দেবযানী সরকার, কলকাতা: পঞ্চায়েত ভোট ঘোষণা হতে এখনও দেরি আছে৷ কিন্তু ঘর গোছাতে ইতিমধ্যেই বাংলা জুড়ে চক্কর কাটতে শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ জেলায় জেলায় প্রশাসনিক বৈঠক করছেন৷ উন্নয়নে গতি আনতে একদিকে যেমন প্রশাসনিক বৈঠকের মাধ্যমে আমলাদের চাপে রাখছেন তেমনই দলীয় কোন্দলে রাশ টানতে আমলাদের সামনেই ধমক দিচ্ছেন দলের জন প্রতিনিধিদের৷

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মমতা চাইছেন অগস্টে ভোট করাতে৷ বোলপুরের প্রশাসনিক বৈঠক থেকে সেই সম্ভবনাও বুধবার প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি৷ তৃণমূল নেতাদের একাংশ মনে করছেন, এতে আখেরে লাভ দলের৷ কিন্তু যদি ভোট এগিয়ে যায়? নাম প্রকাশ করব না, এই শর্তে দলের এক নেতার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‘তাতে সমস্যা বাড়বে বই কমবে না৷’’

‘কোথায়’ সমস্যা, তা খোলসা করে ওই নেতা বলছেন, ‘‘অগস্ট মানে হাতে প্রায় ৫ মাস সময় পাওয়া যাবে৷ সেক্ষেত্রে রাজ্যজুড়ে আরও বেশি করে উন্নয়ন করা সম্ভব হবে৷ উন্নয়নের অস্ত্রেই আমরা বিরোধীদের অপপ্রচার রুখে দিতে পারব৷ একই সঙ্গে পঞ্চায়েতের প্রার্থীপদ নিয়ে দলের অন্দরে আদি বনাম নব্য তৃণমূলীদের কোন্দলেও অনেকখানি রাশ টানা যাবে৷ কিন্তু কমিশন যদি এপ্রিল বা মে’তে ভোট করে সেক্ষেত্রে আমাদের এই প্রক্রিয়া অনেকটাই ধাক্কা খাবে৷’’

যদিও প্রকাশ্যে দুঁদে রাজনীতিক, পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘নির্বাচন যখনই হোক তাতে আমাদের কোনও অসুবিধে নেই৷ আমরা সব সময়ই প্রস্তুত রয়েছি৷ কারণ, গত ৭ বছরে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের যা উন্নয়ন করেছেব, তাতে রাজ্যের মানুষ আমাদের সঙ্গেই আছেন৷ বিরোধীরা যতই ষড়যন্ত্র করুক উন্নয়নের ধারা অক্ষুন্ন রাখতে মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরেই ভরসা রাখবেন- এটা নিশ্চিত৷’’

গত বছরে দুর্গাপুজোর পঞ্চমীর দিন দলত্যাগ করেন তৃণমূলের ‘সেকেন্ড ইন কম্যান্ড’ মুকুল রায়৷ জার্সি বদলে গায়ে চড়ান গেরুয়া নামাবলী৷ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিমধ্যেই ৭ বছরের সরকারের বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া বইছে৷ সেই হাওয়ার পালে বাড়তি রসদ জুগিয়েছে মুকুল রায়ের গেরুয়া শিবিরে যোগদান৷ যার ফলে সদ্য শেষ হওয়া উলুবেড়িয়া উপ-নির্বাচনে এক লাফে বিজেপির ভোট পৌঁছে গিয়েছে প্রায় ৩ লাখে৷ ওই মহলের অভিমত, ডানপন্থী দলে একাধিক গোষ্ঠী থাকবে, কোন্দল থাকবে- এটাই স্বাভাবিক৷ তৃণমূলও এর ব্যতিক্রম নয়৷ জেলায় জেলায় ক্ষমতার দখল নিয়ে আদি বনাম নব্য তৃণমূলীদের কোন্দল অজানা নয় দিদিমণিরও৷

ওই মহলের মতে, স্বভাবতই ফের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের কর্তৃত্ব অটুট রাখতে উন্নয়নকেই হাতিয়ার করতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ ইতিমধ্যে দুই বঙ্গের একাধিক জেলায় প্রশাসনিক বৈঠক করে ফেলেছেন তিনি৷ ‘ওপেন মিটিং’ এর দৌলতে রাজ্যবাসী সাক্ষী থেকেছে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের প্রতিটি জেলার বৈঠকের৷ যেখানে ডিএম, এসপি থেকে থানার আইসি কিংবা ব্লকের বিডিও-দের দাঁড় করিয়ে উন্নয়নের প্রশ্নে একের পর এক কৈফিয়ৎ চেয়েছেন তিনি৷ মুখ্যমন্ত্রীর মুখে শোনা গিয়েছে, ‘‘বাংলার মানুষের উন্নয়নের প্রশ্নে আমি কাউকে রেয়াত করব না, সে যত বড় আধিকারিকই হন৷’’ বলেছেন, ‘‘কাজ না করলে পদ ছাড়তে হবে৷’’

