আন্তর্জাতিক শ্রম দিবসের নেপথ্যে রয়েছে পুঁজিবাদীদের আমেরিকা

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: আমেরিকা তো পুঁজিবাদীদের জায়গা৷ ওখানে শ্রমিকদের কথা ভাবা হয় নাকি? শ্রমিকদের কথা তো কমিউনিস্ট রাশিয়া ভাবত, বা এখন কিউবার মতো দেশ ভাবে৷ শ্রমিকদের জন্য আন্দোলন ওইসব জায়গাতেই হয়ে থাকে৷

এমনই একটা ধারণা রয়েছে অনেকের মধ্যে৷ আমেরিকাতেও শ্রমিক আন্দোলন হতে পারে সেটা অনেকে বিশ্বাসও করতে চায় না৷ কিন্তু ঊনবিংশ শতকে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকরা গর্জে উঠেছিল আমেরিকার শিকাগোতেই৷ সেদিনের সেই আন্দোলনের ফলেই গোটা দুনিয়া আজ পেয়েছে মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস৷

ঊনবিংশ শতাব্দীতে শ্রমিকরা অনুভব করেছিল, তাদের কাজের কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই৷ মালিকপক্ষ বাধ্য করত প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করতে, এমনকী কোনও কোনও দিন তা ১৬-১৮ ঘণ্টায় গিয়েও দাঁড়াত৷ তাছাড়া কাজের পরিবেশও এত খারাপ ছিল যে, দুর্ঘটনায় কর্মরত শ্রমিকের মৃত্যু অথবা জখম হওয়ার ঘটনা হামেশাই ঘটত ৷ বহু সময় দেখা যেত, কাজ করতে করতে শ্রমিকরা মেশিনের পাশেই বেহুঁশ হয়ে পড়েছে ৷ খবর পেয়ে তার স্ত্রী-সন্তানেরা এসে কাঁদতে কাঁদতে টেনে বাড়ি নিয়ে গিয়েছে৷

- Advertisement -

ঊনবিংশ শতাব্দীর ছয়ের দশকে প্রথম বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কিছু জায়গায় বেতন না কেটে কাজের সময় কমিয়ে আট ঘণ্টার কাজের দাবি ওঠে৷ তবে ওই শতকের আটের দশকের আগে সেই আন্দোলন তেমন দানা বাঁধেনি৷ সংগঠিতভাবে তা শুরু হয় ১৮৭১ সালের পারি কমিউন গঠিত হওয়ার পর৷

তারই উদ্দীপনায় ১৮৮৪ সালে শিকাগোতে শ্রমিকদের এক সম্মেলনে (যা পরবর্তীকালে অ্যামেরিকান ফেডারেশন অফ লেবর বলে পরিচিত হয়) ঘোষণা করা হয়েছিল, পয়লা মে ১৮৮৬ সাল থেকে শ্রমিকদের কাজের সময় আট ঘণ্টা ধার্য করতে হবে৷ আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম, বাকি আট ঘণ্টা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং বিনোদন৷ সেদিন স্লোগান ছিল, ৮-৮-৮৷

এরপর ওই শহরটিতে ৪০ হাজার শ্রমিক দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘটে নামে৷ ১৮৮৬ সালের পয়লা মে শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকরা পায়ে পা মিলিয়ে মিছিল করে৷তাদের হাতের নিশানে লেখা ছিল ৮-৮-৮৷

তাদের ঘিরে থাকা একদল পুলিশের উপর কেউ হঠাৎ বোমা মারে, আর তার পরেই পুলিশ শ্রমিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে এঞ্জেল, পার্কিনস, স্পিয়ার সহ কমপক্ষে ১০-১২ জন শ্রমিক শহিদ হন।

১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৪ জুলাই প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদ বার্ষিকী বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লেভাইন।

১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিক শ্রমিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। পরে, ১৯০৪ সালে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে ফের একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেই প্রস্তাবে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখটিতে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের জন্য সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল।

সেই সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে-র পয়লা তারিখে ‘বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করা’র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের পয়লা তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে পালনের দাবি জানান এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকরী হয়।

দীর্ঘদিন ধরে বহু শ্রমিক সংগঠন তাদের দাবি জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসাবে বেছে নেয়। কোনও কোনও স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে এদিন।

এদিকে শ্রমদিবসের মাহাত্ম্য ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ৷ ফলে বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলি রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিনটিকে পালন করে থাকে। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পয়লা মে জাতীয় ছুটির দিন।

