ধর্মঘটের উৎসে রয়েছে আসলে ধর্মকর্ম-ই

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: দুই দিন ধরে চলছে ট্রেড ইউনিয়নগুলির কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মঘট। কলকাতায় বনধের তেমন না পড়লেও জেলায় ধর্মঘটের প্রভাব স্পষ্ট। এই ধর্মঘট মানে কাজকর্ম সমস্ত বন্ধ এবং যেখানে বা যারা ধর্মঘট ডাকছেন তাদের উদ্দেশ্য থাকে সবকিছু স্তব্ধ করে ধর্মঘট সফল করা। কিন্তু এই ধর্মঘটের সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দেওয়া বা সবকিছু থমকে দেওয়ার কোনও সম্পর্কই নেই।

তবু আমরা বলে থাকি ধর্মঘট। অপভ্রংশ এখানেও কাজ করেছিল, তবে সেটা উচ্চারনের মাধ্যমে নয়, ঘটেছিল অন্যরকম ভাবে। কেমন সেই পরিবর্তন? ধর্মঘট’ শব্দটির উৎস সম্পূর্ণ আলাদা। এর সঙ্গে সত্যি যোগ আছে ধর্মের। মানব ধর্ম বা কোনও পেশায় নিযুক্ত মানুষের কর্মজাত ধর্ম নিয়েই শুরু হয়েছিল ধর্মঘটের যাত্রা।

ধর্মঘট শব্দটির আসল অর্থ ‘ধর্মার্থে ঘট বা কলসদান ব্রত’। সন্ধি বিচ্ছেদ করলে হয় ধর্ম + ঘট। এবার দেবতার উদ্দেশে বৈশাখ মাসে প্রতিদিন সুগন্ধী এবং জল ভরতি ঘটদান করার এক ব্রত ছিল। আর সেটারই নাম ছিল ধর্মঘট। এর অর্থ ওই ধর্মকে সাক্ষী করে ঘটস্থাপন।

পাশাপাশি আরও যদি এই ধর্মঘট অর্থের আরও গভীরে যাওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে, তৎকালীন সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষজন অর্থাৎ স্বর্ণকার, কর্মকার, কুম্ভকার, তাঁত শিল্পীদের প্রধানরা স্বজাতি প্রতিনিধিদের ডেকে নিতেন নির্দিষ্ট কোনও স্থানে। এরপর, নির্দিষ্ট দেবস্থানে সভা করে জাতিগত বা ব্যক্তিগত অভিযোগ ব্যক্ত করা হত। এই সভায় ধর্মের নামে একটি জলপূর্ণ ঘট আম পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হত।

এরপর ঘটের গায়ে তেল সিঁদূরে আঁকা চক্র এঁকে পুরোহিত দিয়ে পুজো করানো হত। এরপর সংশ্লিষ্ট পেশা বা ধর্মের ধর্মরাজকে আবাহন ও পূজো করে সকলকে প্রসাদ বিতরণ করা হত। এরপরে ঘটের সামনে রাখা পান-সুপারি-কাঁচা হলুদ খন্ড নিয়ে ঘট স্পর্শ করে শপথে করানো হত। শপথ বাক্য বলা হত, ‘আমি অদ্যকার ‘ঘোঁট’ অনুসারে, মাতব্বরদের মত এবং সকলের মতে আমিও এক ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে আমরা আমাদের শিল্পজাত সামগ্রী যোগাব না বা তার বা তাদের জন্য কোনও কাজ করবো না।

আজ ধর্মরাজের পান-সুপারী গ্রহণ করলাম।তাঁর আদেশ, নির্দেশ কোনওটাই অমান্য করব না, এবং আমার গ্রামের সকলকে হুকুমের মতো কাজ করতে বাধ্য করবো।” অর্থাৎ সেই সুপারী দেওয়ার রেওয়াজ। এবং এখানে সুপারী দিচ্ছেন স্বয়ং ধর্মরাজ।

এই যে কাজ ধর্মের বা ধর্ম দেবতার শপথ নিয়ে মতবিরোধীদের হয়ে কাজ না করার যে বিষয় এবং ধর্মরাজের আদেশে নিজের বক্তব্য এবং দাবি অন্যন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রভাবিত করার চেষ্টাই এখন কর্মনাশা ‘ধর্মঘট’ হিসাবে পালিত হচ্ছে।

তথ্যসূত্র – ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কলিকাতায় চলাফেরা বই

----