এনআরএস কাণ্ড: ‘কুকুরপ্রেমী’ বাঁকুড়ার মেয়ের এমন কাজে হতবাক গ্রামবাসীও

তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: এই মুহূর্তে বহু সমালোচিত এনআরএস হাসপাতালে কুকুর নিধন কাণ্ডে নাম জড়ালো বাঁকুড়ার। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভাইরাল’ হওয়া আর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা ১৬ টি কুকুর ছানাকে পিটিয়ে হত্যার ছবিতে এই মুহূর্তে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। এই ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছে বিভিন্ন মহল। পশুপ্রেমী থেকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়েছে। কিন্তু এভাবে বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত এক গ্রাম কারকবেড়িয়ার মেয়ের নাম এই ঘটনায় যুক্ত হবে ভাবতে পারছেন না ঐ গ্রামের কেউই।

রবিবার প্রকাশ্যে আসা এই ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে মঙ্গলবার কলকাতার এন্টালি থানার পুলিশ গ্রেফতার করেছে নার্সিং ছাত্রী মৌটুসী মণ্ডল ও সোমা বর্মনকে। ঘটনাচক্রে প্রথম বর্ষের নার্সিং ছাত্রী মৌটুসী মণ্ডলের বাড়ি বাঁকুড়ার কোতুলপুর থানা এলাকার কারকবেড়িয়া গ্রামে।

বাবা, মা, এক ভাইকে নিয়ে কোতুলপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম কারকবেড়িয়া গ্রামে মৌটুসীদের বাস। বাবা চাষের কাজে যুক্ত। একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মৌটুসী বরাবর এলাকায় মেধাবী ও মৃদুভাষী হিসেবেই পরিচিত। এলাকায় পশুপ্রেমী হিসেবেও যথেষ্ট সুখ্যাতি আছে তার। সেই মৌটুসী স্থানীয় কনকেশ্বরী হাই স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর পাশের জেলা হুগলির বেঙ্গাই কলেজে প্রথম বর্ষে পড়াকালীনই মাত্র কয়েক মাস আগে এন.আর.এস মেডিক্যাল কলেজে ‘নার্সিং পড়া’র সুযোগ পেয়ে সেখানে চলে যায়। ওখানেই বন্ধুদের সঙ্গে হোস্টেলে থাকতে শুরু করে। তারপর এই ঘটনায় মৌটুসীর নাম জড়িয়ে পড়ায় বিস্মিত পাড়া প্রতিবেশী, গ্রামবাসী থেকে তার বন্ধুরাও।

ছোট থেকেই কুকুর খুব পছন্দের মৌটুসীর। বাড়িতেও ‘ভুলু’ নামে একটি কুকুর রয়েছে। বাড়িতে থাকলে যার যত্ন আর খাওয়া দাওয়ার কোন ত্রুটি রাখেনা সেই মেয়ের এই ধরণের ঘটনায় নাম জড়ানোর কথা বিশ্বাস করতে পারছেননা কেউই। সংবাদমাধ্যমের সৌজন্যে মেয়ের এই খবর পেয়েই মঙ্গলবারই তার মাকে সঙ্গে নিয়ে তড়িঘড়ি কলকাতা ছুটে গিয়েছেন মৌটুসীর বাবা পেশায় প্রান্তিক চাষী গৌরাঙ্গ মণ্ডল। একমাত্র ভাই দুর্গাপুরে একটি বেসরকারী সংস্থায় কর্মরত। বাড়িতে এসেছেন এক বৃদ্ধা পিসি। অনেক স্বপ্ন নিয়ে কলকাতায় পড়তে যাওয়া গ্রামের মেয়েটার চিন্তায় এখন সময় কাটছে কারকবেড়িয়া গ্রামের সিংহভাগ মানুষের। আর তাদের বাড়িতে থাকা পৌষ্য ‘ভুলু’ও যেন কিছু বুঝতে পেরেছে। সারা সন্ধ্যে তাকে ছটফট করতে দেখা গিয়েছে। সেও যেন তার প্রিয় মৌটুসীর চিন্তায় কাতর।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মৌটুসীদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল বৃদ্ধা পিসি ভাইঝির চিন্তায় সারাদিন না খাওয়ার পর উনুনে ভাত চাপিয়েছেন। জ্যাঠিমা ঝর্ণা মণ্ডল বলেন, মৌটুসী এই ঘটনায় কোনভাবেই যুক্ত থাকতে পারেনা। ছোট থেকেই ও কুকুর খুব ভালোবাসে। আমাদের বাড়িতেও ‘ভুলু’ নামে একটি কুকুর আছে। ঐ কুকুরটিকে শুধু কোলে তুলে আদর করা নয়, বাড়িতে থাকলে সাবান, শ্যাম্পু দিয়ে নিয়মিও স্নানও করায়। এন.আর.এস হাসপাতালে ঐ ঘটনায় তাদের মেয়ে মৌটুসী যুক্ত থাকতে পারেনা দাবী করে তিনি বলেন, কারো পাল্লায় পড়ে ঐ ঘটনায় সে যুক্ত হয়ে পড়েছে। কেউ হয়তো কুকুর গুলিকে মারছিল, তখন সে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ছবিতে ওকে আমরা মৌটুসীকে কুকুর ছানা গুলিকে বস্তায় কুড়োতে দেখেছি। আমি নিঃসন্দেহ কেউ মেরে ফেলার পর সে ওখানে পৌঁছে কুকুর গুলিকে বস্তা বন্দি করেছিল।

প্রতিবেশী উত্তম পাল বলেন, সত্যি অন্যায় করলে শাস্তি হবে। ছোটো থেকেই আমরা মৌটুসীকে দেখে আসছি। ওদের বাড়িতে কুকুর আছে। যে মেয়েটা কুকুরকে খুব ভালোবাসে সে এই ঘটনায় যুক্ত থাকতে পারে এমনটা তিনি মনে করেন না বলেই জানিয়েছেন।

---- -----