জেল কুঠুরির শিল্পীদের হাতে রঙিন হবে খিদিরপুরের দুর্গা মণ্ডপ

দেবযানী সরকার, কলকাতা: ঘণ্টা পড়লে বন্ধ হয়ে যায় দরজা৷ একদিকে বাকি দুনিয়া অন্যদিকে বন্দি জীবন৷ কারাগার থেকে সংশোধনাগার হয়েছে আইনি পথে৷ আসামীরা চলে গেল বিচ্ছিন্ন জীবনে৷ সেখানে আলাদা জগৎ৷ তবুও শিউলি মেশানো ভোরের সুবাস জেলখানার দেওয়াল ভেদ করে ঢুকে পড়ে৷ বন্দিরাও জানে মা আসছেন৷ এরা কেউ খুনি, কেউ অপহরণকারী, কেউ আবার অন্য কোনও অসামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত। গারদের ওপারে থাকা এই মানুষগুলির হাতেই এবার সাজবে খিদিরপুর সার্বজনীনের দুর্গা মণ্ডপ৷

‘ক্রাইম ডাজ নট পে’ এর মানে কী, এর অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে৷ প্রচলিত অর্থটি হল অপরাধের ক্ষমা নেই৷ কিন্তু অপরাধী ? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারও মানবিক চাহিদার দিকে নজর পড়েছে৷ তবুও যে অপরাধী সেই যেন অচ্ছুৎ৷ তার হাতেই দেবীর পরিস্ফুটন হবে৷ মহানগরের পুজো থাকবে তারই সাক্ষী৷

- Advertisement -

৯২ তম বছরের পুরনো ক্লাব এবার বন্দিদের আঁকা মধুবনি শিল্পকলাকে মণ্ডপসজ্জায় তুলে ধরতে চলেছে৷ একসময় অন্ধকার জগতে দাপিয়ে বেরানো মানুষদের উপরেই আস্থা রেখেছেন তারা। সংশোধনাগারের ১৫ জন বন্দি রং-তুলিতে ফুটিয়ে তুলছেন মধুবনি শিল্প। ৪০ টি ক্যানভাসে ফুটে উঠছে পৌরাণিক কাহিনী থেকে মানুষের দৈনন্দিন চিত্র। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প যেমন কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, সবুজসাথীকে মধুবনি শিল্পের মধ্য দিয়ে ক্যানভাসে তুলে ধরা হবে। জেলের পুরুষ বন্দিদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন মহিলা আসামীরাও। পুরুষরা যেমন মণ্ডপের দেওয়াল সাজাচ্ছেন তেমন মহিলারা তৈরি করছেন দেবীর সাজসজ্জা। পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছেন শিল্পী আশিস দাস।

পুজো প্যান্ডেল সাজাতে বন্দিরাই তৈরি করছেন হাতকড়া, বেড়ি, শিকলের আদলে তৈরি আলপনা, কল্কা৷ এও এক অভিনব বিষয়৷ যে জীবনের সঙ্গে তারা জড়িয়ে শিল্পরীতিতে তারও ছাপ পড়ছে৷

সংশোধনাগারের শিল্পের ছাত্র যারা তাদের এতবড় দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কি? খিদিরপুর সার্বজনীন এর সহ সম্পাদক অভিজিৎ দাস এর বক্তব্য, “দস্যু রত্নাকরও তো বাল্মীকি হয়েছিলেন। আসলে আমরা চাই সংশোধনাগার থেকে বেরিয়ে এই মানুষগুলো একটা নতুন পরিচয় নিয়ে জীবন শুরু করুক।” পুজো কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে এই কয়েকজন বন্দিকে প্যারোলে ছাড়িয়ে মণ্ডপে আনা হবে। সেখানে ওয়ার্কশপে তারা কাজ করবেন। আপাতত জেলের কুঠুরিতেই নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে তপন,বাবলি, আকাশ আলিদের৷

এবছর চমকের মধ্য দিয়ে সমাজকে আরও একটি বার্তা দিতে চলেছে খিদিরপুর সার্বজনীন৷ সোনা-রূপো-পান্না-চুনি-মুক্তো, এই পঞ্চ রত্ন দিয়ে বাঁধানো বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম একটি ক্যানভাস তৈরি করছেন বন্দিরা৷ দুই ইঞ্চি বাই দুই ইঞ্চি সেই ক্যানভাসে দুর্গারূপী একটি শিশুকে তুলে ধরা হবে৷ মহামূল্যবান ক্যানভাস ঘিরে থাকবে প্রচুর নিরাপত্তারক্ষী৷ উদ্যোক্তাদের কথায়, “একটা ক্যানভাসের জন্য এত নিরাপত্তারক্ষীর ব্যবস্থা করলে একটি শিশুকে আমরা সেই নিরাপত্তা দিতে পারব না?”

Advertisement
---