প্রমিথিয়ুস  যেদিন মানুষের জন্য এনে দিয়েছিল আগুন, সেই শুরু সভ্যতার বলিষ্ঠ পথচলা।  তারপর মানুষ এগিয়ে নিয়ে চলেছে সভ্যতার চাকা নতুন নতুন পথ দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রিকতায়। এই আগুন জ্বালাতে শেখাই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে নতুনতর জীবনের দিকে এগিয়ে যেতে। এই সংগ্রামী এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই কোন এক অবসরে তার মস্তিষ্কে জাগ্রত হয় এক অনির্বচনীয় নক্ষত্রের আভাস। দুটি শরীরের ভিন্ন মাত্রিক আকর্ষণ পরস্পরকে প্রবল আকাঙ্খার সন্ধান দিল। যৌনতার স্বাদে সে প্রথম অনুভব করল ঈশ্বরকে। সে চিনতে শিখল কামের স্বরূপ। কামই আদি রিপু। সভ্যতার মূল প্রাচীন সত্য। এই কাম  থেকে প্রেমের সিঁড়িতে উত্তরণ ঘটতে বহুকাল সময় লেগেছে।

অতিথি লেখকঅঞ্জনকুমার দাস
অতিথি লেখক
অঞ্জনকুমার দাস

সাহিত্য জীবনের অনন্য দর্পণ। আধুনিকতার দৃষ্টিতে প্রাচীন ও মধ্য যুগের সমস্ত দলিল, সাহিত্য বিশ্লেষণ করে পন্ডিতেরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, আধুনিক যুগের আগে পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য কোথাও প্রেমের তেমন প্রবল নির্মাণ গড়ে ওঠেনি। কিন্তু মধ্যযুগে প্রেম সামাজিক জীবনে না এলেও প্রেমের একটা  রোমান্টিক ধারণা গড়ে উঠছিল। কিন্তু সে প্রেক্ষণ  ধর্ম ও সামাজিক শৃঙ্খল পেরোতে পারে নাই। ইসলাম, খ্রীষ্টান বা হিন্দু  কোনধর্মেই প্রেমের ব্যাপারে কোন সমর্থন বা প্রশ্রয় পায় নাই। প্রেমকে দেখা হত নিষিদ্ধ ফলের মতো। ভিক্টরীয় চর্চার যুগে রোমান্টিক প্রেমের আবির্ভাব হলে  ইউরোপে তাকে স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু প্রেম ও কাম সে সমবেত সংগীতের মতাই, প্রেমের মধ্যেও যে কামের উদ্ভাস থাকতে পারে এ সময়ে তা স্বীকার করা হয় না। ফলে এই সময়েই প্রেম এক প্লেটোনিক চরিত্র  পায়।
প্রাচীন ভারতবর্ষেও নর-নারীর বিশিষ্ট সম্পর্কে কাম ব্যতীত  প্রেমের বর্তমান রূপ ছিল না। বেদ ও মহাভারতে তার যথেষ্টই প্রমাণ পাওয়া যায়।  নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর কথায়  ‘মহাভারতের কাম স্বাভাবিক, উহাতে শক্তি আছে। কিন্তু লজ্জা নাই। সারল্য আছে কিন্তু বৈদগ্ধ নাই।’ প্রাচীন গ্রীক সাহিত্য ও গ্রীক জীবনের, প্রাচীন ল্যাটিন সাহিত্য ও রোমান জীবনেও নর-নারীর সম্পর্কের যে রূপ দেখা যায় উহা সংস্কৃত সাহিত্যের রূপের মতই কামাবলম্বী।
যুগে যুগে মানুষ হয়তো প্রেমের অন্বেষণই করতে চেয়েছেন কিন্তু প্রেম ধরা দিয়েও দেয়নি।  পদাবলী কাব্যসাহিত্যে কামের একটা নূতন রোমান্টিক রূপ দেখা যায়। কালিদাসের মেঘদূত-এ এর উদাহরণ আছে। ইহাতে কাম একটা সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।  এর ফলে নর-নারীর সম্পর্ক একটা নতুন গৌরব অর্জন করল সত্য কিন্তু পরবর্তীতে  রচিত বৈষ্ণব সাহিত্যেও নর-নারীর যে সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়েছে তাতে মূল অবলম্বন ছিল কামেরই আদিরস। কিন্তু বৈষ্ণব সাহিত্যে ভাগবত প্রেমের এক নতুন দরজা উন্মিলীত হয়। ঈশ্বরকে সমর্পনের ভাষা বলে বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রেম।
