বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র অনুরোধ সত্ত্বেও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এ বারও অর্থের বরাদ্দ হয়নি কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটে৷ তার উপর, সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা ক্ষেত্রকে বেসরকারীকরণের জন্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ এ বারের এই বাজেট৷ এবং, এ ভাবেই খোদ ডাক্তারদেরই তোপের সম্মুখীন এ বার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট৷

আরও পড়ুন: গরিব মানুষও হাঁটু প্রতিস্থাপন করাতে পারবেন বেসরকারি হাসপাতালে: বিজেপি

Advertisement

২০১৯-এ পরবর্তী লোকসভা নির্বাচন৷ এবং, আগামী বছরের এই নির্বাচনের প্রভাব যে এই বছর বর্তমান সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটের উপর পড়বে, তেমনই মনে করেছিলেন ওয়াকিবহাল মহলের বিভিন্ন অংশ৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ কোনও সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে যে সংস্কারের জন্য সাধারণত পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, তেমনও মনে করে ওয়াকিবহাল মহলের ওই সব অংশ৷ আর, এমনই পরিস্থিতির মধ্যে এ বারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা ক্ষেত্রে ২০১৮-’১৯ অর্থবর্ষের জন্য ১.৩৮ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ঘোষণা করেছেন৷ গত আর্থিক বছরে এই তিন ক্ষেত্রে বাজেটে বরাদ্দ হয়েছিল ১.২২ লক্ষ কোটি টাকা৷

আরও পড়ুন: কোন আতঙ্কে জেড নিরাপত্তা পাচ্ছেন অর্জুন সিং: বিজেপি

তবে, এই বছরের বাজেটে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ তুলনায় বেশি হলেও, হু-র অনুরোধ সত্ত্বেও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির মুখ্য উপদেষ্টা, ডাক্তার স্মরজিৎ জানা৷ তাঁর কথায়, ‘‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দেশের জিডিপির অন্তত পাঁচ শতাংশ অর্থ বাজেটে বরাদ্দ হওয়া উচিত৷ এই বিষয়ে গত বছরের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, এ বারের বাজেটে জিডিপির ২.৫ শতাংশের মতো অর্থ বরাদ্দ হতে পারে৷ কিন্তু, এ বছরও জিডিপির মাত্র এক শতাংশের মতো অর্থ বরাদ্দ হয়েছে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে৷ ১০-১২ বছর ধরে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এমনই কম পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে বাজেটে৷ এত কম অর্থ বরাদ্দের জন্য স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সেভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে না৷’’

আরও পড়ুন: অবাধ নির্বাচনের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী কেন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে? কমিশনে বিজেপি

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ডাক্তারদের সংগঠন সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক, ডাক্তার সজল বিশ্বাস বলেন, ‘‘বাজেটে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এত কম অর্থ বরাদ্দ হলে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় উন্নতি হতে পারে না৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এ বারের বাজেট সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা ক্ষেত্রকে বেসরকারীকরণের জন্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ৷ এই বাজেটের মাধ্যমে বিমা নির্ভর চিকিসা পরিষেবার ব্যবস্থা আরও পোক্ত করা হচ্ছে৷’’ কীভাবে? সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘‘ন্যাশনাল হেলথ প্রোটেকশন স্কিমে দেশের ১০ কোটি গরিব, অসহায় পরিবারের জন্য বছরে পাঁচ লক্ষ টাকার বিমার ব্যবস্থা করা হচ্ছে৷ বিমার প্রিমিয়াম এখন সরকার দিলেও, ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষকেই দিতে হতে পারে৷ তার উপর, থার্ড পার্টি হিসাবে বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে এই পাঁচ লক্ষ টাকার জন্য বিমার ব্যবস্থা করা হবে৷ এই ব্যবস্থায় দেশের গরিব, অসহায় মানুষ চিকিৎসার অধিকার হারাবেন৷’’

আরও পড়ুন: কমিশন নয়, পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটারদের উপরেই আস্থা বিজেপির

