বাংলার নজরে হতাশার ভোট দেখলাম কর্ণাটকে

রানা দাস, বেঙ্গালুরু: আগামী লোকসভা ভোটের আগে কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। প্রায় গোটা দেশ যখন গেরুয়া হওয়ার দিকে এগোচ্ছে, তখন দ্রাবিড়াঞ্চলের বিধানসভা ভোটের দিকেই তাকিয়ে সবাই। মোদী ঝড় কি এখানেও কালবৈশাখী আনতে পারবে? এই প্রশ্নই সব্বার মাথায়। স্বাভাবিকভাবেই কলকাতার অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে থেকে একটু অন্য রকমের ভাবনা থেকেই আমরা ঠিক করি কর্ণাটকের বিধানসভা ভোটের কভারেজ করব। কারণ, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে এটাই সম্ভবত সেমিফাইনাল। তাই, লোকসভা ভোটের কথা মাথায় রেখেই যেমন ভাবা, তেমনি কাজের মতোই সহকর্মী সৌমেন শীলকে সঙ্গে নিয়ে উড়ে এলাম বেঙ্গালুরু।

আরও পড়ুন: কর্ণাটকে জয়ের বিষয়ে নিশ্চিত সবপক্ষই

আমার ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতার জীবনে বাংলার বহু ভোট কভারেজ করেছি। কার্যত শান্ত উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে কেশপুর, গড়বেতা, খেঁজুরি, সবং, পিংলার মতো এলাকায় ভোট কভার করার সৌভাগ্য হয়েছে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে আসা আমার মতো সাংবাদিকের। সাংবাদিকতার হাতিখড়িরও আগে কেশপুর,গড়বেতা, সবং, পিংলা এলাকার ভোট সন্ত্রাসের গল্প শুনেছিলাম। বুথ জ্যাম, সাদা থান বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ভোট সন্ত্রাসের ঘটনাগুলোকে বেশ গল্প বলেই মনে হত। কিন্তু, ২০০৬ সালের বাংলার বিধানসভা ভোটের কভার করতে গিয়ে কেশপুর, গড়বেতা, সবং-পিংলার এলাকা যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। চাক্ষুস করেছিলাম ছোটবেলার শোনা ভোট সন্ত্রাসের গল্পগুলো শুধুই গল্প ছিল না। কীভাবে ছাপ্পা-রিগিং করে বাংলার বহু এলাকায় ভোট হয়, তা নিজের চোখেই দেখেছিলাম।

- Advertisement -

বেঙ্গালুরুতে আসার আগে আমার কাছে ভোট মানেই ছিল সন্ত্রাস, রিগিং, বুথ জ্যাম, রক্তারক্তি, হিংসার ছবিটাই স্পষ্ট ছিল। বিশেষ করে বর্তমানে বাংলার পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় থেকে যে হিংসার ঘটনাগুলো ঘটেছিল, তা এক্কেবারে তাজা ছিল। সামান্যা একটা পঞ্চায়েত ভোটকে কেন্দ্র করে যে আইনি জটিলতা গত একমাসের বেশি সময় ধরে চলেছে, কর্ণাটক ভোট দেখতে আসার আগেই সেই ছবিটাই চোখের সামনে ছিল। এখানে আসার আগে আমার কাছে ভোট মানেই বাংলার নির্বাচন কথাটাই মাথাতে ছিল। ভাবছিলাম ভোট মানেই হয় তো ছবিটা সব জায়গাতেই এই রকম। সেই উত্তেজনা নিয়ে দ্রাবিড়াঞ্চলের মাটিতে পা রেখেছিলাম।

কিন্তু, ভোটের ঠিক দু’দিন আগে এয়ারপোর্ট থেকে বেঙ্গালুরু শহরে আসার পথের ছবিটা দেখে ভোট সম্পর্কে ধারণাটাই বদলে গেল। রাস্তার দু’ধারে একটাও ব্যানার, পোস্টার, হোডিং নজরে পড়েনি। রাস্তার দু’ধারে ঘন সবুজ আর রং-বেরঙের ফুলগাছ দেখেই প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছিল। কোনভাবেই বোঝার উপায় ছিল না যে, দু’দিন বাদেই এই রাজ্যের মানুষ তাদের নতুন সরকার গঠন করতে চলেছে। সঙ্গী এবং সহকর্মী সৌমেনকে তো বলেই উঠলাম, ‘আমরা ভুল জায়গায় এসে পড়িনি তো? আমাদের গাড়ির ড্রাইভার মল্লিকার্জুন রাওকে (বাড়ি অন্ধপ্রদেশে হলেও কাজের সুত্রে বেঙ্গালুরুতেই থাকে) জিজ্ঞেস করতেই, তিনি জানালে, ‘ স্যার এখানেই ভোট হচ্ছে, তবে এখানকার মানুষের ভোট নিয়ে এত মাথাব্যাথা নেই। ভোটের দিন সবার ছুটি আছে। যে যার মতো করে বুথে গিয়ে ভোট দিয়ে আসবে।’

আরও পড়ুন: ভোট দিলেই পরীক্ষায় বাড়তি নম্বর!!

