বঙ্গের শক্ত গেরুয়া মাটি ঘেঁটে দিতেই তৃণমূলী মুকুলের বিজেপিতে পা?

রানা দাস: অনেকটা যেন বিনা মেঘেই বজ্রপাত! বলা নেই, কওয়া নেই, আচমকা তৃণমূলের সেনাপতি মুকুল রায়কে নিয়ে গত একমাস ধরেই বেশ চর্চা চলছে। হঠাৎ করে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত করে ফেললেন। দলত্যাগের কথাও ঘোষণা করলেন সংবাদমাধ্যমকে ডেকে। অন্যদিকে, যার দল সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু রীতিমতো স্পিকটি নট, দলের অবস্থান জানাচ্ছেন কর্পোরেট নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে দিয়ে।

আবার খুবই সুকৌশলে মুকুল রায়কে দল থেকে বহিষ্কার করার কথা ফলাও করে ঘোষণা করা হচ্ছে। তার পর থেকে একটা বিষয় বেশ মাথাচাড়া দিয়েছে, তা হল তৃণমূল ছেড়ে রাজ্যে বেড়ে ওঠা গেরুয়া বাহিনীতেই নাম লেখাচ্ছেন তৃণমূলের স্রষ্টা মুকুল রায়। এখানে তাঁকে তৃণমূলের জন্মদাতা এই কারণেই বলা হচ্ছে কারণ, দলের রেজিস্ট্রেশন মুকুল রায়ের নামেই করা। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে মুকুলের গড়া তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন।

আরও পড়ুন: তৃণমূল ছাড়ার পরই ফের গোয়েন্দা নোটিশ মুকুল রায়কে

- Advertisement -

স্বাভাবিকভাবেই গত একমাস ধরে মুকুল নাটকে প্রতিটি অধ্যায় দেখার পর বেশ তাজ্জব হতে হয়েছে। তাতে একটাই বিষয় স্পষ্ট মুকুল রায়ের আচমকা তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে তাঁর বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পিছনে বেশ ভারী মাথার তৈরি চিত্রনাট্য ধরেই নাটক চলছে। এটা পরিষ্কার মুকুলের আচমকা দলত্যাগ থেকে বিজেপিতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার পিছনে বড়সড় পরিকল্পনা করেই করা হচ্ছে। তার পিছনে বেশ কিছু কারণও আছে। তার জন্য পিছনের দিকে ঘুরে যেতে হবে।

কাঁচরাপাড়ার ‘কাঁচা’ ছেলে মুকুলের এই তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়ার নাটক প্রথমবার নয়। সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি সিবিআই তদন্ত শুরুর সময় একে একে তৃণমূল কংগ্রেস নেতার ডাক পড়েছিল। কুণাল-মদন-সৃঞ্জয় সহ আরও অনেককে লৌহকপাটের ওপারে ভরছিল মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। এই সব নেতাদের পর ডাক পড়তে চলেছিল মুকুল রায় সহ আরও বড় মাথাদের। আর সারদা কেলেঙ্কারিতে কোন কোন বড় মাথা জড়িত তা সাদা চোখে সাধারণ মানুষ ঠিক ভালো করেই জানেন। ঠিক ঘাড়ে সিবিআই হাত পড়ার প্রাক্কালেই মুকুল রায় আচমকা তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বসলেন। এর কোন রাজনৈতিক কারণ ছিল কিনা, তা আজও পরিষ্কার নয় রাজনৈতিকমহলের কাছে।

আরও পড়ুন: অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করলেন মুকুল রায়

সেই সময় কথা উঠেছিল, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে ম্যানেজ করতেই মুকুল রায় দলত্যাগ করেন। সত্যিই তাই। পরবর্তীতে সেটাই দেখা গেল যে, খুব সুকৌশলে দলকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন তৃণমূলের ম্যানেজমাস্টার, যোগ্য সেনাপতি মুকুল রায়। পার্থবাবুরা মুখে কাঁচা ছেলে বললেন, আদতে মুকুল এক্কেবারেই কাঁচা ছেলে নন। তা স্পষ্ট হয় গত বিধানসভা ভোটেই। ঠিক কি কারণে তিনি সেই সময় তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়েছিলেন, তা যেমন স্পষ্ট নয়, তেমনই আজও স্পষ্ট নয় যে, কোন যাদুবলে সমস্ত অভিমান ভুলে আচমকা দিল্লির বঙ্গভবনে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে চিকেন খেতে চলে গেলেন মুকুল রায়? আর সেই চিকেনে ঠিক কি ছিল যে, মুকুল-মমতা আবার কাছাকাছি চলে এলেন? আবার দলের হয়ে পুরোদমে নিজেকে সঁপে দিলেন কাঁচরাপাড়ার ‘পাকা’ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুকুল রায়।

