জঙ্গি নিকেশ করা আর্মি মেজরের বিরুদ্ধে খুনের মামলা ভারতেই সম্ভব

মানব গুহ, কলকাতা: পৃথিবীর আর কোথাও এটা সম্ভব নয়৷ সত্যি, এটা ভারতেই সম্ভব!! হাঁ, শুধুমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ ভারতেই সম্ভব৷ এটা শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক ভারতেই সম্ভব৷ জঙ্গিদের হাত থেকে ভারতবাসীকে বাঁচাতে গিয়ে দফা ৩০২ এ খুনের মামলায় আসামী এক ভারতীয় সেনার মেজর৷

জঙ্গি ধরতে জীবন বাজি রেখে অপারেশনে যাওয়া সেনাবাহিনীর দিকে পাথর ছুঁড়বে ওরা৷ সেনাবাহিনীকে পাথর ছুঁড়ে কোনঠাসা করে জঙ্গিদের পালাতে সাহায্য করবে ওরা৷ সুযোগ পেলে পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে মেরেও ফেলবে ওরা৷ টাকা নিয়ে জঙ্গিদের মদত দেবে ওরা৷ তবু সেনা কিছু বলতে পারবে না৷ সেনা পাল্টা প্রতিরোধে গুলি চালালে সেটা খুনের সামিল হবে৷ একমাত্র ভারতেই এটা সম্ভব৷ নিজের ও নিজের সেনাদের জীবন রক্ষা করতে, দুষ্কৃতিদের পাথরছোঁড়া থেকে বাঁচতে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়ে আজ খুনের মামলায় আসামী ভারতের এক সেনা মেজর৷

২৭ শে জানুয়ারি জম্মু কাশ্মীরের সোপিয়ানে জঙ্গি অপারেশনে যাওয়া মেজর আদিত্য কুমার ও তাঁর ১০ গারওয়াল রাইফেলস সেনা ইউনিটকে ঘিরে ধরে পাথর ছুঁড়ছিল একদল দুষ্কৃতি৷ বারবার নিষেধ করা সত্বেও তারা পাথর ছোঁড়া থামায় নি। এর ফলে পাথরের আঘাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে গুলি চালাতে বাধ্য হয় সেনা। এই ঘটনায় পাথর ছোঁড়া দুষ্কৃতিদের মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু হয়। জম্মু কাশ্মীর পুলিশ সোপিয়ানের এই ঘটনার জন্য ওই মেজর ও তাঁর গোটা সেনা ইউনিটের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ এনে দফা ৩০২ ধারায় এফ আই আর দায়ের করে।

- Advertisement -

তদন্তেও এটা পরিস্কার হয়ে যায়, জঙ্গি অপারেশনের সময় পাথর ছোঁড়ার হাত থেকে বাঁচতেই গুলি চালায় সেনা। কিন্তু তবু, পুলিশি অভিযোগ তোলা হয় নি। এরই বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হন ওই মেজরের বাবা প্রাক্তন লেফট্যানেন্ট কর্ণেল করমবীর সিং। সুপ্রিম কোর্টে পুলিশের এই অভিযোগের বিরুদ্ধে গত বৃহষ্পতিবার একটি পিটিশন দায়ের করে তিনি আপিল করেন যে, এই ক্ষেত্রে একজন সেনা অফিসারের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।

এই পিটিশনে আরও বলা হয়েছে যে, পুলিশ কখনই একজন আর্মি অফিসারের বিরুদ্ধে জম্মু কাশ্মীরে মামলা দায়ের করতে পারে না। কারণ, জম্মু কাশ্মীরে বিশেষ AFSPA আইন (The Armed Forces Special Powers Act) চালু আছে৷ এই আইনে সেনাকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া আছে৷ সেখানে পুলিশ একজন সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে না৷ তাহলে কি করে জম্মু কাশ্মীর পুলিশ একজন আর্মি অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারল, প্রশ্ন তোলা হয়েছে ওই পিটিশনে৷

পিটিশনে প্রাক্তন এই সেনা অফিসার বলেছেন, ‘ আমার ছেলে কাশ্মীরে তাঁর বাহিনীর সৈন্যদের রক্ষা করতেই গুলি চালানোর আদেশ দিয়েছিল৷ কারণ ওখানে সেনার উদ্দেশ্যে পাথর ছুঁড়ে তাঁদের কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছিল৷ বারবার বলা সত্বেও সেনার উদ্দেশ্যে পাথর ছোঁড়া বন্ধ হয় নি৷ নিরুপায় হয়েই গুলি চালাতে বাধ্য হয় সেনা’৷

