আমাদের অনেকেরই শৈশব, কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঁটুল দি গ্রেট, নন্টে-ফন্টে কিংবা হাঁদা-ভোঁদা৷হাওড়ার শিবপুরে ৮ বাই ৯-এর একটি ঘরে কালজয়ী কমিকস চরিত্রগুলির স্রষ্টা নব্বই ছোঁয়া নারায়ণ দেবনাথের সঙ্গে কথা বললেন কলকাতা 24×7-এর প্রতিনিধি দেবযানী সরকার

Advertisement

এ বছর বইমেলায় গিয়েছিলেন?
নারায়ণ দেবনাথ:  হ্যাঁ৷বইমেলার শেষ দিনে প্রকাশকরাই জোর করে নিয়ে গেলেন৷আমার এখন আর বইমেলায় যেতে ভালো লাগে না৷এখন বইমেলার অনেক পরিবর্তন হয়েছে৷অনেকের হাতই ফাঁকা থাকে৷বইয়ের প্যাকেট দেখি না৷অধিকাংশই খেতে আর ঘুরতে ব্যস্ত থাকে৷তবে এ বছর বইমেলায় আমার একটা প্রাপ্তি হয়েছে৷একজন নতুন লেখক আমাকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন৷আমাকে দেখতে পেয়েই তিনি আমার হাতে সেই বই দিয়েছেন৷

বইমেলার আয়োজকরা তো বলছেন এ বছর বই বিক্রি ভালো হয়েছে৷ নতুন প্রজন্ম বইমেলায় গিয়ে বই কিনছে৷
নারায়ণ দেবনাথ: এ তো ভালো কথা৷অবশ্য আমার কমিকসগুলি যে প্রকাশকরা ছাপান তাঁরা তো বলেন  সারা বছর সেগুলির চাহিদা থাকে৷এটা আমাকে খুব আনন্দ দেয়৷

অবসরে কী করেন?
নারায়ণ দেবনাথ: অবসর! সেটা আবার কী? আমার কোনও অবসর নেই৷ বাঁটুল, নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদা এবং কৌশিকের অ্যাডভেঞ্চারের নতুন গল্পের প্লট ভাবতে আর ড্রয়িং করতেই তো সময় চলে যায়৷‘শুকতারা’ এবং ‘কিশোর ভারতী’তে প্রত্যেক মাসেই নতুন নতুন কমিকস বের হয়৷সকাল ১১টা থেকে আমার কাজ শুরু হয়, চলে দেড়টা পর্যন্ত৷ খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার চারটে থেকে শুরু করি, ওই নটা পর্যন্ত কাজ চলে৷fantasy-batul

বাঁটুল, নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদার মতো কমিকস কোনও চরিত্র এখন নতুন করে মাথায় আসে?
নারায়ণ দেবনাথ:  (একটু হেসে) না৷ এখন নতুন করে কিছু ভাবতে পারি না৷

কত বছর বয়সে আপনার ছবি আঁকার হাতেখড়ি?
নারায়ণ দেবনাথ:  সেইভাবে কিছু মনে পড়ে না৷ কারণ আমি ছোট থেকেই হাতের সামনে কোনও ছবি দেখলে সেটাই আঁকতে বসে যেতাম৷আমার পরিবারে আঁকার একটা চল ছিল৷আমাদের স্বর্ণ অলঙ্কার তৈরির ব্যবসা ছিল৷আমার কাকা সোনার তাগার খুব সুন্দর ডিজাইন করতেন৷

তাহলে আঁকার পিছনে কাকাই কি আপনার অনুপ্রেরণা?
নারায়ণ দেবনাথ: হ্যাঁ, সেটা কিছুটা হলেও ঠিক৷

কমিকস চরিত্রগুলি কীভাবে মাথায় আসে? এক-একটি প্লট সৃষ্টি করতে আপনার কত দিন সময় লাগে?
নারায়ণ দেবনাথ: আগে তো আমি কলেজ স্ট্রিটের বহু প্রকাশকের বহু বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিয়েছি৷এমনই একদিন দেব সাহিত্য কুটীর আমাকে কমিকস চরিত্র বানানোর প্রস্তাবটা দেয়৷ আমি তৎক্ষণাৎ অ্যাকসেপ্ট করি৷
আগে এক-একটি প্লট চারদিনের মধ্যে তৈরি করে ফেলতাম৷ এখন আট-ন’ দিন লাগে৷

