রাজ্য সভাপতি হিসেবে দিলীপকেই চান মুকুল রায়

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: দিলীপ ঘোষকেই রাজ্য সভাপতি হিসেবে দেখতে চাইছেন মুকল রায়৷ বিশ্বাস করতে অসুবিধা হলেও রাজ্য বিজেপির অন্দরমহলে অধিকাংশ নেতাই ‘অবিশ্বাস্য’ এই তথ্যকে আগলে ধরতে চাইছেন৷ কারণ দলের রাজ্য পার্টির সভাপতির চেয়ারে দিলীপ ছাড়া অন্য কোনও চেহারা কল্পনা করা তাঁদের পক্ষে কঠিন কাজ৷ শনিবার রাত পর্যন্ত রাজ্য বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের ‘সেভাবে’ দলে কোনও পদ নেই৷ কিন্তু নির্বাচন ঘোষণা হলেই বিজেপি‘চাতক পাখীর’মতে তাকিয়ে থাকে মুকুল দিকে৷ বড়-ছোট যেকোনও ভোট, পঞ্চায়েত বা উপনির্বাচন, রাজ্য বিজেপির ‘মুশকিল আসান’ মুকুল রায়৷

অন্যদিকে রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ তাঁর দলের নেতৃত্বের কাছে ভালোবাসার মানুষ৷ দলের অন্য পদাধিকারীদের তিনি বড় দাদার মতো আগলে রেখেছেন৷ সমস্থ ঝড়-ঝঞ্ঝা নিজেই সামলান৷ কিন্তু ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেনের অফিসের বাইরে সারা রাজ্যে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার জেরে তিনি পার্টিকে ভোটে জেতাতে পারবেন, জোর দিয়ে একথা বলতে পারবেন না দিলীপের অতি স্বজনও৷

তৃণমূল কংগ্রেস ফেরৎ মুকুল রায় গত বছরে বিজেপিতে এসেছেন৷ সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বিক্ষুদ্ধ তৃণমূলের নেতা-কর্মীসহ বড়মাপের জনসমর্থন৷ এই কয়েক মাস তিনি কী করেছেন, তা নিয়ে ছবির-বইও প্রকাশ করেছেন মুকুল৷ তিনি দলে যোগ দেওয়ার পর এখনও পর্যন্ত কোনও বিধানসভা বা লোকসভা উপনির্বাচনে জেতেনি বিজেপি৷ কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজেপির ভোট বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে৷ সদ্য সমাপ্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ‘কামাল’করেছেন মুকুল৷ কংগ্রেস-বামফ্রন্টকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে গ্রাম বাংলায় প্রধান বিরোধী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন বিজেপি৷ শাসকদলের ‘মেশিনারি’সেখানে বেশি কাজে আসেনি৷ রাজ্য বিজেপিতে মুকুলের এক অনুগামীর কথায়, ‘‘জঙ্গলমহলে বিজেপির ফলাফলটা দেখুন৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাঁদিয়ে ছেড়েছেন মুকুলদা৷ মুখ্যমন্ত্রী এখন জঙ্গলমহলকে সহজে হাসতে দেখবেন না৷’’

পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে মুকুল রায়কে পার্টির পঞ্চায়েত নির্বাচন কমিটির আহ্বায়ক হয়৷ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁকে পঞ্চায়েতের দায়িত্ব দিয়ে যে কোনও ভুল করেনি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন মুকুল৷ খড়গপুর সদরের জয়ী প্রার্থী দিলীপ উত্তেজক বক্তব্য দিয়েই বিরোধীদের বিধতে ভালোবাসেন৷ সেকারণে তিনি বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছেন৷ কিন্তু নিজের সংগঠনের ক্ষমতায় পার্টিকে জেলায় জেলায় তিনি জেতাতে পারবেন কিনা তা নিয়ে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বেরই যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে৷