প্রথমে ভেবেছিলাম এয়ারপোর্ট থেকে শহরে আসার রাস্তায় ভোটের প্রচারের জন্য কোন পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয়নি এই কারণে শহরে ঢোকার পথকে নোংরা করা হয়নি। কারণ এতে হয়তো দেশি-বিদেশিদের নজরে খারাপ লাগতে পারে। শহরে গেলে হয়তো ঠিক ভোটের উন্মাদনার ছবিটা দেখত পাব। যেমনটা আমরা ঠিক কলকাতার পথেঘাটে দেখে থাকি। কিন্তু, সেই গুড়োও বালি! বেঙ্গালুরু মূল শহরে ঢুকেও একটাও ব্যানার, পোস্টার, হোডিং দেখতে পেলাম না। আর দেওয়ার লিখন? না এখানে কেউ দেওয়াল নোংরা করে না। আর ভোটের জন্য তো এক্কেবারেই নয়। যত সময় যাচ্ছিল, সাংবাদিকের মন তত হতাশ করছিল। কারণ, ভোট মানেই একটা আলাদা উত্তেজনা, উন্মাদনা প্রায় প্রতিটি সাংবাদিকেরই থাকে। আর আমার সহকর্মী সৌমেন তো আরও হতাশ হয়ে পড়ছিল, বার বার বলছে, ‘এ আবার কেমন ভোট? এমন তো আমি কোনদিন দেখিনি।’ ওকে বার বার বোঝাচ্ছিলাম যে, শহরে হয়তো তেমন কোন প্রচার নেই। গ্রামের দিকে ঠিক থাকবে। নিশ্চয় আমাদের বাংলার মতো এখানেও খবর পাব, ভোটকে কেন্দ্র করে হিংসা-হানাহানির ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিকের শকুনের নজর যা কাম্য করে আর কি, সেটাই করছিল আমাদের মনে।

না! বেঙ্গালুরুতে এসে প্রথমদিন কংগ্রেস, বিজেপি পার্টি অফিস ঘুরেই সেভাবে ভোটের প্রচার নজরে পড়েনি। প্রথমদিন বিকেলে কর্ণাটকের বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর রামালিঙ্গা এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি দীনেশ গুড্ডারাওয়ে সাংবাদিক বৈঠকে হাজির হতে গিয়ে রাজ্য কার্যালয়ের বাইরেও ভোটের একটা ব্যানার পোস্টার নজরে পড়েনি। সন্ধেবেলা রাজ্য বিজেপির রাজপ্রাসাদ সমান প্রদেশ কার্যালয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম একটা বড় ফেক্স। তাতে কন্নড় ভাষায় দলীয় প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। ‘কন্নড় গুত্তালা’ (মানে আমি কন্নড় জানি না)। ওই ফেক্সে কী লেখা আছে, তা হিন্দিতে বুঝিয়ে দিলেন আমাদের গাড়ির চালক কন্নড় জানা মল্লিকার্জুন।

 

বেঙ্গালুরুতে ভোটের প্রচার দেখতে না পেয়ে পরদিনই আমরা ছুটেছিলাম শহর থেকে 19 কিলোমিটার বাইরে ভাট্টুর এলাকায়। ভেবেছিলাম ভোটের প্রচার দেখতে পাব। কিছু ছবি এবং ভিডিও করব। না সেখানেও গিয়ে হতাশ হতে হল। কোথাও কোনও ব্যানার, পোস্টার, ফেক্স, হোডিং নজরে পড়ল না। আমার সঙ্গী নতুন এই পেশায় আসা সৌমেন তো আমার কর্ণাটক ছুটে আসাকে কটাক্ষ করেই বলেই ফেলল, ‘ যার বিয়ে তার খোঁজ নাই, পাড়াপড়শির ঘুম নাই’। ওর কথায়, যেখানে ভোট সেখানকার লোকের কোন মাথাব্যাথা নেই। আর রানাদা তুমি কলকাতা থেকে এখানে ছুটে এলে? ওর কথা শুনে সত্যিই মনে হচ্ছিল, কর্ণাটক বিধানসভা ভোট নিয়ে এখানকার লোকের চেয়ে আমাদের দু’জনের বেশি উত্তেজনা।

