সময়ের পরিবর্তনই হয়েছে, শিক্ষা হয়নি পুলিশের

রানা দাস: ঠিক সাত বছর আগের স্মৃতিটা ফের উসকে দিল৷ বৃহস্পতিবার সকালটা একসুত্রে বেঁধে গেল লালগড়ের ঝিটকার জঙ্গল-আলিপুরদুয়ার৷ একটা মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা৷ অন্যটি কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (কেএলও) মুক্তাঞ্চল৷ তবে, এই দুই স্পর্শকাতর এলাকার সঙ্গে এক যোগসুত্র যোগ করল রাজ্য পুলিশের তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি৷ বৃহস্পতিবারের এই সকালটা ফের প্রমাণ করল সিআইডি’র অফিসারদের একাংশের চরম অপদার্থতা৷ তাঁদের নির্বুদ্ধিতার জন্য ঠিক সাত বছর আগের এক সকালে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছিল দু’জন দক্ষ (!) পুলিশকর্মীকে৷ এদিন সকালেও প্রাণ দিত হল আরও একজনকে৷ সেদিনও আরও অনেক প্রাণ  চলে যেতে পারত৷ আজও তা হতে পারত৷

বুধবার রাতে জলপাইগুড়ি আলিপুরদুয়ারের চৌপথি মোড়েই ব্যাগসহ পরিত্যক্ত সাইকেলকে ঘিরে বোমাতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল৷ শঙ্কা থেকেই সাইকেল থেকে ব্যাগটা সরিয়ে রাখা হয়েছিল জনবহুল এলাকা থেকে দুরে একটি ফাঁকা মাঠে৷ আর সেই ‘সম্ভাব্য’ বোমাকে নিষ্ক্রিয় করতে গিয়েই প্রাণ হারাতে হল সিআইডি’র বম্ব স্কোয়াডের এক অফিসারকে৷ এদিন সকালে অফিসে বসে টিভি চ্যানেলের পর্দার সেই ছবিটা দেখেই সাত বছর পুরনো স্মৃতিটা উসকে দিল৷

২০০৬ সাল৷ ২১ সেপ্টেম্বর৷ কর্মসূত্রে মেদিনীপুরে শহরে৷ আগেই দিনই ঝাড়গ্রামের এক প্রত্যন্ত এলাকা বাস থেকে নামিয়ে সিপিএম নেতা অনিল মাহাতকে খুন করে মাওবাদীরা৷ সেইদিন থেকে প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা৷ কোথাও গাছ উপড়ে, কোথাও খুঁটি উপড়ে রাতভর বিদ্যুতবিচ্ছিনন্ন ছিল  জেলা৷ ঝড়ের তাণ্ডবে জেলার বিভিন্ন প্রান্তই লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল৷

- Advertisement -

সকালেই মেদিনীপুর শহরে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে খবর আসে, লালগড়ে ঝিটকার জঙ্গলে প্রচুর আরডিএক্স বিস্ফোরকের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ৷ জেলা পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রেখে৷ খবর পাওয়া মাত্রই একটি চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান আর আমার চিত্র সাংবাদিকে সঙ্গে নিয়ে বাইকে চেপে ঘটনাস্থলে পৌঁছে জানতে পারলাম, আরডিএক্স পাওয়ার খবরটা ভুল ছিল৷ বাস্তবে একটা গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করে রেখে দেওয়া হয়েছে৷ আর সেই কাটা গাছের কান্ডের পাশে একটা ল্যান্ডমাইন পোঁতা রয়েছে৷ ল্যান্ডমাইনটা পোঁতা ছিল দিক নির্দেশ করে৷ অর্থাৎ, রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনও গাড়িতে আঘাত হানার জন্যই পুঁতে রাখা হয়েছিল৷ মাইনের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বৈদ্যুতিক তার৷ যা চলে গিয়েছে ঘন জঙ্গলের মধ্যে৷

একটা বোমা বা ল্যান্ডমাইনের সন্ধান পেলে, প্রথমেই যাদের তলব পড়ে, এই ক্ষেত্রেও অপেক্ষা করা হচ্ছিল সিআইডি’র বম্ব স্কোয়াডের জন্য৷ সংবাদমাধ্যমের পৌঁছনোর অনেক পরে এসে ঘটনাস্থলে হাজির হন জেলা পুলিশ কর্তারা৷ তারও পরে আসে বম্ব স্কোয়াড৷ প্রাথমিক অবস্থায় বম্ব স্কোয়াড সদস্য যা করে থাকে, ঝিটকার জঙ্গলে পাওয়া ল্যান্ডমাইন নিষ্ক্রিয় করতে সেই একই কাজগুলো একে একে করে নিলেন তাঁরা৷ সন্তর্পনে কেটে নেওয়া হল বৈদ্যুতিক তার৷ আমাদের আশ্বস্ত করা হল৷ বিপদ কেটে গিয়েছে৷

এবার খুলে দেখার পালা, স্টিলের টিফিন বক্সটি খুলতে স্কোয়াডের সঙ্গে আনা বাক্স থেকে বের করা ছেনি-হাঁতুড়ি৷ সেই সময়ের আগে পর্যন্ত জানতাম যে, ছেনি-হাঁতুড়ি রাজমিস্ত্রিদের কাছেই থাকে৷ পুলিশের বম্ব স্কোয়াডেরও থাকে, সেদিনই তা প্রথম জানলাম৷ সিআইডির বাঘা অফিসার আশ্বস্ত করেছেন৷ তাই কিসের ভয়৷ ল্যান্ডমাইনের কাছেই ছিলাম৷ দেখছিলাম ছেনি-হাঁতুড়ি দিয়ে কীভাবে ল্যান্ডমাইন খোলা হয়৷ হাঁতুড়ির প্রথম আঘাতের একটু আগেই সাংবাদিকের মন বলে উঠেছিল, এটা এখন ফেটে গেলে, কাল সকালের কাগজে ভাল একটা খবর ‘বাই লাইন’ দিয়ে বেরতে পারে৷ ভাবনা শেষ হতেই, বিকট শব্দে কান বন্ধ হয়ে গেল৷ চোখের সামনে দেখতে পেলাম, সাদা ধোঁয়ার সঙ্গে সিআইডির বম্ব স্কোয়াডের বাঘা অফিসার ‘ভক্তা’র (পুরো নামটা মনে পড়ছে না) দেহটা কুণ্ডলি পাকিয়ে উড়ে গেল৷

বৃহস্পতির সকালে টিভির পর্দায় আলিপুরদুয়ারের ঘটনায় স্মৃতিটা উসকে দিল৷ একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিল, দিন বদলেছে, প্রযুক্তির উন্নতিই হয়েছে৷ এখনও উন্নতি হয়নি রাজ্য পুলিশের৷ সেদিনই খুব গাঁছাড়াভাবে বোমা নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে দুই পুলিশ অফিসারের মৃত্যু হয়েছিল, আমার মতো সাংবাদিকদের ফিরে আসতে হয়েছে মৃত্যুমুখ থেকে৷ এদিনও সিআইডি’র বম্ব স্কোয়াডের তিন অফিসার গাঁছাড়া মনোভাব নিয়েই বোমা নিষ্ক্রিয় করতে গিয়েছিলেন৷ ছিল না ন্যূনতম সতর্কতা বর্ম পড়ার  প্রয়োজনও মনে করেননি৷ তারই, ফলে সাত বছরের ব্যবধানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল৷ অকালে প্রান দিতে হল আরও এক দক্ষ পুলিশ অফিসারকে৷

Advertisement
---