পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে ‘দেশপ্রেমে’র সংজ্ঞাটা ঠিক কী?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, তারা কেন্দ্রের নির্দেশ মেনে স্বাধীনতা দিবস পালন করবে না৷ করবে নিজেদের মতো করে৷ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যে যে প্রণালীতে স্কুলগুলিতে ১৫ আগস্ট পালন করতে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার সঙ্গে একমত নয়৷ অতএব, এ রাজ্যে স্বাধীনতা দিবস পালিত হবে আপন মতে৷

কেন্দ্র কী বলেছে? কেন্দ্র বলেছে, এ বছরের স্বাধীনতা দিবসে প্রতিটি স্কুলে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শপথ নিতে হবে : আমরা ভারতের অখণ্ডতা বজায় রাখব, সাম্প্রদায়িকতা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একযোগে লড়ব৷ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এতে ঘোরতর আপত্তি৷ এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, জোর করে দেশপ্রেম সঞ্চারিত করা যায় না৷ কথাটা যে তিনি খুব ভুল বলেছেন তা নয়৷

আরও পড়ুন: পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে পতাকা উত্তোলন করতে যাচ্ছে চিনের প্রতিনিধিরা

- Advertisement -

তবে, জোর করে দেশপ্রেম সঞ্চারিত না করা গেলেও দেশদ্রোহিতার বাড়বাড়ন্ত তো ঠেকানো যায়৷ স্কুলস্তর থেকেই তা শুরু করা যাবে না কেন? কেন্দ্রের পক্ষ থেকে তো বলা হয়নি যে, স্কুলে স্কুলে ভারতীয় জনতা পার্টি কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নামগান করতে হবে৷ দেশের জন্য শপথ নিতে বলা হয়েছে৷ তাতে এত গোঁসা দেখানোর কী আছে? না কি, আমাদের পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্য সব রাজ্যের থেকে আলাদা, এটা গায়ের জোরে প্রমাণ করতেই হবে! এ তো এক ধরনের ফ্রয়েডীয় মনোবৈকল্য!

একটা সময় ছিল, যখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েও জ্যোতি বসু স্বাধীনতা দিবসে পতাকা উত্তোলন করতেন না৷ অনেক সময়েই দেখা যেত, যখন স্বাধীনতা দিবস এসেছে জ্যোতিবাবু তখন বিলেতে৷ কিন্তু তা না হলেও তিনি স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যেতেন না৷ নমো নমো করে সেই অনুষ্ঠান সারত পুলিশ-প্রশাসন৷ জ্যোতিবাবুর উন্নাসিকতার একটা মানে তাও বোঝা যায়৷ ১৯৪৬ সালে মনুমেন্টের নীচে মুসলিম লিগের যে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র সমাবেশ হয়েছিল, সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির তরফ থেকে জ্যোতি বসুই উপস্থিত ছিলেন৷

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা দিবস ঘিরে মুখোমুখি সংঘাতে কেন্দ্র-রাজ্য

হয়তো লং লিভ দ্য কিং অথবা কুইনের সুরে ব্যান্ড বাজলে তিনি উঠে দাঁড়াতেন, কিন্তু ‘জনগণমন’ কিংবা ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথা ছিল না৷ কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রায় সেই জ্যোতিবাবুর পথেই হাঁটছে কেন? কেন্দ্র যে বিধিতে এবার স্বাধীনতা দিবস পালন করতে বলেছে তাতে কোনও ধরনের ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক উগ্রতার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না৷ তা সত্ত্বেও এ রাজ্যের সরকার সেই বিধি অগ্রাহ্য করার জন্য জেদ ধরেছে কেন?

ভারতের সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রীয় বটে, কিন্তু সংবিধান অনুসারে সেই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কিছু পার্থক্য আছে৷ কারণ, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এদেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী গঠিত হয়েছে, আমেরিকার পরিবেশ অনুসারে নয়৷ তাও সেই আমেরিকাতেও সেদেশের স্বাধীনতা দিবস পালন নিয়ে এক-একটি প্রদেশ এক এক রকম রীতি অনুসরণ বলে শোনা যায় না৷

আরও পড়ুন: বাধীনতা দিবসে ট্যাবলোর হাত ধরে বিশ্বকাপের বোধন

আর সেখানে, এই ভারতে কেন একটি রাজ্য স্রেফ কেন্দ্রের সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতে মেলে না বলে স্বাধীনতা দিবস পালনে উলটো পথে হাঁটবে, বোধগম্য হচ্ছে না৷ তাহলে এ রাজ্যে ১৫ আগস্ট এবার কোন মতে পালিত হবে? চীনা মতে, পাকিস্তানি মতে, না কি বাংলাদেশি মতে? বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা শুধু হাস্যকর নয়, ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্তিকরও বটে৷

এসব দেখে এই দেশ তথা এ রাজ্যের নতুন প্রজন্ম কী শিখবে? এমনিতেই এখন এই স্মার্টফোনের যুগে তারা যেমন অনেক ভালো কিছু শিখছে, তেমনই অনেক বিষাক্ত বিভেদের পন্থাও তাদের গ্রাস করতে বদ্ধপরিকর৷ এই অবস্থায় ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে যদি নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকেই আওয়াজ তোলা হয় : দিল্লি থেকে যা বলা হবে তা-ই অমান্য করো, তাহলে এই প্রজন্মের কাছে কোন বার্তা পৌঁছাবে? অন্তত কোনও ভালো বার্তা যে পৌঁছাবে না, সেটা নির্দ্বিধায় বলা যায়৷

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা দিবসের আগে কড়া নিরাপত্তার মোড়কে কলকাতা

সম্প্রতি পাহাড়ে অশান্তি নিয়ে এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাওবাদীদের দায়ী করেছেন৷ ভাঙড়ের অশান্তির পাকানো নিয়েও তাঁর প্রশাসন মাওবাদীদের চিহ্নিত করেছে৷ কিন্তু খেদের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এ রাজ্যে বিভিন্ন টাইপের মাওবাদীরা যদি তোল্লাই পেয়ে থাকে তো সেটা তারা পেয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর আশকারাতেই৷ এমনিতে ছোটবেলা থেকে শুনতে শুনতে কান পচে গিয়েছে যে, এদেশের কিসসু হবে না৷

ব্রিটিশ আমল এর চাইতে অনেক ভালো ছিল৷ এই স্বাধীনতার কোনও মানে হয় না৷ আমার ওমুক আমেরিকায় থাকে, তমুক দুবাইতে গিয়েছে, ওখানে ক্ষীরের সমুদ্র আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি৷ তার পর শুনতে লাগলাম, দেখ আমাদের স্বাধীনতার পরে মাও সে-তুং লাল চীনের জন্ম দিয়েছিলেন৷ সেই চীন এখন কোথায়, আর আমরাই বা কোথায়! এসবের পর যদি এ রাজ্যের নির্বাচিত সরকারই বলে স্বাধীনতা দিবস কীভাবে পালিত হবে, তা নিয়ে কেন্দ্র কথা বলার কে— তার পর আর নিজের দেশের প্রতি পরবর্তী প্রজন্মের কোনও রকম ভালোবাসা জাগবে? আমার জানতে ইচ্ছে করছে— এ রাজ্যের বর্তমান শাসকদের কাছে দেশপ্রেমের সংজ্ঞাটা কী৷

আরও পড়ুন: স্বাধীনতা দিবসের আগে পাকিস্তান সেনার ট্রাকের আত্মঘাতী বিস্ফোরণ

Advertisement
---