ইয়েচুরি টিকিট না-পাওয়ায় বাংলার নব্য ‘বামাচারী’রা ক্ষিপ্ত

বিজয় রায়, কলকাতা: রাজ্যসভা নির্বাচনে পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিকে ফের প্রার্থী না করায় ক্ষোভ বাড়ছে সিপিএমের অন্দরেই৷ সূত্রের খবর, গোপালন ভবনের নেতাদের ‘বাড়বাড়ন্তে’ এখন রীতিমতো ফুঁসছেন পশ্চিমবঙ্গের নেতারা৷ তবে ভিতরে ভিতরে ফুঁসলেও এ ব্যাপারে বিদ্রোহ ঘোষণা করার সাহস দেখাতে পারছেন পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র থেকে লোকসভার সদস্য মহম্মদ সেলিমের মতো নেতারা৷

কিন্তু এক সময় যাঁরা ছিলেন সর্বভারতীয় স্তরে সিপিএমের শেষ কথা তাঁদের মুখ থেকে এখন সামান্য প্রতিবাদও শোনা যাচ্ছে না কেন? এ রাজ্যে লাগাতার খারাপ ফলের জেরেই কি গোপালন ভবনে কোণঠাসা আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের মার্কসবাদী নেতারা? নাকি, তাঁরা আর আগের মতো টাকার জোগান দিতে পারছেন না বলেই উপেক্ষিত হচ্ছেন? উঠছে প্রশ্ন৷

আরও পড়ুন: আরএসএস- সিপিএম সংঘর্ষের জেরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি

- Advertisement -

প্রচারের কল্যাণে সিপিএম পার্টি বরাবরই ‘বঞ্চিত’৷ ক্ষমতায় থাকতে বলতেন, কেন্দ্র বঞ্চনা করছে৷ এখন তাঁরা ক্ষমতায় নেই৷ এখন কেন্দ্রীয় বঞ্চনার তোপের মুখটা ঘুরে গিয়েছে নিজেদের সদর দফতর গোপালন ভবনের দিকে৷ এখন তাই প্রচার চলছে, কেন্দ্রীয় কমিটিতে বাংলার নেতারা বরাবরই ‘বঞ্চিত’৷ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পার্টির অভ্যন্তরে নতুন সেই প্রচারের বক্তব্য হল, ‘বঞ্চনা’র শুরু হরকিষেণ সিং সুরজিতের সময়ে (যদিও জ্যোতিবাবু গ্রিন সিগন্যাল না দিলে হরকিষেণ সিং সুরজিত কোনও দিনই সাধারণ সম্পাদক হতে পারতেন না)৷ সেই ‘বঞ্চনা’ আরও বাড়ে ২০০৫-এ প্রকাশ কারাত সাধারণ সম্পাদক হওয়ায়৷

আরও অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রাজ্যের নেতাদের কোনও কথাই কানে তোলেন না দিল্লির নেতারা৷ যার জেরে একটা সময়ের পর পলিটব্যুরোর বৈঠকে যাওয়াই নাকি বন্ধ করে দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ এখন প্রায়ই অসুস্থতার দোহাই পেড়ে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক নাকি এড়িয়ে যাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুও৷ রাখঢাক না করেই সম্প্রতি দলের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাতকে ‘স্বার্থপর’ বলে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি পলিটব্যুরোর প্রাক্তন সদস্য তথা দলের উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সম্পাদক গৌতম দেব৷

২০০৭-এর ‘পরিবর্তন’ ভুলে তৃণমূল নেত্রীর উপর ভরসা রাখছে সিপিএম?

এক সময় সিপিএমে সাংগঠনিক রীতি-রেওয়াজ মেনে দলীয় কোন্দল গোপন রাখাই হল দস্তুর৷ কিন্তু এখন সেসব বালাই গিয়েছে৷ যে হারে প্রকাশ্যে পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু হয়েছে তাতে ক্ষোভ বাড়ছে দলের অনুগামী সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে৷ পার্টির সাংগঠনিক বৈঠকেও তারা হাত-পা ছুঁড়ে বলছে, বার বার কেন দিল্লির কথায় পশ্চিমবঙ্গ ব্রিগেড পিছিয়ে আসছে? সূত্রের খবর, সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর অংশ মনে করছে সীতারাম ইয়েচুরিকে রাজ্যসভার টিকিট না দেওয়ায় এই রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলার জায়গা আর থাকবে না৷ আর তাই সেই ক্ষোভ থেকেই ফেসবুক বা ট্যুইটারে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছেন বহু সক্রিয় ‘বামাচারী’ কর্মী৷

জামিন-অযোগ্য মামলা ঠুকে কি বিজেপিকে ঠেকানো যাবে?

এখন এই উত্তেজিত কর্মীদের কী করে বাগে আনা যায় সেই প্রশ্নেই বেশি মাথা ঘামাচ্ছেন সূর্যকান্ত মিশ্র-মহম্মদ সেলিমরা৷ সম্প্রতি নবান্ন অভিযান করে তাঁরা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে একটু অ্যাড্রিনালিন সঞ্চার করার চেষ্টা করেছিলেন৷ কিন্তু মাস ঘুরতে না ঘুরতেই দলের তরুণ সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাসপেনশনকে কেন্দ্র করে আড়াআড়ি দুভাগে ভাগ হয়ে যায় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের রাজ্য পার্টি দফতর৷ তখনও অবশ্য দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এতটা ক্ষোভ প্রকাশ্যে দেখায়নি তরুণ প্রজন্ম৷ উলটে ঋতব্রতর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হলে শাস্তিই হওয়া উচিত বলেই জোর আওয়াজ তুলেছিল তারা৷ কিন্তু এখন সীতারাম ইয়েচুরিকেও রাজ্যসভার প্রার্থী না করায় দলের এই বাংলাতান্ত্রিক ‘তরুণ অংশ’ ক্ষোভে ফেটে পড়ছে৷ এই অভিমানী তরুণ-তরুণীদের ক্ষোভ কী করে সামলায় রাজ্য সিপিএম, সেটাই এখন দেখার৷

Advertisement
---