সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: মাইথন বাঁধের দৃশ্য শুধু লোকদেখানো। দিনের পর দিন নোংরা আবর্জনা জমে স্তূপকার অবস্থা হয়ে উঠেছে। দেখার জন্য পুলিশ রয়েছে, তারাও লোকদেখানো। স্পষ্ট বলে দিচ্ছেন, ‘একটু এরকম হবেই’।

পুরুলিয়ার সীমান্ত পেরিয়েই ঝাড়খণ্ড সীমান্ত। এই দুয়ের মাঝে অবস্থিত মাইথন জলাধার। ১৯৫৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরতাপবিদ্যুৎ তৈরির উদ্দেশ্য এই বিশাল জলাধার উদ্বোধন করেন। বরাকর নদীর বিশাল জলরাশি, মাঝে দ্বীপ। অসাধারণ দৃশ্য। তবু দূষণ কমানোর কোনও চেষ্টাই নেই। বড় বড় করে প্লাষ্টিক ব্যাগ থেকে শুরু করে প্লাস্টিক বোতল সমস্ত ব্যবহারে নিষেধ রয়েছে। কিন্তু সেই নিষেধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে বনভোজন। আবর্জনা থরে থরে জমে রয়েছে। পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। ক্যামেরা ব্যবহার করা নিষেধ। কিন্তু প্লাস্টিক ব্যাগ এবং আবর্জনায় কোনও বিধি নিষেধ নেই।

উর্দিধারী এক পুলিশকর্মী হিন্দিতে যা বললেন তা বাংলা করলে হয় “দেখুন আমরা চেষ্টা করি। অনেক সাইন বোর্ড দেওয়া রয়েছে। এটা সীমান্ত অঞ্চল। আমরা নিরাপত্তা দেখব না কি পরিবেশ দেখব।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, “একটু তো এমন হবেই। কি আর করা যাবে।”

পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত বলেন, “কি পশ্চিমবঙ্গ কি ঝাড়খণ্ড সবই একই রকম। সীমান্ত পরিবর্তন হয় কিন্তু আমাদের মনোবৃত্তি পাল্টায় না। প্রশাসনও তথৈবচ। চেষ্টা করলে সবই করা যায়। দায় সারা। করব না। হচ্ছে হবে মনোভাব। ভালো কিছু আশা করাটাই ভুল।”

ধানবাদ থেকে ৪৮ কিমি দূরে অবস্থিত মাইথনকে বলা হয় ‘মা এর বাসভূমি’ বা ‘মা এর থান’। সেই মায়ের বাসস্থান আজ থাকার অযোগ্য। অথচ এটাই ভারতের প্রথম ভূগর্ভস্থ পাওয়ার স্টেশন। যুক্তরাষ্ট্রে টেনেসি ভ্যালি প্রকল্পের থেকে অনুপ্রাণিত এই প্রকল্পটি করা হয়েছিল। বন্যানিয়ন্ত্রণ এবং ৬০হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুত উতপাদনের জন্যে। এটি বরাকর নদীর উপর নির্মিত। এই ধরনের পাওয়ার স্টেশন দক্ষিণ এশিয়ায়তেও প্রথম। জলাধারটি ৬৫ বর্গ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। জলাধার ১৫,৭১২ ফুট (৪,৭৮৯ মিটার) দীর্ঘ ও ১৬৫ ফুট(৫০ মিটার) উঁচু।

১৯৪২ সালের বন্যা দামোদর উপত্যকাকে কলকাতা এবং বাকি দেশের থেকে প্রায় ১০ সপ্তাহ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। এরপরেই তৎকালীন শীঘ্রই ব্রিটিশ সরকার টেনেসি ভ্যালি অথরিটি (TVA)র একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়রকে ভারতে নিয়ে আসে। সাহেব ইঞ্জিনিয়র ভুর্ড ১৯৪৫ সালে বাঁধের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করেন। অবশেষে স্বাধীন ভারতে প্রথম বাঁধ( তিলাইয়া বাঁধ) শুরু হয় ১৯৫৩ সালের ৭ জুলাই। শীঘ্রই তিলাইয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কোনার, মাইথন এবং পাঞ্চেত বাঁধ। যাদের কাজ শুরু হয় যথাক্রমে ১৯৫৫, ১৯৫৭ ও ১৯৫৯ সালে।

বাঁধ, খাল ও ব্যারেজের মাধ্যমে জল সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা করে , ডিভিসি সেচকে সুগম করেছে এবঙ্গি সেইসাথে অববাহিকা অঞ্চলে শিল্প এবঙ্গ গার্হস্থ্য জল সরবরাহ করেছে, যাতে এই বিশাল অঞ্চল ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। ডিভিসি ১৯৫৩ সাল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ করে আসছে; গ্রাহকদের প্রত্যাশা তো পূরণ করেইছে, সময়ের সাথে সাথে নিজেদের কর্মদক্ষতাকে ও অনেক বাড়িয়েছে।

সম্প্রতি ডিভিসি টাটা পাওয়ারের সঙ্গে একজোটে একটি তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পও শুরু করেছে। যার নাম মাইথন পাওয়ার লিমিটেড (এমপিএল)। এর আগে ডিভিসি কয়েকটি গ্যাস টারবাইন বসিয়েছিল বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য। এটিও ছিল একটি অনন্য প্রযুক্তি, কিন্তু এখন আর তারা কার্যকরী নেই। ডিভিসি হাজার হাজার পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এবং এখনও করে চলেছে।