মমতার ‘আস্থাশীল’ হাসপাতালেই মৃত তৃণমূল নেতার চিকিৎসায় চূড়ান্ত অবহেলার অভিযোগ

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: বিভিন্ন সময় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আস্থা’ প্রকাশ পেয়েছে যে বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে, দক্ষিণ কলকাতার সেই হাসপাতালের তিন চিকিৎসক এবং শীর্ষ স্তরের এক আধিকারিকের নামেই এ বার ভুল চিকিৎসায় তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেতার মৃত্যুর অভিযোগ উঠল৷ এবং, চিকিৎসায় চূড়ান্ত অবহেলার এই অভিযোগ দায়ের হয়েছে আবার মুখ্যমন্ত্রীর তৎপরতায় চালু ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশনে৷

একই সঙ্গে এই অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরেও৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (এমসিআই)-তেও এই অভিযোগের বিষয়টি জানানো হয়েছে৷ এমনকী, ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে৷ দক্ষিণ কলকাতায় মিন্টোপার্কের কাছে অবস্থিত ওই বেসরকারি হাসপাতালের নাম বেলভিউ ক্লিনিক৷ ওই হাসপাতালেই তৃণমূল কংগ্রেসের মুর্শিদাবাদ জেলার সভাপতি মান্নান হোসেনের একটি কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছিল৷ সেখানেই গত ১৪ নভেম্বর বিকাল সাড়ে নাগাদ তৃণমূল কংগ্রেসের এই নেতার মৃত্যু হয়েছে৷

আরও পড়ুন: বাংলা দখলের লক্ষ্যে তৈরি তিনমূর্তি মুকুল-দিলীপ-রাহুলের তিন টিম

- Advertisement -

কংগ্রেস থেকে ২০১৪-য় তৃণমূল কংগ্রেস যোগদান করেছিলেন মান্নান হোসেন৷ তার আগে ১৯৮৭-তে মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হিসাবে তিনি বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন৷ এবং, ২০০৪ আর, ২০০৯-য়ে মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি৷ তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদানের পরে মুর্শিদাবাদের জেলা সভাপতি ছিলেন মান্নান হোসেন৷ ওয়াকিবহাল মহলের বিভিন্ন অংশ থেকে এমনই জানানো হয়েছে, একজন রোগী মানে তিনি রোগীই৷ এবং, তাঁকে সুস্থ করে তোলার প্রচেষ্টা জারি রাখেন চিকিৎসকরা৷ এ ক্ষেত্রে রোগীর ব্যক্তি পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত নয়৷

তবে, মান্নান হোসেনের মতো রাজনৈতিক এক নেতার চিকিৎসার বিষয়ে বেসরকারি ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে যে ভুল চিকিৎসা এবং চূড়ান্ত অবহেলার অভিযোগ উঠেছে, তার জেরে বিভিন্ন মহলে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে৷ কারণ, এসএসকেএম হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও, সরকারি খরচে বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি ওই হাসপাতালে যেমন বিভিন্ন বিশিষ্ট মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে খোদ তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকার৷ তেমনই, মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো তথা তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সহ তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন নেতাও তাঁদের চিকিৎসার জন্য বেসরকারি ওই হাসপাতালের উপর ‘আস্থা’ রেখেছেন বলে প্রকাশ পেয়েছে৷

আরও পড়ুন: মার খেলে কাজে আসবে ডাক্তারদের সস্ত্রীক মেডিটেশন? শান্ত-‘ওষুধে’ বিতর্ক

ওয়াকিবহাল মহলের ওই সব অংশের তরফে জানানো হয়েছে, কে, কোন হাসপাতালে চিকিৎসা করাবেন, সেই বিষয়টি অবশ্যই তাঁর ব্যক্তিগত৷ কিন্তু, যেভাবে পথ দুর্ঘটনায় জখম তৃণমূল কংগ্রেসের নাট্য-অভিনেত্রী সংসদ সদস্যের চিকিৎসার জন্য বালুরঘাটের সরকারি হাসপাতাল থেকে এসএসকেএম হাসাপাতালে রেফার করা হয়েছিল, এবং, তার পরে যেভাবে ওই সংসদ সদস্যের চিকিৎসার জন্য ওই বেসরকারি হাসপাতালে বন্দোবস্ত করে রাখতে স্বাস্থ্য দফতরের তৎকালীন শীর্ষ স্তরের এক আধিকারিককে সেখানকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাখতে হয়েছিল, সেই বিষয়টিও কম প্রশ্ন তোলেনি৷ একই সঙ্গে ওয়াকিবহাল মহলের ওই সব অংশ এমনই মনে করে যে, বিভিন্ন ঘটনায় যেমন চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ মিলেছে৷ তেমনই, কোনও রোগীর মৃত্যু মানেই যে তাঁর চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল, তেমন নাও হতে পারে৷