সামনেই রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন। গত এক বছর ধরে রাজ্যে বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনার পর থেকে রীতিমতো কোনঠাসা রাজ্যের শাসকদল। বিশেষ করে মালদহের কালিয়াচক, হাওড়ার ধুলাগড়ের মতো কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জেরে তলে তলে মানুষ শাসকের উপর ফুসছিল। পাশাপাশি বঙ্গের গেরুয়া বাহিনীর শক্তি বাড়াচ্ছিল। যা সত্যিই চিন্তার কারণ হয়েছিল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। যেন তেন প্রকারণে গেরুয়া শিবিরের এই শক্তিকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে, আগামী পঞ্চায়েত ভোটে বেশ বেগ পেতে হতে পারে মুকুল-মমতার তৃণমূল কংগ্রসকে। এটা খুব ভালো করেই জানেন কাঁচরাপাড়ার ‘পাকা’ রাজনেতা মুকুল রায়। তৃণমূলের সেনাপতি হওয়ার সুবাদে তাঁরই উপর বর্তায় দলকে রক্ষা করার দায়িত্ব।

আরও পড়ুন: মুকুল রায়ের নতুন দলের নাম কি জাতীয়তাবাদী তৃণমূল কংগ্রেস?

২০১১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে পর্যন্ত দলের এক্কেবারে নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তা নিজে পরখ করে দেখেছি কেশপুর, গড়বেতা, চম্পাইতলা, পিংলা, ঝাড়গ্রাম, ভগবানপুর, খেজুরি, ময়নার মতো রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রবণ এলাকায় গিয়ে। সেখানকার অতি সাধারণ কর্মীর কাছেও ছিল মমতার ব্যক্তিগত ফোন নম্বর। তারা সরাসরি কথা বলতে পারতেন দলের নেত্রীর সঙ্গে।

কিন্তু, ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটের পর তৃণমূলের জয়জয়কারে বাংলার মসনদের মাথায় বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর রাজ্যের সেইসব নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করেছেন দলের সেনাপতি মুকুল রায়। স্বাভাবিকভাবেই মুকুলের উপরই ভরসা বেড়ে গিয়েছিল বাংলার প্রত্যন্ত এলাকার নেতা-কর্মী-সমর্থকদের। এমনও দেখেছি কোন এক অখ্যাত গ্রামের নেতার নাম বলে দিতে পারেন মুকুল রায়। তাই তিনি যতই তৃণমূল ছেড়ে দিন না কেন, তৃণমূলের জিওনকাঠি কিন্তু এখনও কাঁচরাপাড়ার ‘পাকা’ রাজনেতার হাতের তালুতেই আছে। এটাও ভালো করেই জানেন মমতা-পার্থরা। তাই আচমকা বলা নেই, কওয়া নেই মুকুলের এই দল ছাড়ার পিছনে তৃণমূল কংগ্রেসকে রক্ষা করা নাটক ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না। প্রশ্ন কেন তিনি এই নাটক করতে চলেছেন?

আরও পড়ুন: মুকুল রায়ের সঙ্গে যেতে অনুগামীদের সামনে বাধা ‘ব্যক্তি স্বার্থ’

সারদা, নারদ কান্ডে তো রাজ্যের শাসকদল নাকানি-চুবানি খাচ্ছেন। একে একে দলের নেতারা জড়িয়ে পড়েছেন দুর্নীতির অভিযোগে। তালিকায় রয়েছেন মুকুল রায়ের মতো বড় মাথারাও। তার উপর গত বছরে দুর্গাপুজোর সময় থেকে কালিয়াচক-ধুলাগড়ের মতো ঘটনার জেরে রাজ্যে গেরুয়া বাহিনীর শক্তি বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন পঞ্চায়েত এবং আগামী লোকসভা-বিধানসভা ভোটে বেশ বেগ পেতে হবে শাসকদলকে। তাই এখন থেকে ঘর সামলাতে না পারলে তৃণমূলের সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে, তা ভালো করেই জানেন রাজ্যের তৃণমূলের ধারক-বাহকরা। এই পরিস্থিতিতে দরকার একটা ড্যামেজ কন্ট্রোল। আর তা যে মুকুল রায়ের পক্ষেই সম্ভব, তা এক কথায় স্বীকার করবেন রাজ্যের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

