মোদীর অশ্বমেধের ঘোড়ায় গোটা ভারত আজ গেরুয়া

গ্রাফিক্স- কল্যাণ

মানব গুহ, কলকাতা: তিন রাজ্য নির্বাচনের ফলাফলে ত্রিপুরায় সরাসরি ক্ষমতায় ও নাগাল্যান্ডে বিজেপি জোট ক্ষমতায় এসে, গেরুয়া ভারত করার লক্ষ্যে আরও একধাপ এগিয়ে গেল নরেন্দ্র মোদীর দল৷ রাজধানী রাজ্য দিল্লীকে ধরে মোট ৩০ টি রাজ্যের মধ্যে বিজেপি ও বিজেপির জোট এখন ক্ষমতায় ২০টি রাজ্যে৷ শতাংশের হিসাবে ৬৬ শতাংশের বেশি ভারত মোদীর করায়ত্বে৷ বাকি মাত্র ১০ টি রাজ্য৷ মোদীর নেতৃত্বে কি গোটা দেশের দখল নেবে বিজেপি? আগামী দিনে গোটা দেশেই কি গেরুয়া ঝড় লক্ষ্য করা যাবে? গুজরাত ও হিমাচলপ্রদেশের পর এবার ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ডের জয়ে এই প্রশ্ন কিন্তু উঠতে শুরু করেছে৷

দিল্লী ধরে দেশের ৩০ টি রাজ্যের মধ্যে এখন ২০ টি রাজ্যে বিজেপি বা বিজেপি জোট ক্ষমতায়৷ শতাংশের হিসাবে ৬৬ শতাংশ দেশ গেরুয়া পতাকার তলায়৷ এর মধ্যে ১৫ টি রাজ্যে সরাসরি ক্ষমতায় বিজেপি৷ বাকি ৫টি রাজ্যে তাদের ন্যাশান্যাল ডেমক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা NDA এর জোট আছে৷ রাজনৈতিক দলের পতাকা অনুযায়ী ভারতের ম্যাপ রঙ করলে এখন পুরো ভারতবর্ষকেই গেরুয়া মনে হয়৷ ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ড জয়ের পর বাকি পূর্ব আর দক্ষিণ ভারতের সামান্য কিছুটা অংশ আর গেরুয়াহীন৷

২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ত্রিপুরাতেও এখন ক্ষমতায় বিজেপি৷ নাগাল্যান্ডেও সরকার গড়বে বিজেপি জোট৷ এরপর, ২০১৮ সালেই বিধানসভা নির্বাচন ছত্তিশগড়, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, মিজেরাম ও রাজস্থানে৷ এর মধ্যে মিজোরাম ও কর্ণাটকে বিজেপি বা তার জোটের শাসন নেই৷ নিজেদের জেতা রাজ্য ধরে রাখার পাশাপাশি এই ২ টি রাজ্যে বিজেপি শাসন কায়েম করার জন্য ইতিমধ্যেই অমিত শাহের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিজেপি নেতারা৷

- Advertisement -

২৪ বছর আগে কংগ্রেস ও তার জোট ১৮ টি রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল৷ গুজরাত ধরে রেখে হিমাচল প্রদেশ জেতার পর কংগ্রেসের সেই রেকর্ড স্পর্শ করেছিল বিজেপি৷ আর ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ডে সরকার গঠন করে নিজেদের সেই রেকর্ড আরও উন্নত করল বিজেপি৷

এই মূহুর্তে বিজেপি ও তার জোট ন্যাশান্যাল ডেমক্রেটিক অ্যালায়েন্সের দখলে ২০টি রাজ্য৷ ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে মোদীর নেতৃত্বে দেশের ক্ষমতায় আসে বিজেপি৷ তারপর থেকে তেলেঙ্গনা, অরুণাচল প্রদেশ, বাংলা, দিল্লী, পাঞ্জাব, বিহার ছাড়া সব রাজ্য নির্বাচনেই বিজেপির জয়-জয়কার৷ বিহারে প্রথমে হেরে গেলেও নিতীশ কুমারকে ভাঙিয়ে এখন ক্ষমতায় বিজেপি জোট৷ অরুণাচল প্রদেশেও শাসক দলের সঙ্গে জোট রয়েছে বিজেপির।

২০১৪ র মোদী ঝড়ের আগে ভারতের ৫ টি রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল বিজেপি৷ গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং নাগাল্যান্ডে৷ ২০১৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ, সিকিম, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, জম্মু কাশ্মীর, ঝাড়খন্ড ক্ষমতায় আসে বিজেপি৷ এর মধ্যে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও ঝাড়খন্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে উঠে আসে বিজেপি৷ জম্মু কাশ্মীরে ২৫ টি আসন পায় বিজেপি৷