তবে, অভিযোগ যখন উঠেছে, তখন এই অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত বিচারের জন্য প্রশাসনের তরফে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলেও জানিয়েছে ওয়াকিবহাল মহলের ওই সব অংশ৷ কিডনি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে বেসরকারি ওই হাসপাতালের এক চিকিৎসকের কাছে মান্নান হোসেনের চিকিৎসা চলছিল৷ অভিযুক্ত তিন চিকিৎসকের মধ্যে এই চিকিৎসকও রয়েছেন৷ তৃণমূল কংগ্রেসের এই নেতার স্ত্রী বুলবুল বেগমের ভাই মহিবুর রহমানের কথায়, ‘‘ভুল চিকিৎসা এবং চিকিৎসায় চূড়ান্ত অবহেলার কারণে মান্নান হোসেনের মৃত্যু হয়েছে৷ একটি কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য বেলভিউ ক্লিনিক থেকে ১৪ লক্ষ টাকা খরচের কথা বলা হয়েছিল৷ কিন্তু, শেষ পর্যন্ত ২৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে৷’’

আরও পড়ুন: মোদীকে পোস্ট কার্ড পাঠাচ্ছেন হাজার হাজার ট্রান্সজেন্ডার-সমকামী

কেন ভুল চিকিৎসা এবং চিকিৎসায় চূড়ান্ত অবহেলার অভিযোগ উঠেছে? মহিবুর রহমানের কথায়, ‘‘মান্নান হোসেনের দু’টি কিডনি অকেজো হয়ে গিয়েছিল৷ একটি কিডনির ব্যবস্থা আমরা করতে পেরেছিলাম৷ গত দুই অক্টোবর বেলভিউ ক্লিনিকে মান্নান হোসেনকে ভর্তি করানো হয়েছিল৷ আর, গত চার অক্টোবর তাঁর একটি কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছিল৷ অস্ত্রোপচারের পরে যাতে সংক্রমণের শিকার হয়ে না পড়েন, তার জন্য মান্নান হোসেনকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে পৃথক ভাবে রাখার কথা হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছিল৷ অথচ, অস্ত্রোপচারের পরে জেনারেল বেডে রাখা হয়েছিল৷ আমরা বলার পরে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়েছিল৷ কিন্তু, দু’ দিন পরে আমাদের না জানিয়ে আবার জেনারেল বেডে দেওয়া হয়েছিল৷’’

একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘অস্ত্রোপচারের ১০-১২ দিন পর থেকে হাসপাতাল থেকে মান্নান হোসেনকে তাড়াতাড়ি বাড়ি নিয়ে আসার কথা বলা হচ্ছিল৷ হাসপাতাল থেকে না নিয়ে আসা হলে তিনি সংক্রমণের শিকার হয়ে পড়বেন বলে জানানো হচ্ছিল৷ আমরা মনে করছি, অস্ত্রোপচারের টেবিল থেকেই সংক্রমণের শিকার হয়েছিলেন মান্নান হোসেন৷’’ শুধুমাত্র তাই নয়৷ মহিবুর রহমানের কথায়, ‘‘হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে ৪০ দিন মান্নান হোসেনকে একই পোশাকে রাখা হয়েছিল৷’’ শেষ পর্যন্ত গত ছয় নভেম্বর ওই হাসপাতাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের এই নেতাকে কলকাতায় তাঁর ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু, শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে গত আট নভেম্বর ফের ওই হাসপাতালে মান্নান হোসেনকে ভর্তি করানো হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন৷

আরও পড়ুন: আরজি করে তিন দফায় উদ্বোধনের ট্রমা কেয়ার সেন্টার সরকারের ‘আই ওয়াশ’-‘প্রহসন’

একই সঙ্গে মহিবুর রহমান বলেন, ‘‘আমাদের আবেদনের ভিত্তিতে বেলভিউ ক্লিনিক থেকে মান্নান হোসেনের চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে যে সব নথি দেওয়া হয়েছে৷ তার মধ্যে একটি নথিতে লেখা রয়েছে, অস্ত্রোপচারের কারণে মৃত্যু হলে চিকিৎসক এবং হাসপাতাল দায়ী নয়৷ এই নথিতে মান্নান হোসেনের বড় ছেলের সই নকল করা হয়েছে৷’’ এমন বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের বিষয়ে বেসরকারি ওই হাসপাতালের তরফে বক্তব্য জানার জন্য সেখানকার সিইও প্রদীপ ট্যান্ডনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়৷ তবে, ফোন কল তিনি না ধরায় বক্তব্য মেলেনি৷

Advertisement ---
---
-----