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এহেন ‘ওপেন মিটিং’য়ের কৌশলের জেরে কোথাও উন্নয়ন না হয়ে থাকলে মুখ্যমন্ত্রী নয়, মানুষের রাগ গিয়ে পড়বে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনের ওপর৷ এহেন ‘ওপেন মিটিং’য়ের দৌলতে ইতিমধ্যেই বাংলার মাটিতে কান পাতলে মানুষের মুখে শোনা যাচ্ছে, ‘‘মমতা কিন্তু সত্যি উন্নয়ন করতে চাই৷ প্রশাসন আর দলের নিচুতলার একাংশ নেতাগুলোরই বদমাশ!’’ ফলে আদতে তৃণমূলের প্রতি মানুষের ক্ষোভ থাকলেও ভোটটা নিজের ঝুলিতে ঢোকানোর কৌশলী পথকে ক্রমেই প্রশস্ত করছেন পোড় খাওয়া রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারতে প্রশাসনিক বৈঠক থেকেই জেলায় জেলায় জনপ্রতিনিধিদের দাঁড় করিয়ে রীতিমতো স্কুলের দিদিমণির ঢঙে শাসন করছেন, ‘‘নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বন্ধ করো৷ উন্নয়নে মন দাও৷’’ ফলে কিছুটা হলেও চাপে পড়ে জেলায় জেলায় নেতারা গোষ্ঠী কোন্দলে রাশ টানতে বাধ্য হচ্ছেন৷ দলের রাজ্যস্তরের এক নেতার কথায়, ‘‘কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়ার কাহিনি দিদিমণির অজানা নয়৷ একদিকে গোষ্ঠী কোন্দল অন্যদিকে ‘বেইমান’ মুকুল রায়ের দৌলতে পঞ্চায়েতে যাতে অন্তর্ঘাত না হয়, তাই সময় থাকতেই জেলায় জেলায় ঘাম ঝরাচ্ছেন দলনেত্রী৷’’

তৃণমূল সূত্রের খবর: অগস্টে ভোট হলে উন্নয়নের বিনিময়ে বিরোধীদের ধরাশায়ী করা অনেক সহজ হবে৷ কারণ, ততদিনে দিদিমণির কড়া নজরদারির জেরে গোষ্ঠী কোন্দলেও অনেকখানি রাশ টানা সম্ভব হবে৷ কিন্তু যদি ভোট এগিয়ে আসে, তাহলে কি হবে- এটাই ভাবিয়ে তুলছে শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বকে৷ তাঁদের মতে, উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ আরও কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পঞ্চায়েত নির্বাচন অগস্টে নিয়ে যেতে চাইছেন৷ এই মুহূর্তে প্রত্যেক জেলায় জোর কদমে উন্নয়নের কর্মসূচি চলছে৷ মে মাসে ভোট হলে মার্চের শেষ থেকে সে সব কাজে ভাটা পড়বে৷ এর পর আবার বর্ষা নামলে কাজই বন্ধ থাকবে৷ কিন্ত্ত অগস্টে ভোট হলে জুন পর্যন্ত উন্নয়ন করে যাওয়ার সুযোগ আছে৷

উত্তর দিনাজপুরের তৃণমূলের জেলা সভাপতি অমল আচার্য্য কিংবা পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা সভাপতি অজিত মাইতি-রা অবশ্য বলছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা ৩৬৫দিনই উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে সামিল থাকি৷ তবে ৩১ মার্চ অর্থিক বছরের শেষ৷ সেই কারণে অনেক টেন্ডার আটকে আছে৷ ফলে অনেক কাজও আটকে আছে৷ এপ্রিলে টেন্ডার হয়ে গেলে থমকে থাকা কাজগুলো শুরু হয়ে যাবে৷’’

রাজৈনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন- প্রকাশ্যে তৃণমূল নেতারা উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে ‘মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন’ বলে দাবি করলেও কপ্টারে করে একই দিনে ২-৩ টা জেলায় মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠক থেকেই স্পষ্ট মুকুলহীন তৃণমূল কতখানি চাপের মধ্যে রয়েছে৷

----
--