‘পুলিশ বাবা’ রয়েছেন তাই ‘খেয়ে-পড়ে’ আলোর পথে শবর সম্প্রদায়

স্টাফ রিপোর্টার: পুলিশ শুনলেই সাধারণত ঝামেলা, সংঘর্ষ, অশান্তি শব্দগুলো পরপর মনে চলে আসে। কিন্তু সেই ধারনাকেই বদলে দেবে পুরুলিয়ার “পুলিশ বাবা”। এই নামেই পুরুলিয়ার পুঞ্চা গ্রামের আশেপাশের লোকরা চেনেন অরূপ মুখোপাধ্যায়কে। কলকাতা পুলিশের এই কনস্টেবল নিজের আয় থেকেই খুলে ফেলেছেন শবরদের জন্য এক স্কুল। যেখানে পড়েন একশরও বেশি অনগ্রসর শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা।

দক্ষিণ কলকাতা ট্রাফিক গার্ডে কনস্টেবলে পদে চাকরি করেন অরূপ মুখোপাধ্যায়। মাসের শেষে মাইনে বাবদ পকেটে ঢোকে ৩৬,০০০-এর কিছু বেশি টাকা। রোজগারের একটা বড় অংশ খরচ হয়ে যায় স্কুলের পেছনে। শুধু তো আর পড়ানো নয়, সঙ্গে ছাত্রদের বই খাতা এবং গরীব শবর ছাত্রদের তিনবেলা খাওয়া। এর জন্য প্রতিমাসে ২০,০০০ টাকার বেশি খরচ করেন তিনি৷

১৯৯৯ সালে কলকাতা পুলিশে কনস্টেবল পদে যোগ দেন অরূপ। তখন থেকে কিছু কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। ২০১০ সালে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা লোন নেন৷ মায়ের কাছে থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নেন। পুঞ্চা গ্রামের বাসিন্দা ক্ষিরোদশশী মুখোপাধ্যায়ের দেওয়া জমিতেই শুরু হয় তাঁর স্কুলের কাজ। এর নাম দেন পুঞ্চা নবদিশা মডেল স্কুল।

- Advertisement -

২০১১ সালে ২০ জন শবর শিশু নিয়ে আবাসিক পুঞ্চা নবদিশা মডেল স্কুলের পথ চলা শুরু করে। বর্তমানে ১১২ জন ছাত্র ছাত্রী পড়ে এখানে৷ কেন এই স্কুল খোলার পরিকল্পনা? Kolkata24x7-কে অরূপ মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমি তখন বেশ ছোট। দাদুর মুখে শুনতাম শবররা চুরি করে নিয়ে গেছে। প্রতিদিন একই কথা শুনতে শুনতে আমি দাদুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে শবররা কেন চুরি করছে? দাদু বলেছিলেন যে দুটো কারণে চুরি করে, পেটের জন্য আর শিক্ষার অভাবে। তখনই ঠিক করেছিলাম বড়ো হয়ে শবরদের জন্য একটা স্কুল করব।”

নার্সারী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত আমার পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে এই স্কুলে। এছাড়াও যারা উচ্চশ্রেণীতে ভর্তি হয় তাদে স্কুলে থাকা, খাওয়া , প্রাইভেট সবরকম খরচ যোগান অরূপ। এখনও পর্যন্ত কোনরকম সরকারি সাহায্য জোটেনি অরূপ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা পুঞ্চা নবদিশা মডেল স্কুলটির। কিন্তু তাতে কী? একটুও দমেননি কলকাতা পুলিশের এই কনস্টেবল। একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন শবরদের শিক্ষিত করার কাজে।

পুঞ্চার পাশে পাড়ুঁই গ্রামের বাসিন্দা অরূপবাবু। কিন্তু পেশার সূত্রে থাকতে হয় কলকাতাতেই। শবরদের শিক্ষিত করার এই লড়াই নিয়ে তিনি জানান, “স্কুল চালানোর জন্য কোনরকম সরকারী সাহায্য পাই না। আমার বেতনের টাকা, এবং আরও কয়েকজন সাহায্য করে বলে আমি প্রতিদিন বাচ্চাদের শিক্ষা এবং সামান্য অন্নসংস্থান করেছি। নিজের চাকরির ক্ষতি করে যখন ইচ্ছা চলে যাই শবরদের কাছে। বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াই। তাদের পাশে সব সময় থাকতে ইচ্ছা করে। কিন্তু পেটের দায়ে চাকরি করতে হচ্ছে। ওদের ছেড়ে থাকতে আমার ভালো লাগে না। প্রত্যেক মানুষের জন্ম হয় কোন না কোন কারণে ,সবাই তা বুঝতে পারে না ৷ কিন্তু আমি জানি আমার জন্মটা এদের জন্যই হয়েছে।”

Advertisement
---