লন্ডন নয় তিলোত্তমায় বিবিধের মিলন চান মোদী!

ছবি: মিতুল দাস৷

বিশ্বজিৎ ঘোষ: লন্ডন নয়৷ অন্য কোনও শহরও নয়৷ কলকাতা থাকুক কলকাতায়৷

শুধুমাত্র সেটাও আবার নয়৷ কল্লোলিনী এই তিলোত্তমা, এই মহানগরী হয়ে উঠুক বিবিধের মাঝে মহান মিলনের ক্ষেত্র৷ এমনই মনোভাব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর!

আর, প্রধানমন্ত্রীর ওই মনোভাব প্রকাশ পেল পশ্চিমবঙ্গের গেরুয়া শিবিরেও৷ যার প্রভাব পড়ল আবার কলকাতা পুরসভা নির্বাচনেও৷ কাজেই, প্রধানমন্ত্রীর ওই মনোভাবকে সম্বল করেই এখন এ রাজ্যের পদ্মফুল শিবিরও কোমর বেঁধে নেমেছে৷

- Advertisement -

পশ্চিমবঙ্গের গেরুয়া শিবিরের কোনও ঘোষণায় যে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবের ছায়া পড়বে না, তাও সম্ভব নয়৷ কাজেই, এ রাজ্যের পদ্মফুল শিবির যে ধরনের ঘোষণা করেছে, তার পিছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মনোভাব রয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল৷

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র ওই ঘোষণা অনুযায়ী, কলকাতাকে লন্ডন বানানোর বিষয়টি হাস্যকর৷ কলকাতা যেন অন্য কোনও শহরের অনুকরণে গড়ে না ওঠে৷ কলকাতা থাকুক কলকাতায়৷ কারণ, এই শহর নিজস্ব চরিত্রে বিকশিত হয়েছে৷এই কলকাতা গড়ে উঠেছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে, নিজস্ব স্পন্দন-সংবেদন আর স্থাপত্যশৈলীর উপর ভিত্তি করে৷

বিভিন্ন সময় কলকাতা পুরসভা এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড, এই শহরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷যার জেরে স্বতন্ত্রতা হারিয়েছে এই মহানগরী৷সময়ের সঙ্গে তাল রেখে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি ভারতেরও বিভিন্ন শহরের উন্নয়ন ঘটেছে সেখানকার নিজস্ব পরিকল্পনায়৷ কিন্তু, কলকাতার উন্নয়ন হয়েছে অপরিকল্পিত এবং অগোছালো ভাবে৷শুধু তাই নয়৷ রাজ্য বিজেপি-র তরফে প্রকাশিত ওই ঘোষণা অনুযায়ী, নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কলকাতার সীমানা বৃদ্ধি করা হয়েছে অগোছালো ভাবে৷ যেটা আবার নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ৷

এখানেও থেমে থাকেনি রাজ্য বিজেপি৷ ওই ঘোষণা অনুযায়ী, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, পার্সি, আর্মেনীয়, ইহুদি, চিনা, আমেরিকান, পর্তুগিজ, গ্রিক সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বিভিন্ন সময় পাকাপাকিভাবে আশ্রয় নিয়েছেন এই কলকাতায়৷ওই সব সম্প্রদায়ের মানুষ, বিভিন্ন সময় তাঁদের নিজস্বতার চিহ্ন-ও রেখেছেন এই শহরে ৷ কিন্তু, তাঁদের ধর্মীয় অথবা আবাসিক ভবনগুলির দশা এখন প্রায় ভগ্ন৷ কাজেই, সেই সব পুনরুদ্ধার করে, কলকাতাকে মূল গরিমায় ফিরিয়ে আনতে বিশেষ নজর দেওয়া হবে৷

হকার নীতি নিয়েও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষিত অবস্থানের কার্যত বিপরীত পথে হেঁটেছে রাজ্য বিজেপি৷ ওই ঘোষণা অনুযায়ী, যথাযথ কর্মসংস্থানের অভাবে হকারির মতো পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন অনেকে৷ এ রাজ্যে শিল্প স্থাপন না হওয়ায়, ওই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে৷ একই সঙ্গে, জাতীয় হকারনীতির বাস্তবায়নও চাইছে রাজ্য বিজেপি৷ আর, এ ক্ষেত্রে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত হকার নীতির সঙ্গে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হল বলেও মনে করছে রাজনৈতিক মহল৷