তাই বঙ্গভবনে দিদির হাতে চিকেন খাওয়ার পর এমন কোন বড় ঘটনা ঘটেনি যে, মুকুল রায়কে তৃণমূল ছাড়তে হবে। তাই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘটনাকে সাদাচোখে মেনে নিলে হবে না। আর এটা মোটেই একটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। রীতিমতো পরিকল্পিত চিত্রনাট্য ধরেই এগোচ্ছে মুকুলের বিজেপিতে গা ভাসানোর নাটক। রাজ্যে বিজেপির বাড়-বাড়ন্ত ঠেকাতে হলে এবং তৃণমূলের রাজত্ব কায়েম রাখতে হলে বঙ্গের শক্ত গেরুয়া মাটি ঘেঁটে দেওয়া ছাড়া আরও কোন দ্বিতীয় পথ খোলা নেই ঘাসফুলের ধারক-বাহকদের। আর সেই কাজটাই করছেন তৃণমূলের যোগ্য সেনাপতি মুকুল রায়। আর পিছনেও কিছু কারণ আছে।

আরও পড়ুন: মুকুল রায় গদ্দার : পার্থ চট্টোপাধ্যায়

নয়াদিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে দলের রাজ্যসভার পদ ছাড়ার ঘোষণার দিন মুকুলের কিছু বাণীতেই তা স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর কথায়, রাজ্যের সারদা কেলেঙ্কারির সঙ্গে তিনি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনভাবেই জড়িত নন। পাশাপাশি, সারদা-নারদ কান্ডে কোনভাবেই তৃণমূল কংগ্রেস জড়়িত নয়। একজন আম জনতা হিসেবে প্রশ্ন করতেই হয়, সারদা কর্তার সুদীপ্ত সেনের সঙ্গের দার্জিলিংয়ের ডেলো পাহাড়ের মিটিংটা কেন হয়েছিল? তা প্রকাশ্যে জানাতে পারবেন মুকুলবাবু? এর পরেও বলবেন তিনি সারদা কান্ডে জড়িত নয়?

নারদকান্ডে মুকুল রায়ের হয়ে টাকা নিয়েছেন প্রোমোটি আইপিএস এস এম এইচত মির্জা। ভিডিও ফুটেজে একথা স্পষ্ট করে বলেছেন মির্জা সাহেব। প্রশ্ন, মির্জা সাহেবের ঘাড়ে কথা মাথা আছে, তিনি শাসকদলে সেকেন্ড ইন কমান্ডের নাম মুখে আনবেন? যদিও সবটাই তদন্ত এবং বিচারে পরেই স্পষ্ট হবে। তবে এটা বলা যেতেই পারে, দলের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলেন দলের নেত্রী এবং দলকে দুর্নীতি প্রসঙ্গে রীতিমতো ক্লিনচিট দিয়েছে মুকুল রায়। রাজনীতিতে সবই সম্ভব হয়। দল ছাড়ার পর সেই দল খারাপ হয়ে যায়, তা বিগতদিনে বহু নেতার ক্ষেত্রেই হয়েছে। তবে, দলের প্রতি মন-প্রাণ পড়ে থাকলে ত্যাগ করা দলকে কেউ কলুষিত করতে চাননি। আর সেটাই দেখা গেল মুকুল রায়ের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে একটা বিষয় খুব অবাক করেছে, মুকুলের এই দল বদল সম্পর্কে তৃণমূলনেত্রী একটি শব্দও খরচ করেননি। এটাই সব থেকে বড় তাজ্জবের।

আরও পড়ুন: অমিতাভর মৃত্যুতে রাজ্য সরকারকে দায়ী করলেন মুকুল রায়

প্রকৃতপক্ষে আসন্ন পঞ্চায়েত এবং আগামী লোকসভা-বিধানসভা ভোটে বিজেপির বাড়-বাড়ন্ত ঠেকাতেই সম্ভবত এই দলত্যাগের নাটক করে চলেছেন মুকুল রায়। নারদ-সারদা কেলেঙ্কারি থেকে নিজেকে বাঁচাতে এবং দলকে রক্ষা করতেই তিনি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে চলেছে।

এক কথায় বলা যেতে পারে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতেই তিনি এখন গায়ে গেরুয়া নাবাবলি চড়াতে চাইছেন। অমিত শাহদের কোনওভাবে বুঝিয়ে বাংলার গেরুয়া বাহিনীর মাথায় বসতে পারলে আর কিছু না হোক শক্তি বেড়ে চলা বিজেপির সংগঠনকে ঘেঁটে দেওয়া খুবই সহজ হবে। নারদ-সারদা কেলেঙ্কারি থেকে দলকে দূরেও সরিয়ে রাখা যাবে। তাই, এখন বিজেপিতে যোগ দিতে বার বার দিল্লি ছুটে যাচ্ছেন মুকুল রায়। হয়তো সব মিটে যাওয়ার পর আবার দেখা যেতেই পারে যে, দিল্লির বঙ্গ ভবনে আরও এক প্লেট চিকেন কষা খেয়ে তৃণমূলের সঙ্গে ভাব করে নিচ্ছেন কাঁচরাপাড়ার ‘পাকা’ রাজনেতা মুকুল রায়।

Advertisement
---