মোদীর বাজেটে সবচেয়ে বেশি লাভ কি দিদির?

সৌমিক কর্মকার: কেন্দ্রীয় সরকার দিশাহীন বাজেট পেশ করেছে৷ বৃহস্পতিবার লোকসভায় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষের বাজেট পেশ করার পর এই প্রতিক্রিয়াই দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ আর এই বাজেট দেখে যে তিনি হতাশ, সেকথাও গোপন করেননি তিনি৷ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নবান্ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সামনে সেই হতাশার কথা জানিয়ে মোদীর সরকারকে তোপ দেগেছিলেন এ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান৷

অর্থনীতিবিদদের একটা অংশ অবশ্য মমতার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত৷ এই বাজেটে মধ্যবিত্ত থেকে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী কারও জন্যই স্বস্তিদায়ক নয় বলেই তাঁরা মত প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মহলে৷ যদিও অর্থনীতিবিদদের অন্য একটি অংশ এই বাজেটকে আবার ব্যাখ্যা করেছেন গ্রামীণ ভারতের বাজেট হিসেবে৷ অর্থনীতিবিদ তথা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা আশিস সরকারের ব্যাখ্যা, বিজেপি চায় জনগণের ভালো হোক, তাঁরা সুস্থ হোক৷ তাঁদের আর্থিক উন্নতি হোক৷ তাই গ্রামীণ ভারতের কথা মাথায় রেখেই এই বাজেট করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন৷

আর এই বাজেট গ্রামের মানুষের জন্য হলে, এটা লেখাই বাহুল্য যে, বাজেটে অনেক প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত করতে হবে গ্রাম পঞ্চায়েতের মাধ্যমে৷ আর সেক্ষেত্রে মোদী সরকারের এই বাজেট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এক নতুন দিশারী হয়ে উঠতে পারে৷

- Advertisement -

স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন উঠছে যে, কীভাবে এই বাজেট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজে লাগবে? রাজ্য রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মহলের মত, ২০১১ সালের পর থেকে গ্রাম-বাংলার উন্নতিতে জোর দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে৷ রাস্তার নির্মাণ-সংস্কার থেকে শুরু করে গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন, সবকিছুই গুরুত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ যার সুফল তিনি প্রতিটি নির্বাচনেই পাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস৷

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, অধিকাংশ কাজই হচ্ছে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকায়৷ প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার টাকায় যে যেমন রাস্তা সংস্কার হচ্ছে, তেমনই স্বচ্ছভারত মিশনের অর্থে গ্রামে গ্রামে তৈরি হচ্ছে শৌচালয়৷ এছাড়া আরও অনেক প্রকল্প আছে৷ যদিও এই প্রকল্পগুলির সবক’টিতেই রাজ্যের নিজস্ব নামও রয়েছে৷ কোনও প্রকল্প নির্মল ভারত, তো আবার কোনও প্রকল্পের নাম বাংলা আবাস যোজনা নামে পরিচিত হচ্ছে৷ রাজ্যের তরফে সেইভাবে প্রচারও করা হচ্ছে৷ শাসক দল তৃণমূলও এই প্রচারকে কাজে লাগিয়ে ওই কাজের পুরো ক্রেডিট নিচ্ছে৷

তাছাড়া সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী উন্নয়নের অধিকাংশটাই রাজ্যের সঙ্গে জড়িত৷ সরাসরি কেন্দ্রের পক্ষে কাজ করা কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া বাকিগুলিতে রাজ্যকে এড়িয়ে কাজ করা অসম্ভব৷ টাকা খরচ করতে হয় রাজ্যের মাধ্যমে৷ তাই ভোটের ময়দানে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা বিজেপি নয়, তৃণমূলই পেয়ে যাচ্ছে৷ তাই আগামিদিনে আরও সুফল পাবে রাজ্য সরকার৷

প্রসঙ্গত, এবারের বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকার কৃষির উন্নতিতে অনেক বেশি জোর দিয়েছে৷ ন্যায্যমূল্যে ফসল কেনা, ন্যায্যমূল্য বাড়ানোর পরিকল্পনা, ২২ হাজার গ্রামীণ হাটকে কৃষকবাজারে রূপান্তরিত করা, কৃষি-বিপণন পরিকাঠামো তহবিলের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রেখেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী৷ পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে একই কথা উল্লেখ করেছেন৷ পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যে ন্যায্যমূল্যে ধান কেনা হয়, কৃষিমান্ডিও রয়েছে অনেক জায়গায়৷ কেন্দ্রীয় অর্থ এলে সেই কাজ আরও গতি পাবে৷ ফলে লাভ তৃণমূলেরই৷

তাছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করতে কাজে আসতে পারে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে উৎসাহ দিতে কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী কৃষি সম্পদ যোজনার আরও কিছু প্রকল্প৷ সেই তালিকায় রয়েছে ন্যাশনাল বাম্বু মিশন, গোবর-ধন যোজনাও৷ নতুন প্রকল্পগুলি সঠিক রূপায়ণ করতে পারলে, গ্রাম-বাংলায় ২০১৮ কেন, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটেও তৃণমূলের জয় আটকানো সম্ভব নয় বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের৷ তাঁদের ধারণা, এই কাজের দৌলতে লোকসভা-বিধানসভায় ভাল ফলের ধারাও বজায় থাকবে৷

বিজেপি যদিও রাজৈনতিক পর্যবেক্ষকদের এই অংশের মতের সঙ্গে একেবারেই সহমত নয়৷ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পগুলি অন্য নামে চালালেও তা দিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানো সম্ভব নয় বলেই মনে করেন দলের একাধিক নেতা৷ অর্থনীতিবিদ তথা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা আশিস সরকার যেমন স্পষ্ট বললেন, ‘‘বাজেট নিয়ে আমরা রাজনীতি চাই না৷ ভাঁওতা দিয়ে, মিথ্যে দিয়ে, রাজনীতি চলে না৷ কিছুদিন হয়তো সত্যকে ঢাকা যায়৷ কিন্তু এটা সফল হবে না৷’’ তাই কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির ক্রেডিট নিচ্ছে, আর কে নিচ্ছে না, তা নিয়ে বিজেপি একেবারেই ভাবছে না৷ বরং সাধারণ মানুষের আর্থিক তথা সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো হলে, তাঁদেরই লাভ হবে বলেই মনে করেন আশিসবাবু৷ কারণ, তাঁর কথায়, ‘‘গ্রামবাংলার মানুষ সবই জানেন৷

Advertisement ---
-----