‘দাদার জ্বলছে বুক, আমাদের মাথা’, শোভনের জেলায় ঝরছে আক্ষেপ

দেবযানী সরকার, কলকাতা: প্রেম যে কী বিষম বস্তু, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন দিদির ভাইয়েরা৷ রাজ্যে গেরুয়া ঝড় রুখতে রাজ্যের ব্লকে ব্লকে ইতিমধ্যেই ঘটা করে পঞ্চায়েত সম্মেলন করে ফেলেছে শাসক৷ ব্যতিক্রম, শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগণা৷

কেন, হলটা কি! ক্যানিং থেকে কাকদ্বীপ কিংবা বাসন্তী থেকে জয়নগর কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, শুধুই বিরহের কথা! কেউ কেউ হতাশার সুরে বলছেন, ‘‘বিচ্ছেদ-টা বড় কথা নয়, এভাবে চার দেওয়ালের কথা প্রকাশ্যে চলে এলে কারই বা মানসিকতা ঠিক থাকে বলুন!’’অগত্যা, প্রেম-বিরহের ‘জ্বরে’ জেলা থেকে রাতারাতি কার্যত ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছেন দলের জেলা সভাপতি তথা রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়৷ স্বভাবতই, অভিভাবকহীন জেলায় ঘেঁটে গিয়েছে দলের কর্মসূচি৷ হতাশা বাড়ছে নিচুতলায়৷

পরিস্থিতির জন্য শাসকদলের নিচুতলার কর্মী-সমর্থকরা দায়ী করছেন, শোভনবাবুর প্রেম-চ্ছেদ কেই৷ তাঁদের কথায়, ভোটের আগে জেলা সভাপতি শোভন চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত বিতর্ক এভাবে প্রকাশ্য চলে আসায় এবং প্রেম-বিচ্ছেদের কহানির জেরে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ার ফলেই আজ দক্ষিণ ২৪ পরগণার এই হাল৷ স্থানীয় এক নেতার কথায় , “দিদি যা উন্নয়ন করেছেন তাতে আমরা হয়তো এবারেও জেলায় পঞ্চায়েতের সিংহভাগ আসনে জয়ী হব৷ কিন্তু কেমন একটা ছানা-কাটা হাল! ভোট বলে মনেই হচ্ছে না৷’’ আক্ষেপের সুরে বলছেন, ‘‘সবকিছুই যেন ছাড়া ছাড়া ভাব৷ সব জেলায় কর্মীদের নিয়ে সম্মেলন হচ্ছে৷ কিন্তু আমাদের এসবের কোনও বালাই নেই৷ ফলে ভোটের আবহটা ঠিক জমছে না৷ কর্মীদের চাঙ্গা করার জন্য সম্মেলন করাটা খুব প্রয়োজন ছিল৷”

- Advertisement DFP -

এতদিন জেলা সভাপতি হিসেবে শোভন চট্টোপাধ্যায়ই জেলার যাবতীয় নির্বাচনের দায়িত্ব সামলাতেন৷ নজিরবিহীনভাবে সম্প্রতি জেলাযর পঞ্চায়েত ভোটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের রাজ্যসভার সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তী, অঞ্জন দাস, শক্তি মণ্ডল ও আবু তাহেরকে৷ প্রধান দায়িত্বে শুভাশিসবাবু৷ তাঁর মাথার উপর রয়েছেন দলের সভাপতি সুব্রত বক্সী৷ দলের অন্দরে শুভাশিস ও শোভনের ‘ছুরি-কাঠারি’র সম্পর্ক সুবিদিত৷ স্বভাবতই নয়া দায়িত্ব পেয়ে অত্যুৎসাহে জেলার সংগঠনকে আরও মজবুত করার কাজে কার্যত আদা-জল খেয়ে নেমে পড়েছিলেন শুভাশিস৷

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর: ইতিমধ্যে শোভনের সঙ্গে কথা হয়েছে দলের রাজ্য সভাপতির৷ সুব্রত বক্সির নির্দেশে শোভনবাবু শীঘ্রই জেলার ভোটের ময়দানে নামবেন তিনি৷ সূত্রের খবর: স্বভাবতই হতাশ হয়ে গিয়েছে শুভাশিস অনুগামীরা৷ একান্ত আলাপ চারিতায় তাঁরা বলছেন: এভাবে অপমান করার কোনও মানে ছিল? স্বভাবতই গা ছাড়া মনোভাব তাঁদের মধ্যে৷ শুভাশিসবাবুর কথাতেও তা স্পষ্ট৷ বলছেন, ‘‘এই মুহূর্তে সম্মেলন হচ্ছে না৷ তবে ঘরোয়া প্রোগ্রাম হচ্ছে৷ তাছাড়া আমি পুরোপুরি দায়িত্বে নেই, তাই এবিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়৷ শোভন চট্টোপাধ্যায় আছেন৷ উনি বলতে পারবেন৷’’ খানিকটা ক্ষোভের সুরেই বলেছেন, ‘‘আমি তো নীচুতলা থেকে উঠেছি, তাই যা করব নীচু তলা থেকেই করব৷

জেলা পরিষদ দেখব অথচ পঞ্চায়েত সদস্যকে গুরুত্ব দেব না- এটা আমার আদর্শ নয়৷ আমার কাছে নিচু তলার কর্মীরাই সবচেয়ে আগে৷’’ ইঙ্গিত যে শোভনবাবুকে লক্ষ্য করেই তা স্পষ্ট৷ যদিও প্রতিক্রিয়া জানার জন্য শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি৷ ফলে মেলেনি তাঁর প্রতিক্রিয়াও৷

বৃহস্পতিবারই নির্বাচনে কমিশনের সর্বদল বৈঠকে ইঙ্গিত মিলেছে, মে মাসেই ভোটের সম্ভাবনা প্রবল৷ সূত্রের খবর, আগামী সপ্তাহেই ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করে দিতে পারে কমিশন৷ ফলে এ’কদিনের মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায় দলীয় সম্মেলনের সম্ভাবনা দেখছে না তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা৷ অগত্যা, কোনও গাইডলাইন ছাড়াই পঞ্চায়েত নির্বাচন থুড়ি সোজা পরীক্ষার হলে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে তাঁদের৷

দলের এক নীচুতলার কর্মীর সরস মন্তব্য, ‘‘প্রেম যে কি বিষম বস্তু, তা তো আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি৷ দাদার জ্বলছে বুক, আমাদের মাথা৷’’ ‘মাথা’ কেন? মুচকি হেসে বলছেন, ‘‘অভিভাবকের প্রেম-কেচ্ছা যদি সদর দরজা দিয়ে রাজপথের চা-দোকোনের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলে কারই বা মাথা ঠিক থাকে বলুন৷ পঞ্চায়েতে হয়তো সিংহভাগ আসনে জিতব আমরাই, কিন্তু দাদার বিষয়ে মানুষকে কৈফিয়ৎ দিতে দিতে আমাদের নাজেহাল অবস্থা৷’’

Advertisement
----
-----