অদ্রিকা দাস : মা-বাবার কাজের সূত্রে ভারতের বিভিন্ন জায়গা ঘোরা হয়ে গিয়েছিল তাঁর৷ বারবার জায়গা বদলের সঙ্গে বিভিন্ন স্কুলও বদলে ফেলা৷ খানিক অসুবিধা হওয়ার কথা ঠিকই, তবে ছোট থেকেই মানিয়ে, গুছিয়ে নেওয়ার অভ্যেসটা ছিল৷ দেশের বাইরেও এমনকি পড়াশোনা চলতে থাকে তাঁর৷ ভারতীয় হওয়ার কারণে বর্ণবিদ্বেশের স্বীকার হয়েছিলেন৷ বিদেশিদের বুলিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি৷ আর সেই আত্মবিশ্বাসই আজও তাঁর হাতিয়ারের মতো৷

বিদেশে কয়েক বছর থাকার পর বারেলিতে এসে নিজের বাকি পড়াশোনাটুকু শেষে করেছিলেন৷ বারেলির আর্মি পাব্লিক স্কুলে পড়াকালিন একটি বিউটি প্যাজেন্টের শিরোপা তাঁর মাথায় ওঠে৷ তিনি গ্লোবাল স্টার প্রিয়াঙ্কা চোপড়া৷ আজ তাঁর জন্মদিন৷

লোকাল একটি বিউটি প্যাজেন্টে জয়ী হওয়াই হয়ে ওঠে প্রিয়াঙ্কার জীবনের প্রথম টার্নিং পয়েন্ট৷ সেখান থেকে তাঁর উৎসাহ তাঁকে নিয়ে যায় ‘ফেমিনা মিস ইণ্ডিয়া’র মঞ্চে৷ দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার পর শুরু হল ‘মিস ওয়ার্ল্ড’র সফর৷ এই যাত্রায় অসম্ভব পরিশ্রম করে বিশ্বসুন্দীরর খেতাব জিতে নেন তিনি৷ বর্ণবিদ্বেষকে উপেক্ষা করে সেরা শিরোপা আদায় করে নিজের জাত চেনালেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া৷

বিদেশের স্কুলে বসে থাকা লাজুক মেয়েটা আজ শুধু পৃথিবী বিখ্যাত অভিনেত্রী নন ইউনিসেফের সদস্যও বটে৷ এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, “আমি ছোটবেলায় খুব লাজুক ছিলাম৷ আমার মধ্যে ভীষণভাবে আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল৷ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছিলাম, পায়ে সাদা সাদা দাগ ছিল৷ কিন্তু আমি কঠোর পরিশ্রম আমাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে৷ আর আজ আমার পায়ের জন্য ১২ টা ব্র্যান্ডের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর৷”

ব়্যাম্প থেকে টিনসেলের রাস্তা বেশি দূর নয়৷ প্রিয়াঙ্কাও বুঝেছিলেন যে রানওয়েতে ডিজাইনার পোশাক পরে হাঁটা ছাড়াও তাঁর মধ্যে অনেক কিছু আছে৷ বলিউডের হাতছানিতে সারা দিলেন তিনি৷ ‘হিরো’ ছবির মাধ্যমে ডেবিউ করলেন তিনি৷ সহঅভিনেত্রী হওয়ার কারণে তাঁর চরিত্রের তেমন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়নি তাঁকে৷ সেই একই বছরে ‘আন্দাজ’ ছবিতে অক্ষয় কুমারের বিপরীতে অভিনয় করে নজর কাড়লেন দর্শকদের৷

মডেল হওয়ার পাশাপাশি তিনি যে একজন ভালো অভিনেত্রী তা প্রমাণ করে দিলেন৷ বহু পরিচালক-প্রযোজকের আলাদা করে নজরে পড়ল প্রিয়াঙ্কার অভিনয়৷ এছবির পর তাঁর ঝুলিতে এলো প্রথম অ্যাওয়ার্ড৷ ফিল্মফেয়ারের সেরা ডেবিউ অভিনেত্রী হিসেবে সম্মানিত হলেন তিনি৷ বিউটি প্যাজেন্ট থেকে সেরা ডেবিউটান্ট৷ আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে৷

