পদ্মাপারে ভোট: প্রখ্যাত স্বামী সুরঞ্জিত ‘সুনাম’ বড় ভরসা স্ত্রী জয়ার

প্রতীকী ছবি

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বৃষ্টি নিয়ে নেমে আসে মেঘ৷ নিচে বয়ে চলা সুরমা নদীতে পাক খায় টাবুরে নৌকা৷ বিশাল বিশাল হাওর (জলাভূমি) এই এলাকার অতি বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সম্পদ৷ ভারত সীমান্তবর্তী এমনই এলাকা সুনামগঞ্জ৷ সিলেট বিভাগেই তার অবস্থান৷ এমনই এলাকার ‘সুনাম’ হয়ে বারে বারে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কাঁপিয়েছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত৷ মৃত্যুর পরেও তিনি ভোট বাজারে রয়েছেন স্বমহিমায়৷

স্বামী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে তরতরিয়ে জয়ী হয়েছিলেন স্ত্রী জয়া৷ জাতীয় সংসদ সদস্য এবারের নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের৷ তবুও জয়ের জন্য প্রয়াত স্বামীর সুনামটাই বড় ভরসা জয়াদেবীর৷ বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্ত্রী হয়েও রাজনীতির মাঠে তিনি নবাগতা৷ কিন্তু স্বামী ছিলেন তীব্র আলোচিত তথা দেশটির অন্যতম সংখ্যালঘু শীর্ষ নেতা৷ এমনই প্রভাব ছিল যে দফতর বিহীন মন্ত্রী হয়েই দাপট দেখিয়ে গিয়েছেন৷

- Advertisement -

কেমন দাপট সেটা বোঝা গিয়েছিল ২০০৮ সালে৷ আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতায়৷ আর সুরঞ্জিতবাবু রেলমন্ত্রী৷ এই সময় তাঁর সহকারীর অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে৷ এর জেরে তিনি পদত্যাগ করেন। শুরু হয় প্রবল বিতর্ক৷ এত সবের মাঝেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পাঠানো পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি৷ বরং দফতর বিহীন মন্ত্রী হিসেবে তাঁকে মন্ত্রিপরিষদে রাখেন। কারণটা পরিষ্কার, প্রথমত সংখ্যালঘু জনপ্রিয় নেতার তকমা, দ্বিতীয়ত সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত৷

অবশ্য আরও একটা ঘটনায় তিনি বিশেষ আলোচিত৷ সেই ঘটনার কেন্দ্র ২০০৪ সালের ভয়াবহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দিন৷ তৎকালীন বিরোধী নেত্রী তথা আওয়ামী লীগ সুপ্রিমো শেখ হাসিনাকে ঢাকায় প্রকাশ্যে খুনের ষড়যন্ত্র করে হুজি-বি জঙ্গি সংগঠন৷ জনসভায় বঙ্গবন্ধু কন্যাকে লক্ষ্য করে পরপর গ্রেনেড হামলা হয়৷ এতে অনেকের মৃত্যু হলেও অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন হাসিনা৷ সেই নাশকতায় রক্তাক্ত হয়েও দলনেত্রীকে ঘিরে মানববর্ম করে থাকা বাকিদের সঙ্গে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন৷ পরে রক্তাক্ত রাজপথ দিয়ে তাঁকে গুরুতর জখম অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার ছবি প্রকাশ হয়৷

সৌজন্য: ডেইলি স্টার

কখনও সুবক্তা তো কখনও প্রবল সাহসী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দলে বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিলেন৷ ২০১৭ সালে তাঁর প্রয়াণ হয়৷ এর পর সুনামগঞ্জ-২ আসনটির উপনির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে সুরঞ্জিতবাবুর স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তকেই টিকিট দেয় আওয়ামী লীগ৷ প্রত্যাশিতভাবেই জয়ী হয়েছিলেন জয়াদেবী৷ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-র নাছির উদ্দিন চৌধুরী৷ জবরদস্ত নেতা হিসেবে পরিচিত৷ ফলে সুনামগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা বনাম বিএনপির ধানের শীষের লড়াইটা তুঙ্গে৷ ১৯৯৬ সালে এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে লড়াই করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে পরাজিত করার রেকর্ড রয়েছে তাঁর৷ তারপর অবশ্য বারে বারে হারতেই হয়েছে৷

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সুরঞ্জিতবাবুর নামের সঙ্গেই যেন ছায়াযুদ্ধ বিএনপির নাছির উদ্দিনের৷ আর এখানেই অল্প হলেও চিন্তার কারণ জয়াদেবীর৷ সম্প্রতি সিলেট সিটি কর্পোরেশন দখল করেছে বিএনপি৷ সেই ধাক্কা সুনামগঞ্জে পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে৷ অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির ভোট যুদ্ধের মাঝে বাকি প্রার্থীদের ভোট কাটার শতাংশ প্রভাব ফেলবে ফলের উপরে৷ দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর পাশাপাশি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল প্রার্থীরা রয়েছেন৷

দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম সারির নেতা ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত৷ তাঁর সরস মন্তব্য, তীক্ষ্ণ বাক্যবাণে বারবার প্রতিপক্ষ তথা বিএনপি-জামাত ইসলামি পর্যুদস্তু হয়েছে৷ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সুরঞ্জিতবাবুর উপস্থিতি মানেই প্রাঞ্জল ভাষায় অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা৷ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বারবার সরকারপক্ষকে সরস ও যুক্তিবাণে বিদ্ধ করা আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিতবাবু কিংবদন্তি হয়েই থেকে গিয়েছেন৷ তাঁর নামটাই বেশি সম্বল স্ত্রী জয়ার কাছে৷ বাকিটা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তথা দলনেত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিশ্মা৷