সম্পাদকমণ্ডলীতে নেই, তবু কাজ করলেই সুস্থ থাকেন শ্যামল

একটা সময় ছিল, যখন রাজ্যের বামফ্রন্টের নেতারা উত্তর থেকে দক্ষিণ, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ চষে বেড়াতেন৷ ব্যস্ততার মধ্যেই দিন-রাত কাটত৷ কিন্তু রাজ্যপাট হাতছাড়া হতেই তাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে৷ কেউবা নিজেকে আড়াল করে নিয়েছেন৷ কেউ করেছেন দলবদল৷ কিন্তু কিছু কমরেড এখন ঠিক কী করছেন? কী করে তাঁদের দিন কাটছে৷ সেই সব নিয়ে Kolkata24x7 এ বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদন #কেমন_আছেন_কমরেড?

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: বিশ বছর আগে অসুস্থ ছিলেন৷ বিশ বছর পর মনের ভিতর অসুস্থতার চিহ্ন মাত্র রাখেননি৷ শরীরকে পাত্তাই দেন না কমরেড শ্যামল চক্রবর্তী৷ প্লেনামের সিদ্ধান্তে যে কয়েকজন ‘বয়স্ক’ কমরেড রাজ্য কমিটিতে শুধুমাত্র বিশেষ আমন্ত্রিত হয়েই রয়ে গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শ্যামলবাবু৷ কমরেডের বক্তব্য, ‘‘বয়স তো একটা সংখ্যা৷ তাই ‘৭৪’ও আমার কাছ শুধুই একটা সংখ্যা৷’’ মানলেন, শরীর অসুস্থ৷ কিন্তু কাজ করলেই সুস্থ থাকেন৷ বর্ষীয়ান এই সিআইটিইউ নেতার স্পষ্ট কথা, ‘‘রাজ্য সম্পাদক মণ্ডলীতে নেই, তাতে কী? কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আমি৷ রাজ্য কমিটিতে বিশেষ আমন্ত্রিত বলে আমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না…৷ আমি সিআইটিইউ-এর সর্বভারতীয় সহ সভাপতি৷ ২ তারিখ (২ অগস্ট) দিল্লিতে কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে যাচ্ছি…৷’’

শ্রমিক ভবনে নিজের ঘরের চেয়ারে বসে ততক্ষণে একটা সিগরেট ধরিয়েছেন শ্যামল চক্রবর্তী৷ ৭৪ বছর বয়সে শরীরকেই পালটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া কমরেড বলতে থাকলেন, ‘‘জানেন না হয়তো, ২০ বছর আগে অসুস্থ ছিলাম৷ শিরদাঁড়ায় সমস্যা, spondylitis নিয়ে রীতিমতো জেরবার৷ পিজিতে (এসএসকেএম হাসপাতাল) ভর্তি হয়েছিলাম৷ এরপর চিকিৎসা করতে কেরালায় গেলাম৷ ওখানে আয়ূর্বেদিক চিকিৎসা করেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাই৷ আবার নতুনভাবে শুরু করি৷ প্রত্যেকদিন কোনও না কোনও কর্মসূচীতে থাকি৷ রাজ্যের প্রতিটি জেলায় গিয়েছি৷’’

- Advertisement -

রাজ্যে ১১৭টি গণসংগঠনের সামাজিক মঞ্চ Bengal Platform For Mass Organisation (BPMO) একমাত্র আহ্বায়ক শ্যামল চক্রবর্তী৷ ‘‘সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বের হই, আবার রাত ৯টার মধ্যে বাড়ি ফিরি৷ মিটিং, মিছিল বাদ দিলে ফাঁকা সময় প্রায় নেই৷ নিজস্ব লেখালেখিও আছে৷’’ জানালেন বর্ষীয়ান কমরেড৷ কথার মাঝেই ফোন এলো৷ ‘‘ফোনের ওপারের ব্যক্তিকে তিনি বললেন, ‘‘সূর্য (সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র) একটা লেখা লিখতে বলেছে৷ আজ সেটা শেষ করব৷’’

তবে ফুটবল আর থিয়েটার থেকে দূরে থাকতে পারেন না এই সিটু নেতা৷ বিশ্বকাপের সময় ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘‘একে একে নিভল দেউটি … আর্জেন্টিনা বিদায় নিয়েছে …শেষ ভরসা ব্রাজিল, উরুগুয়ে … রাত জাগব ভালো খেলা দেখার জন্য … জাগরণে যাবে বিভাবরী৷’’ জানালেন, ‘‘হ্যাঁ, রাত জেগে বিশ্বকাপ দেখেছি৷ গ্রুপ থিয়েটারও দেখতে যাই৷ যে নাটকে কোনও বার্তা থাকে, তাই দেখতে পছন্দ করি৷ নান্দীকার, চার্বাক, সায়কের নাটক দেখি৷ বালুরঘাট, কল্যানী, বারাসত থেকে আঞ্চলিক দলগুলি ইদানিং খুব ভালো করছে৷’’

