সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়ঃ  ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের পরে কেটে গিয়েছে সিকি শতাব্দি৷ তারপর থেকে প্রতি বছর এই দিনটিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন করা হয়৷ সেই মতো এবারেও সাজ সাজ রব রাজ্যজুড়ে শহিদ দিবসের প্রস্তুতিতে৷ ইতিমধ্যেই নানা কানাঘুসো শোনা যাচ্ছে এবারের ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে নতুন চমক নাকি হতে পরে সিপিএম, বিজেপির ঘর ভাঙা৷ সেদিন নাকি মঞ্চে তৃণমূলের পতাকা তুলে দেওয়া হবে চন্দন মিত্র, মইনুল হাসান এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের হাতে৷

বিজেপি বা সিপিএম ছেড়ে বর্তমান রাজ্যে ক্ষমতাশীল তৃণমূলের ছত্রছায়ায় আসার প্রবণতা নতুন কিছু নয়৷ ফলে এই নেতাদের ২১জুলাই মঞ্চে নিয়ে আসা হলেও তেমন কিছু নয় ৷ তার চেয়েও এখনও বিস্ময়কর ঘটনা হল- শিবির বদল করে প্রাক্তন আমলা মণীশ গুপ্তের তৃণমূলে আসা৷ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর আস্থাভাজন এই আমলার তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদানের ঘটনা হল ২১জুলাইয়ের জন্য আজও সেরা চমক৷ যদি একেবারে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা বিমান বসু যোগদান করেন, তবেই মণীশের রেকর্ড ভাঙা যাবে৷

Advertisement

এল কে আদবানি, অটল বিহারী বাজপেয়ী ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সাংবাদিক তথা দুবারের রাজ্যসভার সাংসদ চন্দন মিত্র ইতিমধ্যেই বিজেপি ছেড়েছেন বলে খবর৷ তবে মুকুল রায়কে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আনার ক্ষেত্রে দিল্লির এই সাংবাদিকের ভূমিকা ছিল বলেই শোনা যায়৷ এ রাজ্যে চন্দন ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে হুগলী কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী রত্না দে নাগের বিরুদ্ধে লড়ে হেরেছিলেন৷ কিন্তু নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের আমলে তিনি এখন কিছুটা কোণঠাসা৷

অন্যদিকে সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর এখন রাজ্য সরকারের আদিবাসী উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন ঋতব্রত ৷ সুবক্তা, প্রাক্তন সাংসদ এই ছাত্র নেতা কিছুদিন আগে এক মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক ঘিরে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে ৷ ইতিমধ্যেই সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন৷ ফলে এই অবস্থায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় ২১ শের মঞ্চেই থেকে হবে কিনা তা নিয়ে জল্পনা চলছে ৷

এদিকে সিপিএমের আর এক প্রাক্তন সাংসদ মইনুল হাসান কিছুদিন আগে দল ছেড়েছেন এবং বার্তা দিয়েছেন বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলের ব্যাপারে অন্যভাবে পার্টির ভাবা উচিত৷ ফলে তিনিও তৃণমূলের খাতায় নাম তুলবেন এ নিয়ে চর্চাও স্বাভাবিক৷

প্রতি বছর এই দিনটি পালন হচ্ছে ঠিকই তবে এখনও অস্পষ্ট সেদিনের গুলি চালনায় প্রকৃত দোষী কারা৷ রাজ্যে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ক্ষমতায় আসার পর তিনি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ২১ জুলাইয়ের ঘটনার তদন্তে বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করেছিলেন৷ বছর তিনেক ধরে তদন্ত চালিয়ে ৫৯ জনের সাক্ষ্য নিয়ে সেদিনের হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা পড়লেও পুরোপুরি উত্তর মেলেনি ঠিক কার নির্দেশে গুলি চলেছিল৷ ফলে প্রকৃত দোষীদের সাজা দেওয়ার তেমন কোনও প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত মেলেনি৷

