টোকিও: যাদবপুরের ক্যাম্পাস পেরিয়ে জাপানেও ‘হোক কলরব৷’ ভাবছেন তা কী করে সম্ভব? হোক কলরব আন্দোলন তো অনেক দিন আগেই মিটে গিয়েছে৷ তাও আবার নতুন করে হবেই বা কেন? আর হলেও জাপান৷ এও কি সম্ভব?

আসলে টোকিওতে চলছে এক ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন৷ অনেকটা হোক কলরবের আদলেই চলছে বিক্ষোভ প্রতিবাদ৷ বলতে গোটা জাপানের গোটা ছাত্র সমাজই সরকারের বিরুদ্ধে রাগে ফুঁসছে৷ আর অনেকটা হোক কলরবের মতোই ছাত্রদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে সমাজের সবস্তরের মানুষ৷ ফারাক শুধু একটাই যাদবপুরের ছাত্র আন্দোলন ছিল ভিসির পদত্যাগের দাবিতে৷ আর জাপানের ছাত্রদের আন্দোলন সরাসরি দেশের সরকারের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে৷ সদ্য প্রেসিডেন্সিতে অভব্য ছাত্র আন্দোলনের কারিগররা জাপানের কাছ থেকে শিক্ষা নিতেই পারেন৷japan4

Advertisement

জাপানে নতুন একটি বিলের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের বাইরে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে সোমবার। এই বিলে জাপানের সেনাদের আবার বিদেশে গিয়ে লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের এই নিরাপত্তানীতির প্রবল বিরোধিতা করছে জাপানের সমস্ত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা৷

ফুকুশিমা বিদ্যুৎকেন্দ্র বিধ্বস্ত হওয়ার পর ২০১২ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যাপর বিক্ষোভ আন্দোলন হয়েছিল টোকিওতে৷ সেই বিক্ষোভ আন্দোলনের পর সোমবার আরও বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ হলো। বিক্ষোভে বিভিন্ন বয়সের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার লোক অংশ নেন। বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন ছাত্র ও তরুণেরা।

ছাত্র সমাজের দাবি, জাপানের সংবিধান শান্তির কথা বলে৷ শান্তিকে প্রতিষ্ঠা করাই জাপানের সংবিধানের লক্ষ্য৷ সেই লক্ষ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে জাপানের নয়া যুদ্ধনীতি৷এই বিল কোনও মতেই আইনে পরিণত করা যাবে না বলে মত জাপানের সমগ্র ছাত্র সমাজের৷japan3

পার্লামেন্ট ভবনের মূল ফটকে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে পুলিশের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এরপর একে একে দল বেঁধে বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হতে রাস্তায় নেমে পড়েন। পার্লামেন্ট ভবনের কাছের একটি পার্কও বিক্ষোভকারীদের দখলে চলে যায়। বিক্ষোভে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ রিউচি সাকামোতোও অংশ নেন।
চার বছরের শিশু ছেলেকে নিয়ে সমাবেশে অংশ নেন ফ্রান্সে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ৪৪ বছর বয়সী নাওকো হিরামাতসু। তিনি বলেন, ‘টিভির সামনে বসে থেকে এবং শুধু অভিযোগ করে কোনো ফল হবে না। আমি যদি বিক্ষোভে না যাই এবং এটা যদি বন্ধ করতে না পারি তবে ভবিষ্যতে আমি আমার সন্তানদের কাছে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারব না।’
গত ১৬ জুলাই দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ দেশের নিরাপত্তা আইনে পরিবর্তন-সংক্রান্ত এই বিতর্কিত বিল অনুমোদন দেয়। এই প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে। আগামী মাসের চলতি অধিবেশনে ওই বিল পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন হবে৷ওই বিল অনুমোদিত হলে জাপানি সেনারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবার বিদেশে গিয়ে লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবে।

জাপানের সংবিধান অনুযায়ী, আত্মরক্ষা ব্যতীত জাপান তার বাহিনী ব্যবহার করে কোনো সংঘাত সমাধান করতে পারবে না। তবে নতুন আইনে জাপানের মিত্ররা যদি হামলার সম্মুখীন হয় তবে ‘যৌথ আত্মরক্ষায়’ দেশটি তার বাহিনীকে ব্যবহার করার অনুমোদন দেবে।japan2

প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেছেন, জাপানকে রক্ষায় এই পরিবর্তন জরুরি। তবে গণমাধ্যমের সমীক্ষা অনুযায়ী, জাপানের অর্ধেকের বেশি লোক এই বিলের বিরোধী।অনেক আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিল সংবিধানবিরোধী।

জাপানের এই ছাত্র আন্দোলন হোক কলরবের ধাঁচে মত গঠন করলেও, আন্দোলনের উদ্দেশ্য যে অনেক বৃহৎ স্বার্থে তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ অন্তত পক্ষে শুধুমাত্র ভিসিকে ক্যাম্পাস ছাড়া করার জন্য আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো সংকীর্ণ বোধ হয়ত জাপানের ছাত্রসমাজের মধ্যে নেই৷ তাই জাপানের ছাত্র সমাজ যেটা পারে সেটা কলকাতা পারে না৷ সম্প্রতি প্রেসিডেন্সিতে ভিসির পদত্যাগের যে অভব্যতার নজির গড়লেন পড়ুয়ারা৷ সেই সব পড়ুয়াদের কি জাপানের ছাত্র আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত নয়? অন্তত ছাত্র আম্দোলনের সারমর্মটা তাঁরা বুঝবেন৷

----
--