পাঠক আপনার কমিকস চরিত্রগুলি গ্রহণ করবে কি না, সেটা ভেবে কি গোড়ায় কোনও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল?
নারায়ণ দেবনাথ: নাঃ৷ আমি ভাবিনি, আমার কাজ কে কীভাবে নেবে৷আমি শুধু নিজের আনন্দের জন্যই কাজটা করতাম৷

আপনার শৈশব সম্পর্কে কিছু বলুন৷
নারায়ণ দেবনাথ: শৈশব খুব ভালোই কেটেছে৷আমার জ্যাঠামশাই পূর্ব বাংলায় থাকতেন৷ তাঁর বাড়িতে যাওয়াটা আমাদের কাছে একটা উৎসবের মতো ছিল৷
ছবি আঁকার ব্যাপারে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল, সেটা একটু বড় বেলায়৷ আঁকাআঁকিতে আমার আগ্রহ ছিল বলে বাড়িতে ঠিক হয়, আমাকে ইন্ডিয়ান আর্ট  কলেজে ভরতি করা হবে৷আমাদের প্রতিবেশীর পরিচিত একজনের সঙ্গে গিয়ে আমি আর্ট কলেজে ভরতি হলাম৷সে ওই কলেজেরই ছাত্র ছিল৷দুবছর পর জানতে পেরেছিলাম, সেটা একটা প্রাইভেট আর্ট কলেজ, ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজ নয়৷ যদিও তার কিছুদিন পর মৌলালির ওই আর্ট কলেজ ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে মিশে যায়৷যদিও আমি কোর্স শেষ হওয়ার এক বছর আগেই কলেজ ছেড়ে দিই৷

কিশোর সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বা প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে আপনার আলাপ ছিল? ওনাদের সম্পর্কে কিছু বলবেন?
নারায়ণ দেবনাথ: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ ছিল না৷ তবে প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর বাড়িতে একবার আমায় নিয়ে গিয়েছিলেন, একটা বইয়ের বিষয়ে৷ টেনিদা, ঘনাদা বহুবার পড়েছি৷খুব ভালো লাগত৷

অন্যান্য সাহিত্যিকের মধ্যে কাদের কথা মনে পড়ে?
নারায়ণ দেবনাথ: আমি তো বরাবরই বইয়ের পোকা৷ ছোটবেলায় বই পড়ার জন্য বাবার কাছে কত বকা খেয়েছি৷আমার গোয়েন্দা আর অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পড়তে বেশি ভালো লাগে৷ হেমেন্দ্র কুমার রায়ের “আবার যখের ধন” অনেকবার পড়েছি৷ সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের গোয়েন্দা কর্নেল নীলাদ্রি চৌধুরির গল্প পড়তেও খুব ভালো লাগে৷তবে ‘‘ব্যোমকেশ’ আমার সব চাইতে ফেভারিট৷

এখনকার সাহিত্যিকদের কারও বই পড়েন?
নারায়ণ দেবনাথ: নাঃ৷এখনকার  সাহিত্যিকদের লেখা আমি পড়ি না৷ কী রকম একটা দায়সারা গোছের৷ কোনও আকর্ষণ থাকে না৷

NARAYAN-DEBNATH-02বাংলা সাহিত্যে কমিকস চরিত্র বাঁটুল, নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদা কিংবা কৌতুক চরিত্র টেনিদা, ঘনাদার তো অনেক বয়স হল৷কিন্তু  এখনও এঁদের কোনও উত্তরসূরি পাওয়া গেল না৷ কী মনে হয়, এখনকার সাহিত্যিকদের কল্পনার পরিসর কি ছোট হয়ে গিয়েছে?
নারায়ণ দেবনাথ: আসলে এখন সব কিছুই খুব গতানুগতিক৷পুজো সংখ্যায় এখন এক একজন লেখকের তিনটে-চারটে করে লেখা বের হচ্ছে৷ সাহিত্যিকদের কল্পনা করার এখন সময় কোথায়? সুকুমার রায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আর হবে না৷

