সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘সেই হারানো চড়ুইয়ের ডাক, বলে যে গেছে সে চলে যাক ! নিজেকে ভালবাসো তুমি এবার’। বিয়ের পরের জীবন নাকি শুধুই দুজনের! মধুচন্দ্রিমায় স্বামী বা স্ত্রীয়ের সঙ্গে মাখো মাখো প্রেমের ছবি। এটাই স্বাভাবিক। তাই না? এই ছবিটাই পালটে দিয়েছেন ‘সোলো ট্রাভেলার’ সোহিনী দেবরায়। বিয়ের পরে স্রেফ নিজেকে সময় দেওয়ার জন্য , নিজেকে ভালবেসে পাড়ি দিয়েছেন পাহাড়ের পথে।

‘সেই মেয়েটা সংসারেতে হাঁপিয়ে ওঠে। সেই মেয়েটা রুকস্যাকেতেই মানায় ভালো’। হ্যাঁ এমন এক ফেসবুক পোস্ট করেই গরুবাথানের পথে পাড়ি দিয়েছেন বারাকপুরের মেয়ে সোহিনী। প্রথম থেকেই এমন ভাবেই নিজেকে সময় দিতে ভালবাসেন সোহিনী। কিন্তু বিয়ের পর তা আর হয়ে উঠছে না৷ ২০১৮-র ডিসেম্বর মাসে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন সোহিনী।

সে নিয়েও প্রচুর ছবি পোস্ট করেছিলেন ফেসবুক ওয়ালে। কিন্তু বিয়ে মানেই নিজেকে সময় দেওয়া শেষ! আবার মেয়ে বলে কথা। সংসারধর্ম, স্বামী, শাশুড়ি, শ্বশুর এত বিস্তর ‘বাধা’ পেরিয়ে নিজেকে দেওয়ার মতো সময় কি মেলে? ইচ্ছা থাকলে সব হয়। এক মাস সংসার সামলে সোহিনী নিজের সঙ্গে হানিমুনে পাড়ি দিয়েছেন।

যাত্রা অজানা। সোহিনীর পোস্টের কথা অনুযায়ী, “এক বছর আগে অবধি নিজেকে বিশেষ বিশেষ কারণে ট্রিট দিতাম, ট্রামে বাসে চড়ে শহর ঘুরে বেড়াতাম। বিয়েটা ঠিক হওয়ার পর অন্য একজনকে সময় দিতে গিয়ে এসব কমেছিল। কিন্তু বিয়ের একমাস হয়ে গেছে। জীবনে এত বড় একটা ভালো কাজ করেছি। নিজেকে ট্রিট না দিলে হয়?”

তারপর ‘যেদিকে দু চোখ যায়’ বলে জাস্ট বেড়িয়ে পড়েছেন। ট্রেন ধরে সোজা গরুবাথান। সোহিনীর কথায়, “কোথায় যাব কি করব কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছিলাম না। ৬ জানুয়ারি, বর্ধমান থেকে নিউজলপাইগুড়ি পর্যন্ত একটা জেনারেল টিকিট কেটে স্লিপারে উঠে পড়েছিলাম। টিটিকে দিয়ে একটা সিট ম্যানেজ করে আপার বার্থে।

ভেবেছিলাম লেপচাজগতে একদিন থেকে দার্জিলিং ঘুরে সিলারি গাঁওয়ের দিকে যাব।” সোলো ট্রাভেলারের মুড। যখন যেদিকে চায় সেদিকে যায়। সকাল হতেই মনে হয় নিউজলপাইগুড়ি পরের স্টেশনগুলোতে তার যাওয়া হয়নি। যেমন বলা তেমনি কাজ। নামেন নিউ মাল জংশনে।

কিন্তু যাবেন কোথায়? এখনও অজানা। ফেসবুকেই মেসেজ এক স্থানীয় পরিচিতকে। তারপর ফোনে যোগাযোগ করতে তিনি বলে দেন মাল জংশন থেকে গোরুবাথানই সেরা গন্তব্য। সোহিনী লিখেছেন, “ওংডেন নামক এক ভদ্রলোকের হোমস্টেতে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যায় পরিচিতের মাধ্যমে।” এরপর মালবাজার থেকে শেয়ার ক্যাবে গোরুবাথান পৌঁছানোর পর ওংডেনের গাড়িতে চড়ে তাঁর বাড়ি। গোরুবাথানের সবথেকে উঁচু জায়গায় সেই হোম স্টে। বাড়ি থেকে স্পষ্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা আর নীল আকাশ। নিজের সঙ্গে মধুচন্দ্রিমায় এর থেকে ভালো আর কি চাই?

সোলো ট্রাভেলারের কথায়, “নিরিবিলি চুপচাপ অসাধারণ সুন্দর এক জায়গা একটা বেশ বড়োসড়ো সাইজের বাংলোতে আমার একার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সামনের বাড়িতে আছেন ওংডেন সাহেবের পরিবার। সময়ে সময়ে ভালো ভালো খাবার দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।” ভবঘুরে এমন বউয়ের একলা হানিমুনে সহযোগিতা করেছেন স্বামী স্বয়মও। ফেসবুকে সোহিনীর ওই পোস্টের হাজারও কমেন্টের মাঝে স্বয়মের মজার ছলে ছোট্ট কমেন্ট, “দাঁড়াও আমায় ক্রেডিট না দেওয়া বের করছি।”

ট্রেনে ঘুম হয়নি। তাই প্রথম দিনটা জমিয়ে ঘুম দিয়েছেন। লিখেছেন, “নিজের সাথে সময় কাটিয়ে জমে উঠেছে আমার হানিমুন।” আগামী পরিকল্পনা? জানেন না সোহিনী। তিনি তো পথিক। পথ চলাতেই তাঁর আনন্দ৷