২০০১ শ্যামল চক্রবর্তী লিখেছিলেন ‘গরু ও ত্রিশূল’৷ ওই চটি বইটি বর্তমানে ভারতীয় রাজনীতিতে বেশ প্রাসঙ্গিক, তা মানলেন তিনি৷ ‘‘সেই সময় এনডিএ জামানায় ত্রিশূল বিতরণ করা হচ্ছিল৷ লিখেছিলাম ভারতীয় সমাজে গরু আর ত্রিশূলের গুরুত্ব কোথায়৷ গীতা, বেদ পড়ে জেনেছিলাম হিন্দুদের মধ্যেও গো-ভক্ষণের উদাহরণ রয়েছে ভারতীয় সমাজে৷ ঋকবেদেই গরু ও ষাঁড় ভক্ষণের কথা রয়েছে৷ তারপর ধীরে ধীরে গো-ভক্ষণ বন্ধ হয় মৌর্য্যদের সময়কালে৷ সে সময় গরু বা অন্যান্য গবাদি পশুকে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হতে থাকলো৷ তখন একমাত্র ধর্মীয় কারণ দেখিয়েই মানুষের গো-ভক্ষণ বন্ধ করা যেতে পারতো৷ পাশাপাশি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অহিংস হতে হতো হিন্দুধর্মকে৷’’ তাঁর বক্তব্য, এক্ষেত্রে বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়েছে৷

রাজ্যে বামফ্রন্টের সুদিন কবে আসবে? সিআইটিইউ সহ সভাপতি স্বীকারোক্তি, ‘‘আমাদের উপর মানুষের ক্ষোভ তো ছিলেই৷ কিন্তু এটাও ভাবতে হবে যে, সারা ভারতে কোথাও বিরোধী দলের উপর এত অত্যাচার হয়৷ ৩৫০ জল কর্মী খুন হয়েছে৷ পঞ্চায়েতে কী হল সবই দেখেছেন৷ কিন্তু আমরা মাঠে-ময়দনে আছি৷ আমরা নিশ্চিহ্ন হয়নি৷ সেই অঙ্গীকার থেকেই বলতে পারি, আবার ক্ষমতায় ফিরবে বামফ্রন্ট৷ মানুষ এই অত্যাচারের জবাব দেবে৷’’

আর বিজেপি? রাখঢাক না রেখেই শ্যামলের জবাব, ‘‘এরাজ্যে বিজেপিই তৃণমূলকে মারবে৷ মানুষ মনে করছে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে৷ ওরা তৃণমূলকে হারাতে পারবে৷ কিন্তু বিজেপি যে কী ভয়ঙ্কর তা ত্রিপুরার দিকে তাকালে বোঝা যায়৷’’ সিআইটিইউ সহ সভাপতির বক্তব্য, ত্রিপুরায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বামপন্থীদের উপর অত্যাচার শুরু করেছে৷ খুব স্বাভাবিক, বিজেপি-আরএসএস-এর একমাত্র শত্রু বামপন্থীরা৷ যে রাজ্যে সপ্তম পে-কমিশনের গল্প শুনিয়ে ক্ষমতায় এলো, সেখানে রাজ্য সরকার পেনশন বন্ধ করে দিল৷

কংগ্রেস? সিআইটিইউ সহ সভাপতির মতে, ‘‘বাহাত্তর থেকে সাতাত্তর সাল পর্যন্ত কংগ্রেস অত্যাচার চালিয়েছে৷ কিন্তু এরাজ্যে এরপর আর অশান্তি হতে দেইনি আমরা৷ ত্রিপুরায় আমরা ক্ষমতায় ছিলাম বলে বিজেপি আমাদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে৷ কই, উত্তর প্রদেশে মায়া-মুলায়মের উপর তা করতে পারছে না তো৷ ওরা জানে, বামপন্থীরা কখোনও ওদের জোটে যাবে না৷ আমরাই বিজেপির সব থেকে বড় শত্রু৷’’

শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গা কী বদলেছে? সিআইটিইউ সহ সভাপতির উত্তর, নিশ্চয়৷ সারা পৃথিবীতেই নিও-লিবারেল অর্থনীতিতে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গা বদলেছে৷ প্রয়ুক্তির উন্নতিতে শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে৷ ৪৫ বছরের নীচে শ্রমিকদের প্রায় চাকরি নেই৷ বাড়ছে অসংরক্ষিত শ্রমিক৷ পরিস্থিতির চাপে পড়ে শ্রমিক আন্দোলনও আত্মরক্ষা করছে৷ ‘‘সংখ্যার কারচুপিতে রাজ্য সরকার ‘Man Days Loss’ শূন্য বলে দাবি করে৷ কেড়ে নেওয়া হয়েছে ধর্মঘট করার অধিকার৷ এত কিছু করেও রাজ্যে শিল্পের হাল কী দেখেছেন তো …’’ বললেন শ্যামল৷

উঠল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গও৷ বাম সরকার কী ভুল করেছিল? শ্যামলবাবুর মতে, ‘‘বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজেই বলেছিলেন নন্দীগ্রামে সরকারের ভুল হয়েছে৷ কিন্তু বুদ্ধের সরকাররে উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না, তা এখন সবাই বোঝে৷ নন্দীগ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে কী৷ হয় নি৷ গাড়ির কারখান হয়নি৷ রোজগার পায়নি সিঙ্গুর৷ সরকার যদি জমি অধিগ্রহণ না করে, তবে কে করতো? দালালরা৷ পরিস্থিতি তবে আরও খারাপ হতো৷ তবে এটা ঠিক পদ্ধতিগত ভুল ছিল৷ প্রয়োজনে আরও দাম দেওয়া যেত৷ দেখতে হবে ভবিষ্যতে ওই ভুল যাতে আর না হয়৷’’

Advertisement ---
---
-----