আরও অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়। পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র যেমন ছিল, ঠিক তেমনই এখনও কিউবা, ভিয়েতনাম সহ বিশ্বের কয়েকটি দেশেই মে দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেসব দেশে এমনকী এই উপলক্ষে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজনও করা হয়।

আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার শ্রম দিবস রূপে পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রম নাইটরা এই দিন পালনের উদ্যোক্তা।

হে মার্কেটে শ্রমিক নিধনের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন, পয়লা মে তারিখে যে কোনও আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সেই জন্য ১৮৮৭ সালেই তিনি নাইটদের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন৷

১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার মে দিবসকে একইসঙ্গে আনুগত্য ও আইন দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। বর্তমানে আমেরিকায় ‘মে দিবস’টি শুধু শহর এলাকার শ্রমিক সংগঠনগুলির কার্যক্রমের মাধ্যমেই পালিত হয়।

রুশ বিপ্লবের আগে গোপনীয়তার সঙ্গে মে দিবস পালিত হত রাশিয়া, কারণ জারের রাশিয়ায় ‘মে দিবস’ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। রাশিয়ায় আইনগতভাবে প্রথম ‘মে দিবস’ পালিত হয় ১৯১৭ সালে। কালক্রমে নভেম্বর বিপ্লবের (পুরানো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যা অক্টোবর বিপ্লব) এটি হয়ে ওঠে সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। মে দিবসে তখন মস্কোর রেড স্কোয়ারে সবচেয়ে বড় কনসার্ট ও সেইসঙ্গে কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হত৷

জাপানে এ দিবসটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় না। তবে জাপানের বৃহৎ শ্রমিক সংগঠনগুলি টোকিওতে পদযাত্রা ও বিক্ষোভের আয়োজন করে। ব্রাজিলে শ্রমিক দিবসে সরকারি ছুটি থাকে, দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এটি পালন করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন।

এই মে দিবসের সময়ই সেদেশে ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন পেশার চাকুরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ১৯৬৩ সাল থেকে ‘মে দিবস’ পালিত হয়ে এলেও ২০০৭ সালেই সেখানে প্রথম সরকারিভাবে মে দিবসে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

জার্মানিতে ‘মে দিবস’ জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। বার্লিনে প্রতি বছরই এ দিনটিতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক দলের সমাবেশ আয়োজিত হয়ে থাকে। সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে আর আইসল্যান্ডেও এটি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন।

সুইডেন আর ফিনল্যান্ডে দিনটি স্মরণীয় রাখতে আয়োজন করা হয় ওয়ালপারগিস নাইট নামের কার্নিভাল। যদিও সেই কার্নিভালের সঙ্গে শ্রমিক দিবসের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন৷ কারণ, ওয়ালপারগিসের সঙ্গে এক ধরনের গুপ্ত আদিম পার্বণের যোগ আছে৷ ডেনমার্কে অবশ্য সরকারিভাবে ছুটির দিনের মর্যাদা পায়নি মে দিবস।

ইতালিতে প্রথম এই দিনটি পালিত হয় ১৮৯০ সালে। ফ্যাসিস্ট আমলে নিষিদ্ধ হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারও সেখানে শুরু হয় ‘মে দিবস’ পালন। বিশেষ করে সেখানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় রোমে আয়োজিত ইতালীয় শ্রমিক ইউনিয়নের মে দিবস কনসার্ট। সেখানকার বিখ্যাত সব ব্যান্ড আর শিল্পীর পরিবেশনায় এ কনসার্টে প্রতি বছর হাজির হন তিন লাখেরও বেশি মানুষ।

কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে, ভারতের বুকে মাদ্রাজে প্রথম ‘মে দিবস’ পালিত হয় ১৯২৩ সালে, ব্রিটিশ আমলে। দিবসটির আয়োজন করেছিল লেবার কিষাণ পার্টি। যদিও এ নিয়ে মতভেদ আছে ৷ বর্তমানে অবশ্য এই দিনে ভারতের সব ব্যাংক বন্ধ রাখা হয়।

তাছাড়া বাংলা, মহারাষ্ট্র সহ বেশ কিছু রাজ্যে শ্রমিক দিবস হিসেবে উদযাপন করতে দেখা যায়৷ তবে সম্প্রতি বিজেপি পয়লা মে-র বদলে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটিকে শ্রমদিবস হিসাবে পালন করার দাবি তুলেছে৷ যদিও শ্রমিক দিবসকে দেশজ করার অছিলায় তাতে ‘হিন্দুয়ানি’র ছোঁয়া লাগানোই তাদের লক্ষ্য বলেও প্রশ্ন তুলেছে নানামহল ৷

Advertisement
----
-----