হতাশ মনেই কেটে গেল আরও একটা দিন। ১২ মে চূড়ান্ত দিন। এদিন হয়তো বাংলার ভোটের উত্তেজনাটা এখানে পাব। এই আশায় ছিলাম। ভোরে আলো ফুটতেই হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম বুথ ঘুরে দেখব বলে। মনের মধ্যে সেই উত্তেজনা। কিন্তু, শহরেরর কয়েকটা বুথে গিয়ে সমস্ত উত্তেজনায় জল ঢেলে দিল। বুথের আশপাশে কোন রাজনৈতিক দলের ক্যাম্প নেই। দলীয় প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ইশারা, হাতজোড় করে আবেদন করা নেই। বুথের সামনে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ক্যাম্প থেকে বুথ স্লিপ নিয়ে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। বুথে কোন লম্বা লাইন নেই। সাধারণ মানুষ আসছেন, সুষ্ঠভাবে ভোট দিয়ে চলে যাচ্ছেন।

আমরা ভিন রাজ্য থেকে এখানে এসেছি, ফলে আমাদের কাছে ইলেকশন কমিশনের দেওয়া কোন পরিচয়পত্র ছিল না। তবু বেঙ্গালুরু পুলিশ আমাদের বুথে ঢুকতে কোন বাধা দেয়নি। বরং হাসিমুখে সব রকম সহযোগিতা করেছে। বাংলা থেকে উড়ে আসা দুই সাংবাদিকের মনটা সত্যিই জুড়িয়ে গিয়েছে। কারণ, এমন ভোট আমি কোনদিন দেখিনি। এভাবেও সুষ্ঠভাবে মানুষ তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা আগে জানা ছিল না। বার বার মনে হয়েছে, কর্ণাটক পারে, হয়তো অন্যা রাজ্যও পারে, বাংলা কেন পারে না?

কর্ণাটক বিধানসভা ভোট কভার করতে এসে আরও অবাক হলাম, রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ব্যবহারে। ভোটের হাল হকিকতের খবর জানতে চাইতে গিয়ে জানতে পারলাম, মিডিয়া সেন্টার থেকেই সমস্ত তথ্য দেওয়া হচ্ছে। সেটা কোথায়? জানতে চাইতেই অফিসের কর্মীরা রীতিমতো ম্যাপ এঁকে দিলেন। দেশের নামকরা সংবাদপত্র দ্যা হিন্দু-এর অফিসের আগের ভবনটাই ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন অফিস। সেখানেই করা হয়েছে মিডিয়া সেন্টার।

আমরা কলকাতা এসেছি, আমাদের কাছে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পরিচয়পত্র নেই। একথা জানার কোন চেষ্টাই হল না। আমাদের গলায় ঝুলে থাকা পরিচয়পত্রের ফিতে দেখেই এগিয়ে এলেন এক মহিলা কর্মী। শুধু একটা খাতায় অামাদের নাম এবং কোন সংবাদমাধ্যম থেকে এসেছি, তা লিখে দেওয়ার পরেই আমাদের খবর পাঠানো সহ সমস্ত তথ্য দেওয়া হল। এমন কি আমরা যাতে দ্রুত কলকাতা অফিসে খবর পাঠাতে পারি, তার জন্য দ্রুতগতির ইন্টারনেট পরিষেবা যুক্ত দু’টো কমপিউটার দেওয়া হল।

নির্বাচনে যে মিডিয়া সেন্টার এত কিছু সুবিধা সংবাদমাধ্যমকে দেয়, তা বাংলার কোনদিন দেখেনি। সরকারি কর্মীদের হাবভাব আর নানা প্রশ্নেই জবাব দিতেই দিন কাবার হয়েছে বাংলায়। কিন্তু, এখানে সংবাদমাধ্যমকে এত ভালো পরিষেবা দেওয়া হয়, তা না দেখলে বোঝায় যেত না। শুধু তাই নয়, কোন কেন্দ্রে কত শতাংশ ভোট পড়েছে, তা জানতে চাওয়ারও দরকার পরে না। কারণ, মিডিয়া সেন্টারে বিশাল বিশাল জায়ান্ট স্ক্রিনেই তাজা আপডেট ভেসে উঠছিল।

দিন শেষে কোথাও কোন হিংসার খবর পাওয়া যায়নি। যা বাংলার ভোটে কল্পনাতীত। সন্ত্রাস-রিগিং-বুথ জ্যাম শব্দগুলো এখানে মনে ব্রাত্য। তবে, একটা শিক্ষা হল, সবাই পারে বাংলা পারে না কেন? কেন এমন শান্ত ভোট দেখতে পারে না বঙ্গবাসী? আমার দেখা সেরা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ দ্রাবিড়াঞ্চলেই।

Advertisement ---
---
-----