দমকলে খবর দেয় মকসুদ, শৌভিককে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন আমিরুল

বিজয় রায়, বসিরহাট: ফেসবুকের একটা পোস্ট৷ তারপরেই বদলে গিয়েছে গোটা এলাকার পরিস্থিতি৷ যে গ্রামে কখনও সামান্য থেকে সামান্যতম হিংসার ঘটনা ঘটেনি সেখানেই এখন এক গোষ্ঠী অপরকে বিশ্বাস করতে ভয় পাচ্ছে৷গ্রামের নাম মাগুরখোলা৷ এই গ্রামেই থাকে একাদশ শ্রেণির ছাত্র শৌভিক সরকার ৷মা মরা ওই ছেলের ফেসবুক পোস্ট নিয়েই এখন উত্তাল গোটা উত্তর ২৪ পরগণা৷ যদিও মোটের উপর গ্রাম এখন ঠাণ্ডা৷ তবে এখনও অগ্নিগর্ভ বাদুড়িয়া, দেগঙ্গা থেকে শুরু করে স্বরূপনগর৷ ঘটনার দিন পাড়ার মুসলমান ‘চাচারা’ই বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন শৌভিককে৷

বাদুড়িয়ার পরিস্থিতি সামাল দিতে নামল আধাসামরিক বাহিনী

হাড়হিম করা সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ল আমিরুল ইসলামের৷ আমিরুল মাগুরখোলা মিলন মসজিদ কমিটির সভাপতি৷ তিনি বলেন, ‘‘প্রথমে কি হয়েছে ঠিক জানতাম না৷ হঠাৎ ভাইপোর কাছে খবর পাই বাবলু সরকারের(শৌভিকের কাকা) বাড়িতে দু-তিনশো জন জড় হয়েছে৷ গিয়ে দেখি উন্মত্ত ওই যুবকদের ৷ওরা বাবলুর ভাইপোকে খুঁজছিল৷ তাদের মধ্যে কয়েকজন ইতিমধ্যে বাড়িতে আগুনও লাগিয়ে দেয়৷’’ নিজের পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও ওদের থামানো যায়নি বলেও জানান আমিরুল৷ এরপর গ্রামের বাকি লোকজনদের খবর দেওয়া হয়৷ গ্রামের ছেলে মকসুদ দমকলে খবর দেয়৷ সে নিজেও দমকলে কাজ করে৷ তাই সমস্যা হয়নি৷ পরে গোবরডাঙা থেকে দমকল এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়৷ এদিকে গ্রামের হিন্দু-মুসলমানরা জোট বাঁধতেই পালিয়ে যায় বহিরাগতরা৷

রফিকুল ইসলাম নামে এক বৃদ্ধ বলেন, এই গ্রামে এর আগে কখনও এরম হয়নি৷ এখানে দুর্গাপুজো হয়৷ রমজানও পালন হয়৷ মাঠে সবাই একসঙ্গে খেলে৷ কাজ করে৷ বাইরের কিছু লোক এসে যত ঝামেলা করে গিয়েছে৷ মাগুরখোলাতেই থাকেন বসিরহাটের একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক তপন হালদার৷ তাঁর কথায়, ছেলেটি মোটের উপর শান্ত বলেই জানা৷কী এমন করল যে এমন পরিস্থিতি হবে! একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘‘ঘটনার দিন গ্রামের মুসলমানরাই বাঁচিয়েছিল শৌভিকদের পরিবারকে৷ওরা না থাকলে গোটা পরিবার সেদিনই শেষ হয়ে যেত৷’’

- Advertisement -

গ্রামে মুদির দোকান চালান সনাতন সরকার৷ তিনি বলেন এই গ্রামে কখনও ঝামেলা হয়েছে বলে তাঁর জানা নেই৷ একবার নির্বাচনের সময় গণ্ডগোল হয়েছিল৷ তবে সেটা গ্রামের লোকেদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি৷ এছাড়া অন্যকোনও হিংসা কখনওই নয়৷ একই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, তখনের মতো ঝামেলা মিটে গেল৷ কিন্তু পরে দেগঙ্গা থেকে খবর পাই ওখানে কিছু লোক গোলমাল পাকিয়েছে৷ পরে আরও খবর আসে স্বরূপনগর থেকেও৷ যে গ্রামের যুবক এই ঘটনা ঘটাল সেই গ্রাম ঠাণ্ডা৷ অথচ বাইরে আগুন জ্বলছে৷ এই ঘটনার পেছনে যে সমাজ বিরোধীরা রয়েছে বলে ক্ষোভ উগরে দিলেন ষাট পার করা সনাতনবাবু৷

বাদুড়িয়ার কলম আটকে ‘জাত’ দেখালেন শ্রীজাত

গ্রামে যে মসজিদ রয়েছে সেখান থেকে একটু হাঁটলেই শৌভিকের বাড়ি৷ শৌভিকের প্রতিবেশী সুপ্রকাশ হালদার ৷ তাঁর বাড়িতেই মাঝে মধ্যে কীর্তনের আসর বসে৷ তিনি বলেন, ‘‘মসজিদের আজান হয়৷ সন্ধ্যায় কীর্তন হয় আমার বাড়িতে৷ আমাদের গ্রামে ঝামেলা নেই৷ যা ছিল মিটে গিয়েছে৷বাইরে কেন এমন হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না৷’’

সত্যি বোঝা যাচ্ছে না৷ যে গ্রামের ছেলেকে নিয়ে এত কাণ্ড৷ সেই গ্রামে সম্প্রীতি এখনও স্পষ্ট৷ অথচ মাগুরখোলা ছাড়িয়ে হিংসা ছড়িয়ে গেল দেগঙ্গা, বসিরহাট, স্বরুপনগর৷ এই চক্রান্তের পেছনে কে ? প্রশ্নটা ছুড়ে দিল শৌভিকের গ্রাম খোদ মাগুরখোলা৷

Advertisement ---
-----