মুকুলের ‘কারসাজিতেই’ আর্থিক কেলেঙ্কারিতে নাম জড়াল অভিষেকের?

বিজয় রায়, কলকাতা: বড়সড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে তৃণমূল সাংসদ তথা তৃণমূল নেত্রীর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম জড়াতেই উজ্জীবিত মুকুল রায় শিবির। মুকুল ঘনিষ্ঠ এক বিধায়কের কথায়, ‘রাজনীতির ব্যাকরণে এখনও অনেকটাই শিশু অভিষেক।’ হুগলির ওই বিধায়কের এহেন মন্তব্যই জন্ম দিয়েছে যাবতীয় রহস্যের। মুকুলের ‘কারসাজিতেই’ আর্থিক কেলেঙ্কারিতে নাম জড়াল অভিষেকের? তৃণমূল দলের মধ্যেই উঠছে প্রশ্ন৷

‘কমিশনগেট’ আর্থিক কেলেঙ্কারিতে নাম জড়াল মমতার ভাইপো অভিষেকের

প্রশ্ন উঠছে, অভিষেকের পর্দা ফাঁসেও কি দলের অন্তর্ঘাত? বিশেষ করে এর পিছনে কি মুকুল শিবিরের হাত রয়েছে? যদি তা নাই হয়, তাহলে প্রায় আট বছর আগের একটা ঘটনা এখন প্রকাশ্যে এল কি করে? আর এর জন্যই দলের একটা বড় অংশ মনে করছে, অভিষেকের কীর্তি ফাঁসের পেছনে বড় ভূমিকা থাকতে পারে তাঁর একসময়ের ‘রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু’ মুকুল রায়ের। কারণ অভিষেকের উত্থানে দলে একেবারে কোণঠাসা মুকুল। ২১ শে জুলাইয়ের মঞ্চে মাইক হাতে একটা কথাও বলার সুযোগ পান নি একসময়ের তৃণমূলের ২ নম্বর৷ তাই অভিষেকের ফাঁসার ফিছনে মুকুলের হাত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না দলের অধিকাংশ নেতা। যদিও এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি মুকুল রায়ের। তৃণমূলের কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজী নয় এই বিষয় নিয়ে৷

- Advertisement -

সোমবার সর্বভারতীয় এক ইংরেজি চ্যানেল একটি চাঞ্চল্যকর খবর পেশ করে। দাবি করা হয়, প্রায় আট বছর আগে খুন ও তোলাবাজির অভিযোগে বিচারাধীন মাফিয়া রাজকিশোর মোদীর থেকে কোটি টাকার বেশি কমিশন নিয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এতদিন সেই খবর আড়ালে থাকলেও নতুন করে তা প্রকাশ পাওয়ায় বিতর্ক আরও জোরাল হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এত বড় একটা কেলেঙ্কারির খবর এতদিন ধামাচাপা থাকলেও হঠাৎ করে কি করে তা প্রকাশ্যে এল? বিতর্ক আরও উস্কে দিয়েছেন শাসক দলের হুগলির এক বিধায়ক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বিধায়কের দাবি, রাজনীতির ব্যাকরণে মুকুল রায়ের কাছে এখনও অনেক কাঁচা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শিশু অভিষেকের একসময়ের শিক্ষাগুরু ছিলেন মুকুল রায়। আজ তাকেই দলের একাধিক বিষয়ে ব্রাত্য রাখা হচ্ছে। হুগলির এই বিধায়ক, মুকুল ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। ফলে তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এই বিষয়ে ওই বিধায়ককে প্রশ্ন করতেই তার জবাব, ‘ মুকুল রায় জড়িত কি না সেটা তাঁকেই প্রশ্ন করুন’।

সততা থাকলে অভিষেকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিশন করুক মমতা: কুণাল

তবে শুধু এই বিধায়ক নয়। মুকুল ঘনিষ্ঠ এক ছাত্র নেতাও রীতিমতো উজ্জীবিত। তাঁর মতে, অহংকার হলে পতন ও হবে। এটাই কালের নিয়ম। এই প্রসঙ্গে ওই ছাত্রনেতা ২১শে জুলাই শহিদ সমাবেশের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই দিন মুকুল রায়কে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি। দলে ক্রমাগত নিজের দাপট দেখিয়ে চলেছেন অভিষেক। তার একটাই পরিচয়, তিনি তৃণমূল নেত্রীর ভাইপো। আর তাই, অহংকার হয়েছে খুব।

যদিও এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি মুকুল রায়ের বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বর্তমানে সংসদে বাদল অধিবেশন চলছে। এই সময় দিল্লিতে আছেন এক সময়ের তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড ইন কমান্ড। তাঁর দুটি নম্বরে ফোন করা হলে একটি সুইচড অফ এবং অন্যটি রিং হিয়ে গেলেও রিসিভ করেননি তিনি। একদিকে বিধায়কের মন্তব্য, অন্যদিকে ওই ছাত্র নেতার এহেন শব্দ প্রয়োগ বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দিল খোদ মুকুল রায়ের প্রতিক্রিয়া না মেলায়।

তবে বিষয়টিকে স্রেফ জল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে নারাজ দলের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা। তিনি আবার দক্ষিণ কলকাতার একটি কেন্দ্রের বিধায়ক। এদিন প্রথমে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে না চাইলেও পরে ওই নেতা বলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে যেদিন থেকে তৃণমূল নেত্রী সামনের সারিতে নিয়ে এসেছেন তারপর থেকেই একের পর এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। বিরোধীদের সঙ্গে দলের একটা অংশ যে হাত মিলিয়েছে তা একেবারেই ফেলে দেওয়া যাবে না। তবে দলের অন্তর্ঘাত প্রমাণ হলে কি অভিযুক্ত নেতাকে চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়া হবে ? এই প্রশ্নের জবাবে ওই নেতার বক্তব্য, এই অভিযোগ যদি সত্যি প্রমাণিত হয় তাহলে ও দলের তেমন ভাবে কিছু করার থাকবে না। এই বিষয়ে তার ব্যাখ্যা, ইতিমধ্যেই একাধিক ইস্যুতে দলে সমস্যা রয়েছে। এমন কোনও করা শাস্তি নিতে গেলে পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে দলে ভাঙ্গন দেখা দিতে পারে। যা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য মোটেই সমীচীন নয়।

সবমিলিয়ে দলের মুখ হিসাবে তুলে ধরা অভিষেকের আর্থিক কেলেঙ্কারীর অভিযোগে এই ভাবে ফেঁসে যাওয়ায় চরম অস্বস্তিতে রাজ্যের শাসক দল৷ বিরোধীরা এই ইস্যুকে নিজেদের হাতিয়ার করবেই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ সারদা নারদে ইতিমধ্যেই ফেঁসে দলের তাবড় নেতারা৷ এরপর, এই মূহুর্তে দলের দুই নম্বর এইভাবে ফেঁসে যাওয়ায় তৃণমূল কি ভাবে এর প্রতিবাদ করে সেটাই এখন দেখার৷ মুকুল শিবির আর অভিষেক শিবিরকে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি ভাবে সামলান তার উপরই কিন্তু তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল৷

Advertisement
---