আর নারায়ণ দেবনাথ?
নারায়ণ দেবনাথ (একটু হেসে): তা আমি বলব কী করে? তা তো আমি জানি না৷

বাংলা কমিকস সাহিত্যে আরও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ময়ূখ চৌধুরী৷ কিন্তু এই প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির পরিচয়ের ঘটার তেমন সুযোগ মেলেনি৷
নারায়ণ দেবনাথ: আমার সঙ্গে ময়ূখের পরিচয় ছিল৷ও শুধু কমিকসের ভালো প্লট লিখত না, রিয়েলিস্টিক ছবিও খুব ভালো আঁকত৷মানুষ থেকে জন্তু-জানোয়ার, সব৷

কিছুদিন আগে আর কে লক্ষ্মণ মারা গেলেন…
নারায়ন দেবনাথ: হ্যাঁ৷উনি ছিলেন পলিটিক্যাল কার্টুনিস্ট৷সেই নেহরুর যুগ থেকে দেশের রাজনীতিই ছিল ওঁর মূল বিষয়৷

আচ্ছা, বিদেশি কোন কমিকস ক্যারেকটার আপনার ফেভারিট?
নারায়ণ দেবনাথ: টম অ্যান্ড জেরি৷আমি যখন মধ্যবয়সী, তখন ধর্মতলার মেট্রো সিনেমাহলে সিনেমা দেখতে যেতাম৷সিনেমা শুরু হওয়ার আগে টম অ্যান্ড জেরি দেখানো হত৷তখন থেকেই টম অ্যান্ড জেরির আমি ফ্যান৷

বিদেশি কমিকস সম্পর্কে এখন কোনও খোঁজ খবর রাখেন?
নারায়ণ দেবনাথ: না৷ এখন আর সেইভাবে রাখা হয় না৷

২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ সম্মান, ২০১৩-তে একইসঙ্গে বাংলা আকাদেমী পুরস্কার এবং বঙ্গবিভূষণ৷সম্মান কি একটু দেরিতে এল বলে মনে হয়?
নারায়ণ দেবনাথ: তা তো বটেই৷একটু তো নয়, অনেকটাই দেরি৷যখন সম্মান পেলাম তখন কোনও উদ্দীপনা ছিল না৷সঠিক সময়ে পাইনি তো, তাই৷ ৩৪-৩৫ বছরে লাল জমানায় বুদ্ধদেববাবুরা কি জানতেন না আমি আছি! নিশ্চয়ই জানতেন৷ কারণ, প্রতি দেড় মাস অন্তর ‘গণশক্তি’ থেকে আমায় ফোন করে জানতে চাওয়া হত, আমার ফোন নম্বর ঠিক আছে কি না৷কিন্তু মমতা আমার খোঁজ নেয়৷রাজনীতিক হিসেবে ও কেমন আমি বলতে পারব না, তবে ব্যক্তি হিসেবে ওকে আমার ভালো লাগে৷রাজনীতিতে কেউ-ই ধোয়া তুলসীপাতা নয়৷

৯০-এ পা রেখে জীবনে কিছু না পাওয়ার আক্ষেপ রয়ে গেল কি?
নারায়ণ দেবনাথ: বাংলা সাহিত্যে কমিকসকে সেইভাবে মর্যাদা দেওয়া হয়নি৷শুনেছিলাম মধ্যশিক্ষা পর্ষদ নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করবে৷ কিন্তু পরে খবরের কাগজে পড়েছি, সুনন্দ সান্যাল বলেছিলেন, ‘নারায়ণবাবুর লেখা পড়েছি, ভালো, কিন্তু পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার মতো নয়৷’ আরও অনেকেই একই মত পোষণ করেছিলেন৷তখন খুব খারাপ লেগেছিল৷জীবনে অনেক তাচ্ছিল্য পেয়েছি৷তবে সেই সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে অগণিত মানুষের ভালোবাসা৷

(সতর্কবার্তা: এই নিউজ পোর্টালের কোনও লেখা নকল করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ)

© 2013 kolkata24x7. All rights reserved.

----
--