এরপরই ভিন্ন ধরণের চরিত্রে দেখা গেল তাঁকে৷ স্টিরিওটাইপ ক্যারেক্টারের ছকে নিজেকে না ফেলে, কেরিয়ারের পিক টাইমে নেগেটিভ চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি৷ ‘অ্যায়তরাজ’ ছবিতে প্রিয়াঙ্কার প্রশংসায় পঞ্চমুখ গোটা বলিপাড়া৷ ‘মুঝসে শাদি কারোগি’ মুভিতে প্রিয়াঙ্কা তাঁর কমিক টাইমিংয়ের পরিচয়ও দিয়েছিলেন৷ নিজেকে ঘষে মেজে তৈরি করে ফেললেন বলিউডের অন্যতম অক্যাশন গার্ল৷

‘ডন’ ছবিতে তাঁর অভিনয় মুগ্ধ হল সিনেপ্রেমীরা৷ ‘ডন’র মতো বিগ বাজেট ছবি ‘ক্রিশ’এর নায়িকা হিসেবে বাছা হল পিগি চপসকে৷ ধীরে ধীরে ফিল্ম ক্রিটিকদের প্রিয় অভিনেত্রীর ছাড়াও বক্স অফিস ক্যুইনের খেতাব পেলেন প্রিয়াঙ্কা৷

বিগ বাজেট ছবির পরই তাঁর জীবনে এলো সেরা টার্নিং পয়েন্ট৷ ‘ফ্যাশন’ ছবির ‘মেঘনা মাথুর’র চরিত্রটির হাত ধরে পৌঁছে গেলেন জাতীয় পুরষ্কারের মঞ্চে৷ জাতীয় মঞ্চে সেরা অভিনেত্রীর মতো সম্মানে সম্মানিত হলেন মিস ওয়ার্ল্ড৷ মডেল, অভিনেত্রী, অ্যাকশন গার্লের পরই এল ফ্যাশানিস্তার খেতাব৷ ‘দোস্তানা’ ছবিতে তাঁর ‘নেভার সিন বিফোর’ অবতারে দিওয়ানা হল অসংখ্য যুবক৷ এরপর ‘সাত খুন মাফ’, ‘বরফি’র মতো চলচ্চিত্রে নিজের জাত চেনালেন অভিনেত্রী৷

পড়ুন: গোটা সপ্তাহ ‘সংবাদ শিরোনামে’ ছিলেন এই পাঁচ সেলেব

বলিউডে সেরার সেরা অভিনেত্রীর মুকুট তাঁর মাথায়৷ আর সেই সেরা অভিনেত্রীর সৌন্দর্য্যে এবং প্রতিভার কারণে ডাক পড়ল হলিউডের৷ পপস্টার হয়ে হলি দুনিয়ায় পাড়ি দিলেন প্রিয়াঙ্কা৷ গানের প্রতিভাও যে তাঁর মধ্যে ছিল তা এর আগে দর্শকদের জানাই ছিল না৷ হলিউডে দুটি মিউজিক অ্যালবামের পর ওয়েস্টের মানুষজন চিনতে শুরু করে তাঁকে৷ প্রিয়াঙ্কার হলি-সফর এখানেই শেষ নয়৷ আমেরিকান টেলিভিশন সিরিজের মুখ্য অভিনেত্রী হিসেবে তিনিই হয়ে ওঠেন নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ৷ ‘কোয়ান্টিকো’র পর ‘বেওয়াচ’র মতো জনপ্রিয় ফ্র্যানচাইজিতে অভিনয় করার সুযোগ হয় প্রিয়াঙ্কার৷

প্রিয়াঙ্কার কেরিয়ার গ্রাফ দেখলে অনেকেই মনে করবেন তিনি খুব সহজেই নিজের ট্যালেন্টের কারণে এতদূর এসছেন৷ তা কিন্তু একেবারেই নয়৷ বহুবার অসফলও হয়েছেন তিনি৷ একটা সময় বলিউডের কটাক্ষের তীরে বিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি৷ বেশ কয়েকজন পরিচালক, প্রযোজক প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে কাজ করতে রাজি ছিলেন না৷ তাঁর হলিউডের সফলতা দেখে বলিউড থেকে ব্যান করার চেষ্টাতেও ছিলেন কয়েকজন৷ তবে টিনসেলের কিছু এমন সৎ বন্ধু তাঁর ছিল যার জন্য তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলেন৷

----
--