ইউরোপীয়রা রোমান্টিক প্রেমের অনুভূতি পায় মধ্যযুগের মাঝামাঝি সময়। তারা বিশ্বাস করতে লাগল যে প্রেমের সহিত কামের কোন সম্পর্ক নাই। প্রেম বিশুদ্ধ পবিত্র। এই ভুল ভাবনার  প্রেমে  তারা  নারীকে  বন্দী  বানাতে চাইল। কিন্তু কাম তার নিজস্ব সুক্ষ্মতা ও স্থূলতা নিয়ে অন্দরমহলে থাকল নিজের মত।  একদিকে একটা সাজানো সদর ও আর এক দিকে লোকচক্ষুর অন্তরালে একটা আবর্জনাপূর্ণ অন্দর দেখা দিল ইউরোপের আধুনিক মজ্জায়।
১২৭৪ খ্রীষ্টাব্দে এক নয় বৎসর বয়স্ক বালক এক রূপসী যুবতীকে দেখিয়া যা অনুভব করেছিল, তার কথা পরজীবনে কবি হয়ে লিখেছিলেনÑ (আজ হইতে নবজীবন আরম্ভ হইল) এই দেবতা আমার চেয়ে শক্তিমান, তিনি আসিয়া আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করিলেন)। প্রণয়িণীর সঙ্গে মিলন এই প্রণয়ীর কখনই হয়নি। কিন্তু তাই বলে প্রেম তার কাছে কখনই দুঃখের কারণ হয় নাই। বরঞ্চ এই কবির শ্রেষ্ঠ কাব্যে উহা গৌরবেরই বস্তু ও দিব্য আনন্দেরই অবলম্বন হয়েছিল। ইনি মহান কবি দান্তে।
দান্তের দর্শনে প্রস্ফুটিত রোমান্টিক প্রেম ইউরোপীয় মধ্যযুগের বিশিষ্ট সৃষ্টি।  দান্তে হতে শুরু করে প্রেমের নতুর রূপ পেত্রাক ও রঁসার  প্রভৃতির কাব্যে প্রকাশিত হয়ে সেক্সপীয়রে এসে পূর্ণ বিকশিত রূপ ধারণ করল। এইখানে এসে প্রেম ও কামের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব খানিকটা মিটে গেল।  কাম এবং প্রেমের মধ্যে যে সম্পর্ক  নিবিড়; বিশুদ্ধতম, পবিত্রতম প্রেমেও কাম আছে। কামবর্জিত প্রেম নাই। প্রেমের চরম আÍসমর্পণ দৈহিক মিলনে। এই সত্য নতুন জীবনদর্শনে জায়গা করে নিল। কিন্তু বিশুদ্ধবাদীরা প্রেমের মধ্যে থেকে কামকে বিসর্জনের যাত্রা করিয়েই রাখলেন।

দান্তে হতে শুরু করে প্রেমের নতুর রূপ পেত্রাক ও রঁসার প্রভৃতির কাব্যে প্রকাশিত হয়ে সেক্সপীয়রে এসে পূর্ণ বিকশিত রূপ ধারণ করল। এইখানে এসে প্রেম ও কামের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব খানিকটা মিটে গেল। কাম এবং প্রেমের মধ্যে যে সম্পর্ক নিবিড়; বিশুদ্ধতম, পবিত্রতম প্রেমেও কাম আছে।
Advertisement

ইংরেজ শাসন ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর ভারতবর্ষে ইউরোপীয় ভাববাদ ভারতীয় শিক্ষিত মননে এক আধুনিকতার বাতাস দেয়।  ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধে এই ভাববাদ অকস্মাৎ একটা বিপ্লবে রূপ পেল। ধীরে ধীরে এই আবহ তৈরী হচ্ছিল খোলা হাওয়ায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কার মনোভাব ও ব্রাহ্ম সমাজের শিক্ষা আন্দোলন এই নতুন হাওয়াকে স্বাগত জানিয়েছিল। ফলে বাঙালীর জীবনেও প্রেম অর্থাৎ রোমান্টিক প্রেম দেখা দিল। এবং এই রোমান্টিক প্রেমের আগমনকে প্রতিষ্ঠিত করলেন ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের একজন তরুণ যুবক। ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘দুর্গেশনন্দিনী’ বাঙালীর জীবনে এক নতুন ঝোড়ো হাওয়া এনে দিলেন।  ‘দেখিয়া সকলে চমকিয়া উঠিল। কি বর্ণনার রীতি, কি ভাষার নবীনতা, সকল বিষয়ে বোধ হইল, যেন বঙ্কিমবাবু দেশের লোকের রুচি ও প্রবৃত্তির স্রোত  পরিবর্তিত করিবার জন্য প্রতিজ্ঞারূঢ় হইয়া লেখনী ধারণ করিয়াছেন।’ (শিবনাথ শাস্ত্রী)। তাঁর প্রতিভার শক্তিতে একটি দিনের মধ্যে বাঙালীর ব্যক্তিগত জীবনে একটা উন্মাদনা  চলে এল। বঙ্কিমের পরবর্তী রচনাতেও প্রেমের সেই নতুন রূপ প্রতিষ্ঠা পেতে লাগল।
প্রকৃত ভালবাসা শ্রদ্ধা ভিন্ন আসতে পারে না। প্রণয়ী বা প্রণয়িনী মাত্রেই অনুভব করে থাকে যে, অন্য পক্ষের মধ্যে নীচতার আভাসমাত্র দেখিলেও প্রেম যেন সঙ্কুচিত হয়ে যায়। ভালবাসার জন্য এমন কি ভালবাসার মাহাত্ব্য বোঝার জন্যও পুরুষের দিক হইতে নারীকে শ্রদ্ধা করবার একান্ত আবশ্যক। এটা ছাড়া প্রেম বা প্রেমের অনুভূতি আসতে পারে না। বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে এই শ্রদ্ধা ছিল এবং তা সাহিত্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিন্তু এতদিন নারীকে কোনভাবে শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয় নাই। দেখা হয়েছে করুণার পাত্রী হিসাবে।
বঙ্কিম যেখানে শেষ করেছেন ঠিক সেখানে  বাঙালীর মননকে আগামীর দিকে নিয়ে যাওয়ার কান্ডারী হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি তার সমগ্র সাহিত্য সাধনায় প্রেমকে যেরূপে চিনেছেন তার প্রকাশ সেক্স্পীয়রের রচনাও  ছাড়িয়ে যাই নাই।
এইভাবে ধাপে ধাপে বাঙালীর জীবনে প্রেম প্রতিষ্ঠা পেল। প্রেমের আদল হইতে কামের যে আঁশটে  গন্ধ ছিল তা স্নিগ্ধ হয়ে প্রেমকে সম্পূর্ণ করল। কিন্তু  এবার  নতুন দৃষ্টি মেলে দেখা যাক প্রেম কিভাবে কতটুকু অর্জনের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে এল বিংশ শতাব্দীর চৌকাঠ।
পরাধীনতার গ্লানি ও  স্বাধীনতার জন্য নিখাদ জাতীয়তাবাদ ও দেশমাতার প্রতি ঋণ শোধের সংকল্প প্রেমের ব্যাপারেও তার প্রভাব দেখল।  স্ত্রী জাতির প্রতি শ্রদ্ধার ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে উঠছিল। কিন্তু পুরুষ তার অধিকার, পরিবার ও সমাজের ওপর ছাড়তে প্রস্তুত নয়। তার রক্তে ঢুকে গেছে  আধিপত্যের অহঙ্কার। নিজের স্ত্রীকে যে প্রেম করা যায় তা পুরুষের ধারণার মধ্যেই ছিল না। পুরুষ তার সাংসারিক দায়বদ্ধতা ও জৈবিক চাহিদার জন্যই বিবাহের আবর্তে নিজেক জড়াত। নিজের স্ত্রীকে প্রেম দেওয়ার জন্য বা প্রেম করার জন্য নয়।  নিজের স্ত্রীর সাথে প্রেম যেন এক স্বৈরীণী মনোভাবের পরিচায়ক। এই সময়ে প্রেম অর্থই পরকীয়া।
শিল্প বিপ্লবের পরবর্তীতে ইউরোপের সমাজ জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন এসে পড়ে। এই পরিবর্তনকে সংযত করতে ইউরোপে শুদ্ধতার চর্চা শুরু হয়। আদর্শ পরিবার, ছবির ফ্রেমে আবদ্ধ সুখী পরিবার গড়ে তোলার আহ্বানে নীতির জয়জয়কার আরম্ভ হয়। সতীসাধ্বী আদর্শবাদী স্ত্রীর গুণকীর্তন গাইতে আরম্ভ করেন পুরুষেরা। পুরুষের প্রস্তাবে কেবল সম্মতি আর অসম্মতি ছাড়া আর কোনও ভূমিকা নেই নারীর। বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েদের লজ্জায় রাঙা হওয়া আর ওষ্ঠে স্মিত হাসি ধরা ছাড়া আর কিছু করার অনুমতি নেই। তবু  এটুকুই নারীর জন্য আগের চেয়ে বেশি সম্মান পাওয়া।