২০১৫ তে অবশ্য বিহার ও দিল্লীতে শোচনীয় ফলাফল হয় গেরুয়া শিবিরের৷ কিন্তু পরে নীতিশ কুমারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিহারে ক্ষমতা দখল করে বিজেপি৷ ২০১৬ তে কংগ্রেসকে সরিয়ে অসমে ক্ষমতা দখল করে বিজেপি৷ ২০১৭ তে গুজরাত ও হিমাচল প্রদেশ জয়ের আগে গোয়া, উত্তরাখন্ড, উত্তরপ্রদেশ, মণিপুর বিধানসভা নির্বাচনেও জয় পায় বিজেপি ও ন্যাশান্যাল ডেমক্রেটিক অ্যালায়েন্স৷

এরপর ২০১৮ র শুরুতেই ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ড দখল করে গোটা ভারত গেরুয়া করার দিকে আরও এগিয়ে গেল মোদীর বিজেপি৷ ‘কংগ্রেস হঠাও দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে শুধু কংগ্রেস নয়, অন্যান্য দলও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদীর অসাধারণ নির্বাচন পরিকল্পনায়৷

সব মিলিয়ে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর গোটা দেশের ২০টি রাজ্যে এখন বিজেপির শাসন৷ যা আগে কখনও হয় নি৷ এমনকি পারে নি জাতীয় কংগ্রেসও৷ তারাও সবচেয়ে বেশি ১৮ টি রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল৷ ২০১৮ তে ৮টি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন৷ এর মধ্যে ৪ টি রাজ্যে ক্ষমতায় নেই বিজেপি৷ গুজরাত ভোটের ফলাফলের পরই বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ জানিয়ে দিয়েছেন, ২০১৮ তে বিজেপির লক্ষ্য মেঘালয়, মিজোরাম, কর্ণাটক ও ত্রিপুরাতে বিজেপি বা জোটের সরকার প্রতিষ্ঠা করা৷ মেঘালয়ে না পারলেও ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ড দখল করেছে বিজেপি৷

একনজরে দেখে নেওয়া যাক, কোন ১০টি রাজ্যে এখন ক্ষমতায় নেই বিজেপি৷ কংগ্রেসের হাতে রয়েছে ৩টি রাজ্যের ক্ষমতা৷ পাঞ্জাব, কর্ণাটক, মিজেরাম৷ দেশকে কংগ্রেস মুক্ত সরকার দেওয়ার ঘোষণা করেই দিয়েছে পদ্ম শিবির৷ ফলে এই ৩টি রাজ্যে ক্ষমতা দখলই যে তাদের প্রধান টার্গেট তা পরিস্কার বলেই দিচ্ছেন গেরুয়া নেতারা৷ কংগ্রেস হাতে থাকা মেঘালয়েও নির্বাচনের পর ত্রিশঙ্কু অবস্থা৷ বাকি কেরলে এই মূহুর্ত্বে বাম শাসন৷ তেলেঙ্গানায় তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিথি, তামিলনাড়ুতে এআইএডিএমকে, দিল্লীতে আপ, ওড়িশায় বিজু জনতা দল ও বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেস৷ বাকি ২০ টা রাজ্যেই এখন গেরুয়া রঙের রমরমা৷

এর মধ্যে ২০১৮ তে কংগ্রেসের হাতে থাকা কর্ণাটক, মিজোরাম ছিনিয়ে নেওয়াই বিজেপির প্রথম টার্গেট৷ সেটা হলে প্রায় গোটা দেশই ২০১৯ এর লোকসভা ভোটের আগে গেরুয়া শিবিরে পরিণত হবে তা বলাই যায়৷ নিজেদের জেতা রাজ্য ধরে রাখতে পারলে ও কংগ্রেস শাসিত ২ টি রাজ্য জিততে পারলে ২০১৮ তেই বিজেপি ও ন্যাশান্যাল ডেমক্রেটিক অ্যালিয়েন্সের দখলে চলে আসবে ভারতের অধিকাংশ রাজ্য৷

নোটবাতিল ও GST র পর প্রায় সব রাজ্যের ভোটেই বিজেপির জয় জয়কার৷ রাজনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে মোদীর সিদ্ধান্ত দেশবাসী যে ভালো ভাবেই মেনে নিয়েছেন, একথা অস্বীকার করার কোন কারণই নেই৷ ঠিক যে ভাবে বাংলায় সারদা-নারদ কেলেঙ্কারী কোন ভোটেই কোন প্রভাব ফেলে নি৷ ঠিক সেই ভাবেই নোটবাতিল ও GST নিয়ে বিরোধীদের প্রচার কোন রাজ্য বিধানসভা ভোটেই কোন প্রভাব ফেলছে না৷

নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে, অমিত শাহের পরিকল্পনায় গেরুয়া রথ যে তড়তড়িয়ে এগুচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ আগামী দিনেও মোদীর অশ্বমেধের ঘোড়া ভারতের অন্য রাজ্যগুলিতেও দৌড়ায় কিনা তার দিকেই নজর থাকবে ভারতবাসীর৷ তবে, গোটা ভারতবর্ষকেই গেরুয়া রঙে রাঙাবার বিজেপির স্বপ্ন যে আপাতত: যে সত্যি হয়েই চলেছে তা আর অস্বীকার করার কোন উপায়ই নেই৷

Advertisement
-----