এক বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, ‘‘বিজেপিতে বড় পদে চাকরি করছেন মুকুল৷ পারফরম্যান্সই তার শেষ কথা৷ যে দলটা খাতায় কলমে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ছিল, কিন্তু নির্বাচনের মার্কশিটে যাদের দুরবীন দিয়ে দেখতে হত, সেই দলটাকেই এখানে প্রাসঙ্গিক বানিয়েছেন মুকুল৷ সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন মমতাকে৷ এখন বিজেপির ভেতর যদি কোনও ‘মিরজাফর’ না থাকে, তবে তৃণমূলের কপালে আগামী দিনে চরম দুঃখ আছে৷’’

পরিসংখ্যান বলছে, নভেম্বরে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে মুকুল রায় বিজেপিতে আসার পরই সবংয়ে উপনির্বাচন হয়েছে৷ তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী গীতারানি ভুঁইয়া ৬৪ হাজার ১৯২টি ভোট পেয়ে ওই কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন৷ সিপিএমের প্রার্থী ৪১ হাজার ৯৮৯টি ভোট এবং বিজেপির প্রার্থী ৩৭ হাজার ৪৮৩টি ভোট পেয়েছিলেন৷ ভোট গণনার শেষে দেখা যায়, বিজেপি প্রার্থী ২০১৬ সালের ২.৬ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে নিতে পেরেছেন৷

এর পর গত জানুয়ারিতে উলুবেড়িয়া লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী অনুপম মল্লিক দুই লক্ষ ৯৩ হাজার ভোট পেয়েছিলেন ৷ ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী এই কেন্দ্র থেকেই এক লক্ষ ৩৭ হাজার ভোট পেয়েছিলেন ৷ অনুপম মল্লিক বিজেপির ভোট বাড়িয়েছেন দুই গুণেরও বেশি৷ ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে যদি অনুপম মল্লিকের প্রাপ্ত ভোটের ফলাফল হিসাব করা যায়, তবে দেখা যাবে যে বিজেপির ভোট বেড়েছে ৬০০ শতাংশ ৷ ২০০৯-এ ওই কেন্দ্রে বিজেপি ভোট পেয়েছিল মাত্র ৪২ হাজার ৪৪৩ টি৷

জানুয়ারিতে একই সঙ্গে নোয়াপাড়া বিধানসভার উপনির্বাচন হয়েছিল৷ বিজেপি প্রার্থী সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৮ হাজার ৭১১ টি ভোট পেয়েছেন ৷ ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী মাত্র ২৩ হাজার ৫৭৯ টি ভোট পেয়েছিলেন ৷ ২০১১ সালের নির্বাচনেও নোয়াপাড়া থেকে ৭,৫৯৪ টি ভোট পেয়েছিল বিজেপি প্রার্থী ৷ ২০১১ সালের প্রাপ্ত ভোটের ফলাফল এবং ২০১৮ উপনির্বাচনে সন্দীপের পাওয়া ভোটের বিশ্লেষণ দেখা গিয়েছে ওই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট বেড়েছে ৪০০ শতাংশ ৷

উপরের এই পরিসংখ্যানগুলি সামনে রেখেই এগোতে চাইছে বিজেপির মুকুল শিবির৷ মুকুল ঘনিষ্ঠ অনেক নেতাই জানিয়েছেন, রাজ্যে বিজেপির কোনও সংগঠন ছিল না৷ মুকুল এসেই সংগঠন গড়ায় মন দিয়েছেন৷ অমিত শাহ তাঁকে বড় দায়িত্ব দিয়েছেন৷ পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের ফুল মুকুলই ফোটাবেন, তা বিশ্বাস করেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি৷ পঞ্চায়েত ভোটের আগে এক নেতা বলছিলেন, ‘‘অনেক জায়গায় বিজেপি কেন বাইক নিয়ে মিছিল করে জানেন … তৃণমূলের গুন্ডারা তাড়া করলে পালাতে সুবিধা হয়৷ এই দলের সংগঠন বাড়াতেই হবে৷ পঞ্চায়েত ভোটই হবে বড় পরীক্ষা৷ ইতিমধ্যেই দাদার (মুকুল রায়) ডাকে তৃণমূলের বহু ছেলে বিজেপিতে এসেছেন৷ প্রতিদিনই আসছেন৷ দেখবেন, কিছুদিনের মধ্যেই অংক বদলে যাবে৷ তবে চটজলদি পরিবর্তন আসে না৷’’ভোটের পর তার কথা কতটা সত্যি তা বজঝতে পারছে পার্টির নেতৃত্ব৷

