জন্মদিনে সুরসম্রাজ্ঞী

মুম্বই:  সুরের আকাশের ধ্রুবতারা। ভাললাগায়, ভালবাসায়, অভিমানে, বিচ্ছেদ্যে আজও একা রাতে একলা ঘরে স্নিগ্ধ মায়াবী কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন, ‘জিনা কেয়া হে জানা মেয়নে…’। আসলে সব কথা মুখে বলা যায়না, তাই প্রেমিকের মনের হদিশ মেলে সুরের ধারায়, একান্তে সে বলে যায় ‘মেরে নেয়না সওয়ান ভাদো..’। আসলে মন খারাপ বা খুশির ভাষায় কোনও অনুবাদ হয় না, তবে কেউ কেউ তাঁর কণ্ঠের ঐশ্বর্যে ধরে রাখতে পারেন সেই মন কেমন করা আকুতি। ‘নাইটেঙ্গল অফ ইন্ডিয়া’ যাঁর মেলোডিতে একসঙ্গে দুলে ওঠে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী। আজ ৮৬ বছরে দাড়িঁয়েও, ভারতবাসীর কাছে লতা মঙ্গেশকরের কোন বিকল্প নেই, আর থাকতেও পারে না। 3

শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী বাবা দীননাথ মঙ্গেশকরের কাছেই প্রথম তাঁর কণ্ঠে বাঁধে সুর। তবে নদীর ধারার মতো লতাও খুঁজে নেন তাঁর মোহনা। ওস্তাদ আমানত আলির খাঁ সাহেবের সান্নিধ্যে শুরু হয় লতার সফর। পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো ঘর-কন্যা মন ছিল না তাঁর। রান্না ঘরে হাতা-খুন্তির খট খট শব্দে সংসারের ডাক নয় তাঁর কানে ভেসে এসেছিল তানসেনের অলৌকিক সেই সুর। যে সুরে বারি ধারার মতো লতার কন্ঠে ঝড়ে পড়েছিল সুরের ধারা। সেই ধারা আজও অব্যাহত।

১৩ বছর বয়সে রোল মডেল হিসাবে সুরের দুনিয়ায় অভিষেক হয় লতার। তবে ব্রেকটা তিনি পেয়েছেন মারাঠি ছবি ‘গজাভাউ’-তে। সেই শুরু। মধুবালা পূর্বরাগ ‘আয়েগা আনেওয়ালা’ থেকে ডিম্পলের সদ্য প্রেম ‘হাম তুম এক কামরেমে বন্দ হো’ কথা যিনি সাবলীলায় বলেন, তিনিই আবার প্রীতির ঠোঁটে শুনিয়ে দেন প্রেমের নিবিড় কথা ‘তেরে লিয়ে হাম জিয়ে’। বঙ্গোপসাগর হয়ে লতার সুর বেয়ে এসেছে বাংলার গঙ্গায় । সলিল চৌধুরীর কথায় বাংলাকে বলে দেন “ না যেওনা, রজনী এখনও বাকি”। ‘সাত ভাই চম্পা’-এ জাগিয়ে ‘রঙ্গিলা বাঁশি’-র সুরে তিনি শুনিয়ে দিন ‘ও মোর ময়না গো’। তবে শুধু বাংলা বা হিন্দি নয় এখনও পর্যন্ত ৩৬ টি ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। ধ্রুপদী থেকে রোমান্টিক,গজল,ভজন-গানের প্রতিটি ধারায় তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ-সুরেলা আবেশ আচ্ছন্ন করে রেখেছে আপামর সঙ্গীত পিপাসুদের।2

সুদীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে আজারে পরদেশি,কাহি দ্বীপ জলে কাহি দিল,বিতী না বিতাই রেয়না,তেরে বিনা জিন্দেগি সে,তেরে বিনা জিয়া যায়ে না,ন্যায়নো মে বদরা, চলতে চলতে এবং ইয়ারা সিলি সিলি প্রভৃতি অসংখ্য গানের মধ্যে ঢেলে দিয়েছেন সুরের ঝর্ণা ধারা.১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বিশ্বে সর্বাধিক গান রেকর্ড করার জন্য গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম ওঠে তাঁর। ২০০১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ভারতরত্ন দেয়া হয় তাঁকে৷ জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ৩ বার, ফিল্মফেয়ার পুরস্কার চারবার৷ এছাড়া পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে, রাজীব গান্ধী পুরস্কারসহ অজস্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি৷

তবে সবই লতার সুরের কাছে নেতাই ঠুনকো। সময়, সম্মান দিয়ে মাপা সম্ভব নয় তাঁর অবদান। ‘লতা নাইটেঙ্গল অফ ইন্ডিয়া’ নামটি লেখা থাকবে মহাকালের পাতায়। তিনি ছিলেন, আছেন আর থাকবেন সুরের রানি হয়ে মেলোডিয়াসের কাউন মাথায় নিয়ে।

মানসী সাহা

----
-----