অবশ্য সেটা হবেই বা কী করে এখন তো দিদিমনিকে সবার সঙ্গে রং মেলাতে হয়, তাই সিপিএমের হার্মাদরা সবুজ জামা গায়ে দিলে তারাও ‘ওয়েলকাম’ ৷

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে নেমেছিলেন যুব কংগ্রেস কর্মীরা৷ আর তখন তাদের উপরে গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। সেই ঘটনায় মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে অভিযোগ। তারপর থেকে প্রতিবছর সেই হত্যাকাণ্ডের দিনটি শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে থাকেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর কয়েক বছর পর মমতা কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলেও তাঁর দলই এই শহিদ দিবস মূলত পালন করে থাকেন৷ অনেক সময় রাজ্য কংগ্রেসের নেতারা ২১ জুলাইকে তাদেরও শহিদ দিবস বলে দাবি করে তা পালন করার কথা বললেও তাতে তেমন সাড়া মেলে না৷

তাই যে যাই বলুক ২১ জুলাই পালনের একচ্ছত্র অধিকার যে মমতার তা নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকার কারণ নেই৷ যেহেতু সেদিনের মহাকরণ অভিযানের নেতৃত্ব তিনিই দিয়েছিলেন৷ কিন্তু তাঁর উদ্যোগে গড়া তদন্ত কমিশন রিপোর্টে কী বলতে চাইল তা তো বুঝতেই পারল না মানুষ ৷

কমিশনের রিপোর্টে গুলিচালনাকে ‘অবৈধ, অনৈতিক, অসাংবিধানিক’ বলা হয়েছে । তবে কে ওই ‘অবৈধ, অনৈতিক, অসাংবিধানিক’ কাজের জন্য দায়ী, তা নিয়ে নির্দিষ্ট করে কোনও কিছুই বলা হয়নি। তবে কমিশনের মতে, তৎকালীন মহাকরণ ও লালবাজারের কর্তারা ঘটনার দায় অস্বীকার করতে পারেন না। ফলে সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তের ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে প্রশ্ন উঠেই যাচ্ছে ৷ কারণ এই আমলাটি বাম জমানায় জ্যোতি বসু-বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্নেহধন্য হওয়ায় পরে রাজ্যের মুখ্যসচিবও হয়েছিলেন৷ তবে এই মণীশবাবুই আবার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্য হয়ে উঠেছেন৷ স্বাভাবিক ভাবেই হতাশ হয়ে কোনও কোনও মহলের কটাক্ষ – আগেকার সরকার মানুষ খুন করেছিল আর এই সরকার সেই খুনীদের পুরস্কৃত করছে৷

এ রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বার বারই মমতা দেখাচ্ছেন মণীশের প্রতি৷ আগের পর্যায় মন্ত্রী থাকার পর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের প্রাক্তন এই আমলাটি তৃণমূলের টিকিটে ভোটে দাঁড়ালেও হেরেছেন৷ ২০১৬ বিধানসভা ভোটে যেখানে বিরোধীরা গো-হারান হারছেন সেখানেই নিজে হেরে ব্যতিক্রমী নজির গড়েছেন এই মণীশবাবুটি৷ চরম দাম্ভিক এই প্রাক্তন আমলাকে যে তাঁর বিধানসভা এলাকার প্রকৃত তৃণমূল সমর্থকরা পছন্দ করেন না ওই ভোটের ফলাফল বুঝিয়ে দিয়েছে ৷

তবুও এই মণীশ গুপ্তকেই মুখ্যমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎ ও অপ্রচলিত বিদ্যুৎ দপ্তরের উপদেষ্টা করা হয়। তাছাড়া পরবর্তীকালে তাকে রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছে। অর্থাৎ হেরেও তিনি পুরস্কৃত৷ যা দেখে একটা প্রশ্ন উঠছে- এ ভাবে মণীশদের মতো লোকেরা পুরস্কৃত হলে ২১ জুলাইয়ের শহিদরা শান্তি পাবে তো?

----
--