মুকুলের সঙ্গে দিলীপের সম্পর্ক নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে কম চর্চা হয়নি৷ গত বছরের নভেম্বর মাসে বিজেপি যোগ দিয়েই দিলীপকে ‘ছোট ভাই’বলে সম্বোধন করেন মুকুল৷ বলেন, রাজ্যে তিনি দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বেই কাজ করতে চান৷ জাতীয় রাজনীতিতে অমিত শাহ তাঁর নেতা৷ জনুয়ারিতে একটি অনুষ্ঠানে দিলীপ ঘোষ ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট করেন৷ রাজ্য বিজেপির সভাপতি পার্টির কর্মীদের জানান, ‘‘মুকুলদা আপনাদের কথা অমিত শাহজি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কাছে পৌঁছে দিতে পারেন৷ আমার দৌড় বাংলা পর্যন্ত৷ বাংলার বাইরে আমি নেই৷’’মঞ্চে বসে তখন দিলীপের দিকে তাকিয়ে হাসছেন রাজ্য বিজেপির পদহীন নেতা মুকুল রায়৷

তবে দাদা-ভাইয়ের এই সৌজন্যতা খামখা ঝুঁকির মুখে পড়েছিল দিলীপেরই মন্তব্যেই৷ তিনি বলেছিলেন, যে সব লোকের কোথাও জায়গা নেই তারা বিজেপিতে আসতে চাইছে৷ বিজেপি ঠিক করবে কাকে নেওয়া হবে, কাকে নেওয়া হবে না৷ একজনকে নেওয়া হয়েছে৷ অনেকেরই দাবি, ওই একজন হলেন মুকুল রায়৷ জল্পনা বাড়তে থাকে, রাজ্যজুড়ে দলের কর্মীদের মধ্যেই আলোচনা শুরু হয়, “তৃণমূল থেকে আসা” মুকুল রায় এবং দিলীপ ঘোষের মধ্যে কি তাহলে কি ঠান্ডা লড়াই চলছে? রাজ্যের পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীর প্রচেষ্টা কি জলে গেল? পর্যবেক্ষক আগেই সাফ জানিয়েছেন, দিলীপ ঘোষই রাজ্য সভাপতি হিসেবে দল চালাবেন। এবষয়ে কোনও দ্বিমত নেই৷

নিয়ম অনুযায়ী রাজ্য সভাপতি তাঁর নিজের টিম সাজান৷ দলের মধ্যে জনপ্রিয় ‘দিলীপদা’নাকি মুকুলকে পছন্দই করেননি৷ মুকুলও কেন্দ্রীয় পার্টিকে দিলীপের বিরুদ্ধে নানা কথা বলেছেন, দিলীপের জায়গায় অন্য লোক সভাপতি হোক, মুকুল নাকি তাই চান৷ জল্পনা ছড়াতে থাকে এদিক থেকে ওদিক৷ এর মাসেই নতুন বিজেপি সভাপতি হিসেবে উঠে এসেছে – আশিস সরকার, শমিক ভট্টাচার্য বা বিধান করের নাম৷ কিন্তু প্রাক্তণ রেলমন্ত্রী মুকুলের কাছে লোক যাঁরা, তাঁরা কিন্তু উলটো কথা বলছেন৷ এক মুকুল ঘনিষ্ঠের কথায়, ‘‘দাদা বিজেপিতে বড় পদ পাবেন খুব তাড়াতাড়ি৷ আর যেনে রাখুন, দাদা দিলীপ ঘোষকেই চান৷ রাজ্য সভাপতির পরিবর্তন চাননা৷’’

----
-----