‘১৪ মার্চে নিহতদের সম্মান আমরা রাখতে পারলাম না’

২০০৭-এর ১৪ মার্চ৷ ১৪ জন মানুষের মৃত্যু৷ কিন্তু, কেমন আছে নন্দীগ্রাম? ১১ বছর পরে? কেমন আছে এখন নন্দীগ্রাম, সেই সময়ের প্রতিবাদীদের চোখে? তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানলেন kolkata24x7.com-এর প্রতিনিধি অরুনাভ রাহারায়

শাঁওলী মিত্র
সেই সময় পর পর কয়েকবার গিয়েছিলাম নন্দীগ্রামে। এখন আর যাওয়া হয় না। তবে শুনেছি সেখানকার মানুষেরা এখন ভালো আছেন। তখন ভয়াবহ সময় ছিল। নিজের চোখে দেখেছি। এমনকী দুষ্কৃতীরা আমাদের উপরে চড়াও হয়েছিল। আজ শুভ পরিবর্তন ঘটেছে বলে আনন্দ হয়।

তবে ১৪ মার্চ আমার কাছে একটা ‘কালো দিন’ হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ২০০৭-এর ২১ মার্চ আমরা কয়েকজন গিয়েছিলাম নন্দীগ্রামে, সেখানকার মানুষদের পাশে দাঁড়াতে। প্রচুর সভা করেছি সেখানে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে উত্তর জানতে চেয়ে আমরা একটা চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও উত্তর পাইনি। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমাদের সঙ্গে দেখাও করেননি। পরে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছিলাম। নন্দীগ্রামের মানুষদের জন্য সেই সময়ের বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা কোনও দিন ভোলার নয়।

- Advertisement -

জয় গোস্বামী
নন্দীগ্রামে যে গণহত্যা হয়েছিল তাঁর পিছনে তৎকালীন সরকারের সমর্থন ছিল এবং সেখানে নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছিল। সেই ঘটনা বাংলার ইতিহাসে অত্যন্ত দুর্দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এর পর অনেক মানুষ প্রতিবাদে পথে নেমেছিল। আমাদের প্রতিবাদ সফল হয়েছিল। কারণ, পরবর্তী নির্বাচনে তৎকালীন সরকারের পতন হয়।

শুভাপ্রসন্ন
আমরা সাধারণ মানুষ, একটু আধটু সংবেদনশীল। নন্দীগ্রামের সাংঘাতিক ঘটনা আমদের প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল। কিন্তু আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারিনি। প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম। মিছিল করেছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম ঘাতক সরকার চলে যাক। যাতে কৃষকরা হাসি মুখে বেঁচে থাকতে পারেন। অসংখ্য শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিনেতা-অভিনেত্রী আমাদের সঙ্গে শামিল হয়েছিলেন। আমাদের উৎসাহদাত্রী ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।

নন্দীগ্রামের মানুষদের এখন কোনও ভয় নেই। এখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে নন্দীগ্রামে। রাস্তাঘাট কতটা ভালো হয়েছে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সরকার অত্যাচারী হয়ে পড়েছিল সেই সময়। সাধারণ মানুষ একত্র হয়ে, প্রতিবাদী হয়ে ঘাতক সরকারকে তাড়িয়ে দেয়। তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী এই পৈশাচিক ঘটনাকে বলেছিলেন ‘হাড় হিম করা সময়’। এখন সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারের পরিবর্তন ঘটেছে। কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে।

কৌশিক সেন
নন্দীগ্রাম আন্দোলনে শামিল হয়েছিলাম বলে আমি গর্বিত। যে তাড়না থেকে যুক্ত হয়েছিলাম আন্দোলনে, এখন সেই তাড়না হারিয়ে গিয়েছে। কারণ আমার মনে হয় গোটা পশ্চিমবঙ্গটাই এখন নন্দীগ্রামে পরিণত হয়েছে। আজ জয়নগরে যা ঘটছে, আজ বাসন্তীতে যা যা ঘটছে, সে সব দেখে মনে হয় আমি এই পরিবর্তন চাইনি। আজকে যাঁরা শাসন ক্ষমতায় আছেন, তাঁরাও তো মাফিয়া, সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সরাসরি সমাজবিরোধীরা যুক্ত। স্রেফ গোষ্ঠীদন্দ্ব চলছে পশ্চিমবঙ্গে। তার সুযোগ নিচ্ছে বিজেপি।

নন্দীগ্রামে যাঁরা গুলি খেয়েছিলেন, তাঁরা কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসবে বলে গুলি খাননি৷ এখন বিপদ হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও বিরোধিতা করা যায় না। প্রতিবাদ করার জন্য তখন আমাদের নিরপেক্ষ একটা স্পেস ছিল। এখন আর নেই। কারণ আমাদের সঙ্গে যাঁরা নন্দীগ্রামে গিয়েছিলেন সেই সময়, তাঁদের অনেকেই এখন বিভিন্ন সরকারি পদ পেয়েছেন। ২০০৭-এর ১৪ মার্চ নিহত গরিব মানুষদের সম্মান আমরা রাখতে পারলাম না বলে খারাপ লাগে।

Advertisement ---
---
-----