বাজেটের ঘোষণা অনুযায়ী, ন্যাশনাল হেলথ প্রোটেকশন স্কিমের অধীনে এই পাঁচ লক্ষ টাকার ব্যবস্থা করা হবে সেকেন্ডারি এবং টার্শিয়ারি লেবেলের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে৷ অথচ, এ রাজ্যের সেকেন্ডারি লেবেলের ওই সব সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানকারী কেন্দ্র অর্থাৎ, মহকুমা, স্টেট জেনারেল এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলিতে পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের যে খামতি রয়েছে, তাতে পাঁচ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসার সুযোগ পাবেন কীভাবে গরিব, অসহায় মানুষ? এমন প্রশ্ন উত্থাপন করে সার্ভিস ডক্টরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘‘স্বাভাবিকভাবেই এ ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতালগুলি সুযোগ নিতে চাইবে৷’’ অন্যদিকে, টার্শিয়ারি লেবেল অর্থাৎ, মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং চিকিৎসা-শিক্ষা সংক্রান্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রেও পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি রয়েছে বলে খোদ সরকারি-বেসরকারি ডাক্তারদের বিভিন্ন সংগঠনের তরফেই অভিযোগ রয়েছে৷

আরও পড়ুন: কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক-বাহিনীর অধীনে বাংলায় ফাইনালে গোল করবে বিজেপি

ওই পরিকাঠামোগত খামতির কারণেও টার্শিয়ারি লেবেলের সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিকিৎসা পরিষেবা পেতে অনেক সময়ও নষ্ট হয়৷ যেমন, কোথাও হয়তো রোগনির্ণয়ের কোনও পরীক্ষার জন্য অনেক দেরিতে সময় দেওয়া হল, কোথাও আবার অস্ত্রোপচার করাতেও সময় নেওয়া হল৷ ডাক্তার সজল বিশ্বাস বলেন, ‘‘এ ভাবে বিমার ব্যবস্থা না করে সেকেন্ডারি এবং টার্শিয়ারি লেবেলের সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোগত বিভিন্ন খামতি পূরণ করে দিতে পারত কেন্দ্রীয় সরকার৷ তা হলে, এই সব হাসপাতালে বিনামূল্যে ব্যয়বহুল চিকিৎসার সুযোগ পেতেন গরিব, অসহায় মানুষ৷’’ টিবি অর্থাৎ, যক্ষ্মায় আক্রান্তদের চিকিৎসার সময়, তাঁদের পুষ্টিকর খাবারের জন্য প্রতি মাসে ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষিত হয়েছে এ বারের বাজেটে৷ গোটা দেশে ২৪টি জেলা সদর হাসপাতালকে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে উন্নীত করার কথাও এ বারের বাজেটে ঘোষিত হয়েছে৷

আরও পড়ুন: মুকুলের ছায়ায় গেরুয়া সংগঠনের নিশানায় মমতার স্বাস্থ্য দফতর

এবং, ন্যাশনাল হেলথ পলিসি, ২০১৭-র অধীনে এ বারের বাজেটে দেশ জুড়ে ১.৫ লক্ষ হেলথ অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টারের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে৷ সাধারণ মানুষ যাতে বাড়ির কাছেই চিকিৎসা পরিষেবা গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য এই সব সেন্টার বলেও বাজেটের ঘোষণায় জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী৷ ডাক্তার স্মরজিৎ জানা বলেন, ‘‘স্পষ্ট করে বলা হয়নি এই ধরনের সেন্টারে কোন পদ্ধতির চিকিৎসা পরিষেবা মিলবে৷ আর, যক্ষ্মা আক্রান্ত একজন গরিব, অসহায় মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে মাসে ৫০০ টাকায় এখন কী হয়?’’ ডাক্তার সজল বিশ্বাস বলেন, ‘‘৫০০ টাকা খুবই কম৷ তবে, নতুন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল না গড়ে আগে চালু মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি পূরণের জন্য নজর দেওয়া হলে, দেশের মানুষই বেশি উপকৃত হতেন৷’’

----
--