সেনাবাহিনীর নিজস্ব তদন্তেও এই একই ঘটনার কথা উঠে এসেছে৷ বাধ্য হয়েই সেনার উদ্দেশ্যে পাথর যারা ছুঁড়ছিল তাদের দিকে গুলি চালাতে হয় সেনাকে৷ নিজেদের জীবন বাঁচাতেই সেনাকে গুলি চালাতে হয় বলে রিপোর্টে জানিয়েও দেওয়া হয়৷

তারপরেও ওই সেনা মেজর ও তাঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে পুলিশ কি করে মামলা দায়ের করে সেটা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন৷ আর এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতেই এবার সরাসরি নিজের মেজর ছেলের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দায়ের করেন ওই প্রাক্তন সেনা আধিকারিক৷

আপততঃ সবাইকে স্বস্তি দিয়ে, জম্মু কাশ্মীরে কর্মরত আর্মি মেজর আদিত্য কুমার ও তাঁর ১০ গারওয়াল রাইফেলস সেনা ইউনিটের বিরুদ্ধে খুনের মামলায় সোমবার স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট৷ ওই আর্মি অফিসারের বিরুদ্ধে এখনই কোন ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না বলেই নির্দেশ দিয়েছে দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালত৷ সোমবার মুখ্য বিচারপতি দীপক মিশ্র ও বিচারপতি এ এম খানিলকর ও বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচুড়ের ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়ে কেন্দ্র ও জম্মু কাশ্মীর সরকারের কাছে এই বিষয়ে সমস্ত রিপোর্ট তলব করেছে৷ তাই আপাততঃ লজ্জার হাত থেকে বাঁচল গোটা ভারত৷

জম্মু কাশ্মীর পুলিশ, ভারতের প্রাক্তন সেনানী লেফট্যানেন্ট কর্ণেল করমবীর সিং এর ছেলে মেজর আদিত্য কুমার ও তাঁর ১০ গারওয়াল রাইফেলস সেনা ইউনিটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত ৩ জন নাগরিককে গুলি চালিয়ে হত্যার অভিযোগ এনেছে। দফা ৩০২ ধারায় মেজর ও তাঁর ইউনিটের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে FIR করেছে জম্মু কাশ্মীরের পুলিশ৷ সেই কারণেই ছেলের পক্ষ নিয়ে বাবা নিজেই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হন৷ তৈরি হয় ভারতীয় ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়৷

সেনার তরফ থেকে ইতিমধ্যেই এই ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ জানানো হয়েছে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামণের কাছে। প্রাক্তন এক সেনাকর্তা, সেনাবাহিনীতে বর্তমানে কর্মরত নিজের মেজর ছেলের জন্য সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হচ্ছেন, এমন ঘটনা সাধারণতঃ দেখা যায় না। এই ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই সরগরম রাজধানীর রাজনীতি।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টে মুখ্য বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দিল যে, আপাততঃ ওই সেনা মেজরের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাই নিতে পারবে না জম্মু কাশ্মীরের পুলিশ৷ দফা ৩০২ ধারা যোগ করে যে FIR দায়ের হয়েছে তাতেও স্থগিতাদেশ দিয়েছে সর্ব্বোচ্চ আদালত৷ আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও জম্মু কাশ্মীর সরকারের কাছ থেকে রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছে দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালত৷

প্রাক্তন সেনাকর্তারা প্রত্যেকেই এই ইস্যুতে ওই আর্মি মেজরের পাশেই দাঁড়িয়েছেন৷ তাঁরাও অবাক কি করে জম্মু কাশ্মীর পুলিশ, এক সেনা মেজর ও তাঁর পুরো ইউনিটের বিরুদ্ধে দফা ৩০২ ধারায় খুনের অভিযোগ আনতে পারে !! সেনাবাহিনীর মনোবল শেষ করে দেবার পক্ষে এই ঘটনা যথেষ্ট।

জঙ্গি নিকেশ করতে যাওয়া সেনার বিরুদ্ধে পাথর ছোঁড়াটা যদি দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র না হয়, তাহলে কি ? সেনার বিরুদ্ধে যারা পাথর ছুঁড়ছে তারা যদি দেশদ্রোহী না হয় তাহলে কারা দেশদ্রোহী? তাদের বিরুদ্ধে গুলি চালানোটা কেন খুনের বিষয় হিসাবে দেখা হবে? সর্বস্তরে উঠছে প্রশ্ন৷ দেখার বিষয় এটাই যে, সেনার উদ্দেশ্যে পাথর ছোঁড়া ও তা থেকে বাঁচতে ভারতীয় সেনার গুলি চালান নিয়ে কি রায় দেয় দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালত। হাঁ, এটা ভারতেই সম্ভব৷ শুধুমাত্র ভারতে৷ সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ !!

Advertisement ---
---
-----