বন্দরনায়েকে-ইন্দিরা-হাসিনার ঝলকে ম্লান ‘প্রথম’ নারীপ্রধান

প্রসেনজিৎ চৌধুরী:  দেশটাই আর নেই৷ একসময় কিছুদিনের জন্য ‘স্বাধীন’ তকমা ছিল৷ পরে সবকিছু বিলিয়ে গিয়েছিল কমিউনিস্ট রাশিয়ার গর্ভে৷ আর সেই ক্ষণিকের স্বাধীন রাষ্ট্রের সর্বময়কর্ত্রী হয়ে এখনও তাঁর নামটিই জ্বলজ্বল করে বিশ্বের কোনও দেশের নারীপ্রধান হিসেবে৷ তবে একেবারেই অনুচ্চারিত৷ ফলে ইতিহাসের পাতায় বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি পান শ্রীলঙ্কা দ্বীপের বন্দরনায়েকে৷ আর ভারতের কিংবদন্তি প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান ইন্দিরা৷ তবে অলক্ষ্যেই থেকে যান আনচিমা৷

বাংলাদেশে পরপর তিনবার ক্ষমতায় শেখ হাসিনা৷ এশিয়া তথা উপমহাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে এটি একটি অনন্য নজির৷ এসবের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছেন আনচিমা৷

বিশ্বের ‘প্রথম’ কোনও দেশের নারী প্রধানের কথা জানতে হলে আমাদের ফিরতে হবে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে৷ আচমকা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছিল প্রবল ঠাণ্ডার স্থান সাইবেরিয়া লাগোয়া এক ছোট্ট ভূখণ্ড- তুভা৷ চারিদিক ঘিরে রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মঙ্গোলিয়া৷ দুটি রাষ্ট্রেই প্রবল কমিউনিস্ট শক্তি৷ তাদের মাঝে কী করে তুভা আর নিজেকে ‘লাল ছোঁয়া’ বাঁচিয়ে চলতে পারে৷ অতএব তুভাতেও অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে লাল হাওয়া৷ আর সেই ধাক্কায় ১৯২১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তুভা৷ সোভিয়েত এবং মঙ্গোলিয়ার তরফে স্বীকৃতি জুটে যায়৷ ব্যাস শুরু হয়ে গেল তুভা দেশটির পথ চলা৷

রাশিয়ায় জারতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন, চিনে রাজতন্ত্র বিরোধী সংগ্রামের আবহেই তুভায় জন্ম আনচিমার৷ পুরো নাম খের্তেক আনচিমা টোকা৷ বিশ্ব অবশ্য তাঁকে আনচিমা নামেই পরে চিনবে৷ ততদিনে তুভান কিশোরী নিজেকে কমিউনিজমের আবহে মিশিয়ে দিয়েছিলেন৷ ১৯১১ সালে তাঁর জন্মের বছরটি গুরুত্বপূর্ণ-সেই বছরেই ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল৷ আর রুশ দেশের ইতিকথায় লেখা হচ্ছিল জারতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনের ভূমিকা৷ তারও কয়েকবছর পরে প্রবল বলশেভিক শক্তির উত্থানে রাশিয়ার খোলনলচেই পাল্টে যায়৷ আনচিমা সেই সময় তুভা থেকে সরাসরি সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে গিয়েছিলেন৷

পরের ঘটনা আরও চমকপ্রদ৷ খোদ সোভিয়েত বদান্যতায় আনচিমার পরবর্তী রাজনৈতিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল লেনিন-স্টালিনের প্রত্যক্ষ নজরে৷ সোভিয়েত শিক্ষা শেষ করে তুভা ফিরে এসেছিলেন আনচিমা৷ সেখানকার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন৷ এই সময়ের ঘটনাক্রম আরও চমকপ্রদ৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পাল্টে যায় বিশ্ব রাজনীতি৷ জার্মানির পরাজয়ের পর রাশিয়ার মাটিতে বলশেভিক কমিউনিস্ট সরকারের সোভিয়েত শাসন আরও পোক্ত হয়৷ আর সীমান্তবর্তী তুভা তখন কমিউনিস্ট শক্তির আরও এক ঘাঁটি৷

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই মধ্যবর্তী সময়ে তুভায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম ছিলেন আনচিমা৷ তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হত তুভান পিপল রেভলিউশনারি পার্টি৷ এটি মূলত রুশ কমিউনিস্টদের একটি শাখা হিসেবেই পরিচিত হয়৷ তার অন্যতম নেতা ছিলেন সুলচাক টোকা৷ তাঁর সঙ্গেই বিয়ে হয় আনচিমার৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই সমটিতে আনচিমার হাতেই ছিল তুভার শাসনভার৷ কারণ সেই সময়েই তিনি দল ও স্থানীয় শাসনের সর্বসময় উচ্চপদে আসীন৷ যেহেতু তুভাকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করেছিল সোভিয়েত ও মঙ্গোলিয়া তাই আনচিমা হয়ে গেলেন সেই বিরলতম কৃতিত্বের অধিকারিনী৷

তবে সেই কৃতিত্ব কালের গর্ভে হারিয়ে গেল৷ একসময়ের স্বাধীন তুভা অচিরেই সোভিয়েতের অধীনে একটি অঙ্গরাজ্য হয়ে যায়৷ স্থানীয় আইনসভা সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নেয়৷ ১৯৪৪ সালের পর থেকে তাই দুনিয়ায় কোনও দেশ হিসেবে আর চিহ্নিত হয়নি তুভা৷ তবে এখানকার পৃথক আইনসভাটি সক্রিয়৷ মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়ার মিলিত বৈশিষ্ট নিয়েই চলেছেন তুভানবাসী৷

স্বাধীন তকমা মিটলেও আনচিমা কিন্তু রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তেমন হারিয়ে ফেলেননি৷ সোভিয়েত জমানা ও পরবর্তী সময়ে রাশিয়াতেও তাঁর নাম বিশেষ আলোচিত, কিন্তু মুছে গিয়েছে প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে থাকার গৌরবটি৷ ২০০৮ সালে প্রয়াণ হয় তাঁর৷