কিন্তু বিংশ শতকের গত কয়েক দশকে নারীজীবনের এমন এক বিপ্লব এসেছে যে ভালবাসার সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে সমাজবিজ্ঞানীদের। মোটামুটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে এই বিপ্লবের সূচনা।   আমেরিকায় নারীর ভোটাধিকার স্বীকৃত হয় ১৯২০ সালে। ইংলন্ডে ১৯২৮ সালে। এই অধিকার অর্জন  আগামী সাম্যের দিকে উজ্জ্বল দিশা নির্দেশ করে।  ইউরোপ -আমেররিকায় চলে আসে জন্মনিরোধক পিল। এই পিলের দরুন মেয়েদের যৌনজড়তার মাত্রা অনেকটা নেমে আসে। যৌনতা ও গর্ভধারণ সম্পর্কে ভীতি কমে যাওয়ায় মেয়েদের মধ্যে আচরণগত পরিবর্তন আসতে থাকে। যৌনভাবে সৎ থাকার প্রবণতা কমে যায় এবং সততার সংজ্ঞা বদলে যেতে থাকে। নারীরা হয়ে ওঠেন অনেক বেশি স্বাধীনচেতা।  মেয়েরা পেয়ে যেতে থাকে  অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ। জীবন তাঁদের কাছে নতুন অর্থে নতুন রূপে ধরা দেয়। তাঁরা দেখতে থাকেনÑ সামাজিক নিয়মগুলি পুরুষদের সুবিধা ও আনন্দের নিমিত্ত। দাসপ্রথার মতো নারীকেও করে রাখা হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ। নারী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে  নারীর কাজ  পাওয়ার ক্ষেত্রে সাম্য, মজুরীর সাম্য ব্যক্তিগত জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতামত;  প্রভৃতি নারীকে পুরুষের  সমকক্ষ করে তোলে।
এইভাবে অধিকার অর্জনের মধ্য দিয়ে নারী প্রেমে এনেছে এক সাম্য, যা প্রেমকে সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একান্ত। কিন্তু পিছিয়ে পড়া এই তৃতীয় বিশ্বের এই সকল দেশে সে অর্জন এখনো অনেক দূর  বাকী। এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ পুরুষ প্রেম ব্যাপারটাই ভালোভাবে বুঝতে শেখেনি।  ফলে ফাঁক থেকে যাচ্ছে সম্পর্কের মধ্যে। সম্পর্ক গড়ে উঠছে  পৌরুষের দাবিতে, তেমন প্রেমের নয়। পুরুষ নারীর শ্রমকে সম্পূর্ণ মূল্য দিতে শেখেনি।
মোটামুটি তিরিশের দশক থেকেই বাঙালীর প্রেম ধীরে ধীরে সাবালকত্ব অর্জন করতে শুরু করেছে, যুবক যুবতীর বন্ধুত্ব ও মেলা-মেশা এখন খুব একটা নিন্দনীয় নয়। প্রেমের ধারণা তখন রোমান্সের গন্ধে সুরভিত। তাতে শরীরী আকাঙ্খার প্রকাশ খুবই সংযত, অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন।  নির্দিষ্ট সময়ে জানলায় এসে দাঁড়ানো, চোখাচোখি, সামান্য ইশারা, গোপন চিঠি। জলের গেলাস, চায়ের কাপ, লাইব্রেরীর বই দেওয়া-নেওয়ার ছলে হাতে হাতে মুহূর্তের ছোঁয়াছুঁয়ি, তাতেই আশরীর শিহরণ। চুরি করে নিভৃত সাক্ষাৎ, সামান্য একটা-দুটো কথা, তারই ফাঁকে ফাঁকে যাবতীয় বিদ্যুতের আদানপ্রদান। গত শতকের প্রাক সত্তর পর্বেও ভালবাসার চিত্ররচনায় বাস্তব ও কল্পনার ভাগাভাগি ছিল সমান-সমান।