রাজ্য বিজেপি-র ঘোষণা অনুযায়ী, ফুটপাথ মূলত পথচারীদের জন্য৷ কোনও কোনও এলাকায় যেখানে ফুটপাথ চওড়া আছে, সেখানে হকারদের জন্য ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হবে৷ কোনও কোনও এলাকায় আবার হকারদের জন্য আদর্শ কিয়স্ক ব্যবহার এবং কোনও কোনও এলাকায় চাকার উপর তৈরি কিয়স্ক নির্দিষ্ট সময়ের পর সরিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে৷ হকাররা যাতে স্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি এবং বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে নিক্ষেপ করে পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন, সেজন্য তাঁদের প্রশিক্ষণের দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে৷ হকারদের পুনর্বাসনের জন্য বলা হয়েছে কমপ্লেক্স তৈরির কথাও৷

নাগরিক পরিষেবা প্রদানে কলকাতায় একাধিক সংস্থা (যেমন, কলকাতা পুরসভা, কেএমডিএ, কেআইটি) গড়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে৷কাজেই, এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে, কলকাতার ঐতিহ্যকে বজায় রেখে এই মহানগরীকে আধুনিক সুন্দর শহর হিসেবেও গড়ে তুলতে চাইছে বিজেপি-র রাজ্য শাখা৷আর, তার জন্য যে সব বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ওই ঘোষণায়, তার মধ্যে রয়েছে, পরিশ্রুত পানীয় জল৷ আর, তার জন্য ‘সকলের জন্য পানীয় জল পরিষেবা’-র কথাও বলা হয়েছে৷ রাজ্য বিজেপি-র ওই ঘোষণা অনুযায়ী, অপরিশ্রুত পানীয় জলের পরিষেবার পিছনে রয়েছে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি৷ নির্ধারিত মান অনুযায়ী যে সব স্কুল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম নিজেদের জন্য পানীয় জল শোধনাগার তৈরি করবে, তাদের দেওয়া হবে কর ছাড়৷

কলকাতার বিভিন্ন রাস্তা জবরদখল হয়ে রয়েছে৷ ওই জবরদখল মুক্ত করার পাশাপাশি, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কমাতে এই শহরে কংক্রিটের রাস্তা নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে৷ একই সঙ্গে নিকাশি ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জলাভূমি সংরক্ষণ, কঠিন বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে সার ও বায়ো গ্যাস উৎপাদন, হাসপাতালের বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে নিক্ষেপ, বিভিন্ন উপায়ে অর্থের অপচয় এবং দুর্নীতি রোধ, আধুনিক বাজার তৈরি এবং শহরের সবুজায়নের কথাও ঘোষণা করেছে রাজ্য বিজেপি৷ একই সঙ্গে ওই ঘোষণা অনুযায়ী, বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন, সময়ের অপচয় রোধে অনলাইন পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি, কলকাতার বিভিন্ন বস্তি এবং পল্লির উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে৷

আর, ওই বিভিন্ন বস্তি এবং পল্লি উন্নয়নের অঙ্গ হিসেবে ‘সকলের জন্য বাড়ি’ তৈরির প্রকল্প, ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ পরিষেবা এবং বস্তি-পল্লিবাসীদের জন্য সম্মানের সঙ্গে সুস্থভাবে বসবাসের বিষয়টিও বলা হয়েছে৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ বিপিএল তালিকা ত্রুটিমুক্ত করা, কলকাতায় সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন, বৈদ্যুতিক চুল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি করার কথাও বলা হয়েছে৷ রাজ্য বিজেপি-র ওই ঘোষণা অনুযায়ী, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের জন্য কলকাতা পুরসভা পরিচালিত কোনও কবরস্থান নেই৷ তারও ব্যবস্থা করা হবে৷ আর, পোষ্য পশুর কবরের জন্যেও রাখা হবে নির্দিষ্ট স্থান৷

কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের জন্য রাজ্য বিজেপি-র ইস্তাহারেই রয়েছে এমনই নানা ঘোষণা৷আর, ওই ঘোষণা অনুযায়ী, কলকাতার মানুষই এই শহরের শ্রেষ্ঠ সম্পদ৷ আসন্ন নির্বাচনে বিজেপি কলকাতা পুরবোর্ড দখল করলে, সকলে মিলে কলকাতার আনন্দ ও গর্বকে ফিরিয়ে আনার দাবিও করা হয়েছে ওই ইস্তাহারে৷আর, এ ভাবেই, কার্যত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছায়ায়, কলকাতাকে লন্ডন নয়, কলকাতায় রাখতে চাইছে রাজ্য বিজেপি৷

=========================================

Advertisement ---
---
-----