিলেন– ‘তুমি তো খুব ভালো বললে, কোথায় থাকো’?

আমি আর অময় পরে আরেকদিন রবিবারের আড্ডায় যেতে চেয়েছিলেম। ফোনে যোগাযোগ করলে তিনিই জানিয়েছিলেন, ‘পুজোর লেখা নিয়ে একটু ব্যস্ত আছি। পুজোর পর অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে’। আমরাও অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু ২০১২-র নবমী-সকালে অময়ের ফোন– ‘সুনীলদা কথা না-রেখে চলে গেলেন! এটা কিন্তু ঠিক করলেন না’! আমি ভেবেছিলাম অময় বোধহয় গুল দিচ্ছে! কিন্তু টিভি খুললে চোখে পড়ে সংবাদ চ্যানেলের শিরোনাম– ‘নবমীতে নেই নীললোহিত’।


কবিতা রচনা প্রসঙ্গে সুনীলদার যে কথাগুলি আমাকে আজও নাড়া দেয়– “কবিতা কেন লেখা হয় বা কীভাবে লেখা হয়, তার উত্তর আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। আমি অনেক জায়গায় লিখেছি যে, কবিতার প্রথম লাইনটি বিদ্যুত্‍-ঝলকের মতো মাথায় আসে; এর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় লাইন আপনা হতে আসে। কিন্তু তৃতীয় লাইনটি শক্ত, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপচাপ বসে পরবর্তী দুটি লাইনের জন্য চেয়ে থাকি। আমি তখন সদ্য ভুমিষ্ট হওয়া শিশুর মতো অসহায় বোধ করি।”

পরে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে আমি যে কবিতাটি লিখেছিলাম, সেটা এখানে পুরোটাই তুলে দিলাম

পারিজাত
[উৎসর্গ: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়]

রডওন স্ট্রিটের শনিবারের আড্ডা মনে পড়ে আজ।
মনে পড়ে কথা
কথার ভিড়ে লুকিয়ে থাকে স্মৃতি?
কথা স্মৃতি দুই তবে পড়ে থাকে মাঠে

মনে পড়ে গান…
ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনের অমোঘ সেইসব গান

আজ গান নেই
শুধু তার তান ধরে উড়ে যায় পাখি

পড়ে থাকে কবিতাপাঠক আর সুনীল আকাশ…

Advertisement ---
---
-----