এসময়ের  প্রেমে কল্পনার সিঁড়ি ভাঙা নেই বললেই চলে। যা আসে কল্পনায় তাই ঘটিয়ে নেয় নব্য প্রেমিক-প্রেমিকা বাস্তবে। এখন কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রেমের সংঘটন অনেক বেশি। কারণ মেলামেশার সুযোগ।  প্রেমের রীতিমতো ঘনঘটা আছে। প্রেমের কত যে উপকরণ।  পিতামহ বা প্রপিতামহের কালে তো বিয়েই হয়ে যেত বাল্যে। দাম্পত্যের মাধ্যমেই শুরু হত জীবন ফলে দুরুদুরু বুকে প্রিয় বালিকার কাছে প্রেম নিবেদনের অবসরই ছিলো না।  এখন প্রেমের নানা উপকরণ কিশোর-কিশোরীদের প্রেমে উৎসাহিত করছে ।বিবিধ কথা লেখা গ্রিটিংস, গিফ্ট, হৃদয় আকৃতির লকেট, কাচের কৌটোয় প্রেমের স্মারক তাজমহল।  প্রেমের নতুন ভাষা ই-মেল,  এস এম এস, এবং প্রেম উদ্যাপনের জন্য একটা গোটা দিন। ভ্যালেনটাইনস ডে।
তবে এখনো সেই অনুভূতি আছে। বুকে অসম্ভব কাঁপন। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। প্রিয় প্রেমিক প্রথমবারের মতন গালে এঁকে দিয়েছে চুম্বনের দাগ। দূর থেকে একটি বার তাকালেই সারাদিন সে রোমাঞ্চ  বয়ে বেড়ানো। এসব মরে যাবে না। এ প্রেমের এক নিজস্ব মায়া।  এখন বিশ্বায়নের ফলে সভ্যতা হাত ধরাধরি এগোচ্ছে সীমানাহীন ঠিকই। প্রেম করার অবসর কমে যাচ্ছে ঠিকই। প্রেম নতুনতর স্তরে উন্নিত হচ্ছে ঠিকই । কিন্তু প্রেমের যে অন্তর্গত আবেদন, অন্তর্গত আবেশ তা থেকে প্রেমিক-প্রেমিকা বঞ্চিত হবে না কোনদিন। এই বিশ্বাস আমার আছে। সম্পর্কের মধ্যে সহ্য, মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়া ইত্যাদি বিবিধ শব্দ এখন দাঁড়িয়ে আছে একটি টান টান নির্মেদ বোধের ওপর। তার নাম ভালবাসা। প্রেমহীন সম্পর্কের মধ্যেও নতুন করে জন্ম নিচ্ছে ভালবাসা।
ভালবাসা মানুষের জীবনে সেই আশ্চর্যকরণ যা এই জীবন যুক্তিরহিত থেকে আমাদের দ্বারা ঘটিয়ে নেয়। দুঃখ এখানেই সকলেই তেমন প্রেমী নয় যে আটপৌড়ে জীবনের প্রেমকে পৃথক আসনে নিয়ে রাখবে আজীবন। যে প্রেম বয়স মানে না, শাসন মানে না, সম্ভব-অসম্ভব মানে না, তারই জন্য আকুল কাঁদবে একান্ত নিভৃতিতে! কবি হওয়ার মতো প্রেমিক হওয়ার জন্যও থাকে কিছু বিশেষ অন্তর্গঠন। কোন-না-কোন সময় প্রেম প্রত্যেকের জীবনের ধরা দেয় কিন্তু প্রেমকে অস্তিত্বে নিতে পারে ক’জন ? ভবিষ্যতের নতুন দিন হয়তো নতুন কথা বলবে এই আশা রাখি।
ভালবাসা কী তার কোন স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভালবাসার কিছু লক্ষণসমষ্টির কথা বলেছেন। প্রেম আমাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকে। আমাদের বাঁধে না, থামিয়ে দেয় না, প্রেম কাউকে চিরদিন কাঁদায় না, প্রেম ব্যক্তিকে নিজের থেকে বের করে বৃহত্তর জগতের কাছে নিয়ে যায়। প্রেম স্বার্থকে পরার্থ করে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়Ñ ‘‘প্রেম আমাদিগকে ভিতর হইতে বাহিরে লইয়া যায়, আপন হইতে অন্যের দিকে লইয়া যায়, এক হইতে আরেকের দিকে অগ্রসর করিয়া দেয়। এইজন্যই  তাহাকে পথের আলো বলি।….’’
ঋণ : নীরদ চন্দ্র চৌধুরী  মন্দাক্রান্তা সেন  তিলোত্তমা মজুমদার।

----
--